ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

লেনদেনে প্রভাবক হয়ে উঠছে কার্ড

লেনদেনে প্রভাবক হয়ে উঠছে কার্ড
×

 ওবায়দুল্লাহ রনি

প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২৬ | ০৮:০৮ | আপডেট: ১২ মার্চ ২০২৬ | ১২:৫৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

নিজের সুবিধামতো সময়ে টাকা তোলা বা অন্যকে পরিশোধের জন্য ব্যাংক কার্ড ব্যবহারে আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের বড় অংশ এখন কার্ড ও অ্যাপভিত্তিক লেনদেনের দিকে ঝুঁকছে। গ্রাহকের এই চাহিদা বিবেচনায় ব্যাংকগুলোও কার্ড ব্যবহারে উৎসাহ দিতে নানা প্রচারণা চালাচ্ছে।

অনেক ব্যাংক এখন সঞ্চয়ী হিসাব খোলার সময়ই গ্রাহকদের ডেবিট কার্ড নিতে উৎসাহিত করছে। সুপারশপ বা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কেনাকাটার বিল পরিশোধে কার্ড ব্যবহার করলে নানা ধরনের ছাড় ও অফার দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ঈদ সামনে রেখে ক্যাশব্যাক ও মূল্যছাড়ের প্রচারণা এখন বেশ চোখে পড়ছে।

বদলাচ্ছে লেনদেনের ধরন
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, একসময় প্লাস্টিক কার্ড ব্যবহারে মানুষের আগ্রহ খুব কম ছিল। বেশির ভাগ মানুষ ব্যাংকের শাখায় গিয়ে সরাসরি টাকা জমা বা উত্তোলন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তবে সময়ের সঙ্গে সেই মানসিকতায় পরিবর্তন এসেছে। নগদ টাকা বহনের ক্ষেত্রে ঝুঁকিও থাকে। আবার ব্যাংকের শাখায় গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টাকা জমা বা উত্তোলন করতেও সময় লাগে। এসব কারণই ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেন করতে মানুষকে আগ্রহী করছে।
ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, কেনাকাটার বিল, টিকিট কাটা কিংবা হাসপাতালের বিল– বিভিন্ন ক্ষেত্রেই এখন কার্ডে পরিশোধ করছেন গ্রাহক। করোনা মহামারির সময় ঘরবন্দি জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এই প্রবণতা দ্রুত বেগবান হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশে মোট ব্যাংক কার্ডের সংখ্যা ছিল প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ। পাঁচ বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালের শেষে তা পাঁচ কোটি ছাড়িয়েছে।

ডিজিটাল লেনদেনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের মোট লেনদেনের অন্তত ৭৫ শতাংশ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সময় সাশ্রয়, লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, অনিয়ম-দুর্নীতি কমানো ও রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য নগদবিহীন লেনদেন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পাড়া-মহল্লার দোকানেও যাতে ডিজিটালি অর্থ পরিশোধ করা যায়, সে জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নতুন ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া বা নবায়নের ক্ষেত্রে কিউআর কোডে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ উদ্যোগ পুরোপুরি কার্যকর হলে ডিজিটাল লেনদেন আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

নগদ লেনদেন ব্যবস্থাপনায় বড় ব্যয়
নগদ টাকার ওপর নির্ভরশীলতার একটি বড় অর্থনৈতিক ব্যয়ও রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, টাকা ছাপানো, পরিবহন, ব্যাংকের ক্যাশ কাউন্টার পরিচালনা এবং গ্রাহকের হাতে পৌঁছানো– সব মিলিয়ে নগদ লেনদেন ব্যবস্থাপনায় প্রতিবছর প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়।

অন্যদিকে, ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে উৎস থেকে গন্তব্য পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে পর্যবেক্ষণের সুযোগ থাকে। ফলে অর্থের গতিপথ অনুসরণ করা সহজ হয় এবং সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করাও তুলনামূলক সহজ। এতে রাজস্ব ফাঁকি কমানো এবং অনৈতিক লেনদেন নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। লেনদেনে কোনো ভুল হলে তা সহজে বেরও করা যায়।

বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে নগদবিহীন লেনদেন ব্যবস্থার দিকে এগিয়েছে। সুইডেন, ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে নগদের ব্যবহার তুলনামূলক কম। এসব দেশে শুরুতে ডিজিটাল লেনদেনে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নগদ জমা বা উত্তোলনে বাড়তি চার্জের মাধ্যমে মানুষকে ধীরে ধীরে নগদ ব্যবহার থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

প্রযুক্তির বিস্তারে সুযোগ
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৩০ লাখ। এর মধ্যে ১৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৯০ লাখ। দেশে বর্তমানে মোবাইল সংযোগ রয়েছে প্রায় ১৮ কোটি ৬০ লাখ।

এ ছাড়া ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৯০ লাখ এবং স্মার্টফোন ব্যবহারকারী প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ এখন ডিজিটাল লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মতো অবকাঠামো ব্যবহার করছেন। 

যদিও বিগত দশকে ডিজিটাল লেনদেন দ্রুত বেড়েছে, তবু প্রয়োজনীয় ইকোসিস্টেম পুরোপুরি গড়ে না ওঠায় নগদ লেনদেনও প্রতিবছর প্রায় ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে অর্থ গ্রহণ থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো লেনদেন প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল করার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় আরটিজিএস, বিইএফটিএন ও বিএসিএইচের পাশাপাশি ‘বাংলা কিউআর’ ও ‘টাকা পে’ কার্ড চালুর মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কার্ডের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর ইস্যুকৃত কার্ডের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ১৮ লাখ। সচল রয়েছে প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ কার্ড।
এসব কার্ডের মধ্যে চাহিদার শীর্ষে রয়েছে ডেবিট কার্ড। নিজের বেতন, ব্যবসা বা অন্যান্য উৎস থেকে উপার্জিত অর্থ খরচের জন্য সাধারণত মানুষ এ কার্ড ব্যবহার করেন।
গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ইস্যু করা ডেবিট কার্ডের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৩ লাখ। এর মধ্যে সচল রয়েছে প্রায় ৩ কোটি ১২ লাখ। প্রিপেইড কার্ড ইস্যু করা হয়েছে ৮৬ লাখ ৭৯ হাজার। যার মধ্যে সচল রয়েছে প্রায় ৭৭ লাখ ৯৭ হাজার কার্ড।

এ ছাড়া ইস্যু করা ২৮ লাখ ৮ হাজার ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে সচল রয়েছে প্রায় ১৯ লাখ ৫৭ হাজার কার্ড। সুদহার ও বিভিন্ন চার্জ নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি থাকায় অন্য কার্ডের তুলনায় ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার তুলনামূলক কম।
তবে গ্রাহক আকর্ষণে ব্যাংকগুলো কেনাকাটার বিল পরিশোধে ছাড়ের পাশাপাশি বিমানবন্দরে ফ্রি লাউঞ্জ ব্যবহারের সুবিধাও দিচ্ছে।

কিছু ব্যাংক দ্রুত এগোচ্ছে
দেশে বর্তমানে ৬১টি ব্যাংক রয়েছে। তবে মোট কার্ডের উল্লেখযোগ্য অংশ রয়েছে কয়েকটি ব্যাংকের হাতে।
ক্রেডিট কার্ডে এগিয়ে আছে বেসরকারি খাতের দ্য সিটি ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংক। এ ছাড়া শীর্ষ ব্যাংকের তালিকায় রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, ইউসিবিএল, ইস্টার্ন ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক ও ব্যাংক এশিয়া।

ডেবিট কার্ডে শীর্ষে রয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। এ ছাড়া ব্যাংক এশিয়া, দ্য সিটি ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, ইউসিবিএল, ব্র্যাক ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক রয়েছে তালিকায়।
একসময় ক্রেডিট কার্ডে কেনাকাটায় বাড়তি সুবিধা দেওয়া হতো বেশি। এখন ডেবিট বা প্রিপেইড কার্ডেও নানা অফার দেওয়া হচ্ছে। ডুয়েল কারেন্সি ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে বিদেশেও অর্থ পরিশোধ করা যায়। দেশে ও বিদেশে উভয় ক্ষেত্রেই কার্ডের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কেনাকাটার বিল পরিশোধে।

অ্যাপভিত্তিক লেনদেনও বাড়ছে
কার্ডের পাশাপাশি অ্যাপভিত্তিক লেনদেনও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ কোটি ২৯ লাখ। ওই মাসে এ সেবার মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা।
এ ছাড়া মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে নিবন্ধিত অ্যাকাউন্ট রয়েছে প্রায় ১ কোটি ৪১ লাখ। গত ডিসেম্বর মাসে এ খাতে ক্যাশ ইন হয়েছে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা এবং ক্যাশ আউট হয়েছে ৩৯ হাজার কোটি টাকার বেশি।
গ্রাহক আকর্ষণে রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে এসব প্রতিষ্ঠানও বিভিন্ন অফার দিচ্ছে। ক্যাশব্যাক, মূল্যছাড় কিংবা একটি কিনলে একটি ফ্রি– এ ধরনের অফার দেখা যাচ্ছে।

ধাপে ধাপে নগদবিহীন লেনদেন
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে লেনদেন বাড়াতে ব্যাংকগুলো অনেক আগ থেকেই প্রচারণা চালাচ্ছে। লেনদেন সহজ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম প্রস্তুত করেছে।

তিনি বলেন, চলতি বছর থেকে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন বা নতুন লাইসেন্স নেওয়ার ক্ষেত্রে কিউআর কোডে পরিশোধের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অন্য কোনো সরকারি সংস্থার নীতির কারণে ডিজিটাল লেনদেনে সমস্যা দেখা দিলে আলোচনার মাধ্যমে তা সমাধান করা হচ্ছে।
আরিফ হোসেন খান বলেন, ধাপে ধাপে নগদবিহীন লেনদেন ব্যবস্থা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এটি সফলভাবে কার্যকর হলে লেনদেনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে, রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে দুর্নীতিও কমে আসবে।
 

আরও পড়ুন

×