সাক্ষাৎকার : সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল
ডিজিটাল পেমেন্ট শুধু লেনদেন সহজ করে না, অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা বাড়ায়
সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল মাস্টারকার্ডের কান্ট্রি ম্যানেজার, বাংলাদেশ
জাকির হোসেন
প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২৬ | ০৮:০৬ | আপডেট: ১২ মার্চ ২০২৬ | ১২:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
পেমেন্ট কার্ড সেবাদাতা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান মাস্টারকার্ডের বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৯১ সালে। শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে কার্ডভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থা বিস্তারে কাজ করছে। কার্ড এবং পেমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন মাস্টারকার্ডের কান্ট্রি ম্যানেজার, বাংলাদেশ সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাকির হোসেন
সমকাল : বাংলাদেশে পেমেন্ট কার্ডের ব্যবহার বৃদ্ধির বছরওয়ারি প্রবণতা কেমন? দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে আমরা কোথায় আছি?
সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল : বাংলাদেশে পেমেন্ট কার্ডের ব্যবহার ধীরে হলেও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। নব্বই দশকে এর ব্যবহার ছিল সীমিত এবং মূলত উচ্চ আয়ের বা নির্দিষ্ট পেশাজীবী শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু গত এক দশকে ব্যাংকিং খাতের আধুনিকায়ন, ই-কমার্সের বিস্তার, স্মার্টফোন ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল লেনদেনের প্রয়োজনীয়তা বাড়ার কারণে কার্ড ব্যবহারের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে।
বিশেষ করে কভিড-১৯ সময়ে মানুষ নিরাপদ ও স্পর্শবিহীন লেনদেনের দিকে ঝুঁকেছিল। ফলে ডিজিটাল পেমেন্টে দ্রুত উত্থান দেখা যায়। যদিও পরে কিছু আস্থাজনিত ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জের কারণে প্রবৃদ্ধিতে ওঠানামা হয়েছে, তবুও সামগ্রিকভাবে কার্ডভিত্তিক পেমেন্টের ভিত্তি এখন অনেক শক্ত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ এখনও বিকাশমান পর্যায়ে রয়েছে। বড় শহরগুলোতে কার্ড ও ডিজিটাল পেমেন্ট দ্রুত জনপ্রিয় হলেও ছোট দোকান বা স্থানীয় বাজারে এর ব্যবহার এখনও সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। তবে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী, মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবার বড় ব্যবহারকারী ভিত্তি, দ্রুত বাড়তে থাকা ডিজিটাল অভ্যাস এবং ই-কমার্সের বিস্তার– এসবই ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। তাই বলা যায়, বাংলাদেশ এখনও পুরোপুরি সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি, তবে সঠিক উদ্যোগ ও অবকাঠামো সম্প্রসারণ হলে খুব দ্রুতই আরও এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। ডিজিটাল পেমেন্ট শুধু লেনদেন সহজ করে না, অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা বাড়ায়।
সমকাল: বাংলাদেশের পেমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিতে মাস্টারকার্ডের যাত্রা এবং এর বিকাশ সম্পর্কে জানতে চাই। উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিতে আপনাদের অগ্রগতি সম্পর্কে কিছু বলুন।
সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল : বাংলাদেশে মাস্টারকার্ডের কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৯১ সালে। সেই সময় পিওএস অবকাঠামো সীমিত ছিল এবং অনলাইন লেনদেনের সুযোগও খুব কম ছিল। ফলে কার্ডের ব্যবহার ছিল তুলনামূলকভাবে ছোট পরিসরে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে আধুনিকায়ন, ই-কমার্সের বিস্তার এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির উন্নয়নের কারণে পেমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিও দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমানে মাস্টারকার্ড শুধু কার্ড ইস্যু বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং একটি নিরাপদ ও আধুনিক ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। কন্ট্যাক্টলেস পেমেন্ট, উন্নত সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা, টোকেনাইজেশন এবং এআইভিত্তিক ফ্রড মনিটরিং প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা লেনদেনকে আরও নিরাপদ ও দ্রুত করার জন্য কাজ করছি।
সমকাল : ঈদ উৎসবে আপনারা সব সময় বিভিন্ন অফার দিয়ে থাকেন। এবারের ঈদে উল্লেখযোগ্য অফার কী কী রয়েছে?
সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল : রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে মাস্টারকার্ড প্রতিবছরই গ্রাহকদের জন্য বিশেষ ক্যাম্পেইন নিয়ে আসে, যাতে উৎসবের কেনাকাটা আরও সুবিধাজনক, সাশ্রয়ী এবং আনন্দময় হয়। এবারের ঈদেও দেশজুড়ে গ্রোসারি, লাইফস্টাইল, ডাইনিং, ভ্রমণ, হোটেল ও ই-কমার্স– বিভিন্ন খাতে আকর্ষণীয় অফার চালু রয়েছে। লাইফস্টাইল ক্যাটেগরিতে মার্চ ১ থেকে মার্চ ১৪ পর্যন্ত ‘১৪ দিনে - ১৪ লাখ’ টাকার ভাউচার জেতার সুযোগসহ কার্ডহোল্ডাররা পাচ্ছেন সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়, আর গ্রোসারিতে রয়েছে বিশেষ আটটি শীর্ষ সুপারশপ চেইনের সঙ্গে স্পেন্ড অ্যান্ড উইন ক্যাম্পেইন ও আকর্ষণীয় হোম অ্যাপ্লায়েন্স ভাউচার, গ্যাজেট বা গ্রোসারি ভাউচার জয়ের সুযোগ। এ ছাড়া রেস্টুরেন্ট পার্টনারদের সঙ্গে ইফতার ও ডিনারে ‘বাই ওয়ান, গেট আপ টু ৪’ সুবিধা এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণে উল্লেখযোগ্য মূল্যছাড় দেওয়া হচ্ছে। অনেক পার্টনার ব্যাংক সহজ ইএমআই সুবিধাও দিচ্ছে, ফলে বড় কেনাকাটাও পরিকল্পিতভাবে করা সম্ভব হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য শুধু অফার দেওয়া নয়; বরং নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার থেকে ঈদের শপিং ও ভ্রমণ পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে কার্ড ব্যবহারকে এমনভাবে উপযোগী করা, যাতে গ্রাহক নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে ডিজিটাল পেমেন্টকে দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করতে পারেন।
সমকাল : ক্যাশলেস লেনদেন বাড়াতে সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা উদ্যোগ রয়েছে। আপনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে এ বিষয়ে কিছু পরামর্শ জানতে চাই।
সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল : বাংলাদেশে ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তুলতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এই অগ্রযাত্রাকে আরও কার্যকর করতে হলে আমাদের দরকার ফ্যাসিলিটেটিভ রেগুলেশন, অর্থাৎ এমন নীতিমালা– যা ব্যাংক, এমএফএস, পিএসও, ফিনটেক ও পেমেন্ট নেটওয়ার্ক– সব অংশীজনের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করবে। একটি সুস্থ, প্রতিযোগিতামূলক এবং আন্তঃসংযুক্ত ইকোসিস্টেম না থাকলে ডিজিটাল পেমেন্টের টেকসই বিস্তার সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, গ্রাম ও মফস্বলে ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণে আলাদা প্রণোদনা ও বাজেট প্রয়োজন। ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য পিওএস, কিউআর এবং অন্যান্য গ্রহণযোগ্যতা অবকাঠামো সহজলভ্য করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কর-সহায়তা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। প্লাস্টিক কার্ড, পিওএস মেশিন ও স্মার্টফোনের ওপর উচ্চ কর কমিয়ে আনা গেলে অবকাঠামো দ্রুত বাড়বে। একই সঙ্গে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহারে গ্রাহক ও মার্চেন্ট উভয়ের জন্য সীমিত প্রণোদনা বিবেচনা করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মোট ৫% প্রণোদনা দেওয়া হলে– যেখানে গ্রাহক পাবেন ৩% এবং মার্চেন্ট ২%, তাহলে মানুষ ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহারে আরও উৎসাহিত হবে এবং ব্যবসায়ীরাও সহজে এটি গ্রহণ করতে আগ্রহী হবেন। সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগেই একটি শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আস্থাভিত্তিক ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে উঠবে।
সমকাল : ডিজিটাল পেমেন্টে নিরাপত্তার বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় উঠে আসে। এ ক্ষেত্রে কোন পর্যায়ে কোন ধরনের সচেতনতা ও পদক্ষেপের দরকার বলে মনে করেন?
সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল : ডিজিটাল পেমেন্টে আস্থা গড়ে তোলার মূল শর্তই হলো নিরাপত্তা। তাই এ ক্ষেত্রে আমি বলব, প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ এবং ব্যবহারকারীর সচেতনতা– এই তিনটি ক্ষেত্রে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রথমত, পেমেন্ট নেটওয়ার্ক, ব্যাংক ও প্রযুক্তি অংশীদারদের উচিত উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। যেমন– টোকেনাইজেশন, মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন, এআইভিত্তিক রিয়েল-টাইম ফ্রড মনিটরিং এবং ঝুঁকি বিশ্লেষণ। এই ধরনের সল্যুশনের ফলে সন্দেহজনক লেনদেন দ্রুত শনাক্ত করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, মার্চেন্ট বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেরও নিরাপদ অবকাঠামো ব্যবহার এবং ডেটা সুরক্ষার নীতিমালা অনুসরণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে উৎসবের মতো উচ্চ লেনদেনের সময়ে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয়ত, সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো গ্রাহক সচেতনতা। ওটিপি, পিন বা কার্ডের তথ্য কাউকে না দেওয়া, অচেনা লিংকে ক্লিক না করা এবং অননুমোদিত লেনদেন দেখলে দ্রুত ব্যাংককে জানানো– এসব সাধারণ অভ্যাস অনেক বড় ঝুঁকি কমাতে পারে। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গড়তে ব্যবহারকারীর সচেতনতাও সমানভাবে জরুরি।
সমকাল : মাস্টারকার্ডের গ্রাহকদের জন্য নতুন পণ্য, সেবা কিংবা প্রযুক্তি পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাই।
সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল : মাস্টারকার্ডের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আরও নিরাপদ, ব্যবহারবান্ধব এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক পেমেন্ট অভিজ্ঞতা। আমরা এমন সব সমাধানের দিকে এগোচ্ছি, যা গ্রাহকের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করবে এবং একই সঙ্গে নিরাপত্তার মান আরও শক্তিশালী করবে। কন্ট্যাক্টলেস পেমেন্ট ইতোমধ্যে জনপ্রিয় হয়েছে; মোবাইল ওয়ালেট সংযুক্তি, আরও উন্নত নিরাপত্তা প্রযুক্তি, দ্রুত অথেনটিকেশন এবং আরও নিরবচ্ছিন্ন ডিজিটাল অভিজ্ঞতার ওপর জোর দেওয়া হবে। একই সঙ্গে আমরা সেগমেন্টভিত্তিক সমাধানেও গুরুত্ব দিচ্ছি। যেমন– তরুণ প্রজন্ম, নারী উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী, ভ্রমণপ্রেমী এবং নতুন কার্ড ব্যবহারকারীদের জন্য উপযোগী পণ্য ও সেবা। ইএমআই সুবিধা, ব্যক্তিগতকৃত অফার, রিয়েল-টাইম খরচ বিশ্লেষণ, উন্নত রিওয়ার্ড অভিজ্ঞতা– এসব ক্ষেত্রেও কাজ চলছে। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, পেমেন্টকে শুধু লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে না দেখে, একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল আর্থিক অভিজ্ঞতায় রূপ দেওয়া– যেখানে নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্য এবং অন্তর্ভুক্তি একসঙ্গে থাকবে।
- বিষয় :
- সাক্ষাৎকার
- ক্রেডিট কার্ড
