ঢাকা রোববার, ২৮ জুন ২০২৬

ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে আমরা ১২টি নতুন পণ্য চালু করেছি

ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে আমরা ১২টি নতুন পণ্য চালু করেছি
×

মোসলেহ্‌ উদ্দীন আহমেদ

মোসলেহ্‌ উদ্দীন আহমেদ এমডি, শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ | ০৭:৫৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল: এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা কী? শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ কোনো সুবিধা দিচ্ছে?

মোসলেহ্‌ উদ্দীন আহমেদ: এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের ক্ষেত্রে জামানত-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত ব্যবসায়িক তথ্যের অভাব, আর্থিক ব্যবস্থাপনা সক্ষমতার ঘাটতি এবং বাজার অনিশ্চয়তা অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে নতুন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অনেকেরই পর্যাপ্ত স্থাবর সম্পদ না থাকায় জামানতনির্ভর অর্থায়ন ব্যবস্থায় প্রবেশ কঠিন হয়ে পড়ে। শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক ব্যবসার সম্ভাবনা, নগদপ্রবাহ, উদ্যোক্তার সক্ষমতা ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনার ভিত্তিতে অর্থায়ন মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ব্যাংক ইতোমধ্যে ব্যাংক স্টেটমেন্ট মূল্যায়নের ভিত্তিতে ‘প্রাপ্তি’ নামক অর্থায়ন সুবিধা চালু করেছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট গ্যারান্টি সুবিধার সহায়তায় জামানতবিহীন প্রায় ২৪৮ জন গ্রাহকের অনুকূলে ব্যাংক ইতোমধ্যে ২১ কোটি ৮১ লাখ টাকা বিনিয়োগ সুবিধা দিয়েছে। একই সঙ্গে অর্থায়ন ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা, সহজ শর্তে বিনিয়োগ সুবিধা প্রদান এবং উদ্যোক্তাবান্ধব সেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এসএমই খাতকে আরও গতিশীল করার উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। সম্প্রতি উদ্যোক্তাদের বহুমাত্রিক প্রয়োজন অনুযায়ী আমরা অর্থায়নের জন্য ১২টি নতুন এসএমই প্রডাক্ট চালু করেছি।

সমকাল: ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এসএমই ঋণ কার্যক্রম বর্তমান চাহিদা কতটা পূরণ করতে পারছে বলে আপনি মনে করেন?

মোসলেহ্‌ উদ্দীন আহমেদ: বাংলাদেশের এসএমই খাতে এখনও উল্লেখযোগ্য অর্থায়ন ঘাটতি রয়েছে। ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। তবে বর্তমানে ব্যাংকিং খাত আগের তুলনায় এসএমই অর্থায়নে বেশি সক্রিয় হয়েছে এবং উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন পণ্য ও সেবা চালু করছে। শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি এসএমই অর্থায়নকে শুধু বিনিয়োগ বিতরণের কার্যক্রম হিসেবে নয়, বরং উদ্যোক্তা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি কৌশলগত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করে। ২০২৫ সালে ব্যাংক চার হাজার ৫৫৪ জন নতুন গ্রাহকের অনুকূলে ৭৩৬ কোটি টাকার এসএমই বিনিয়োগ সুবিধা দিয়েছে। এর মধ্যে ২৭৭ জন নারী উদ্যোক্তার অনুকূলে ৫৬ কোটি টাকা এবং গ্রামীণ অঞ্চলের এক হাজার ৮০৮ জন উদ্যোক্তার অনুকূলে ৫৬০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। চাহিদা ও জোগানের মধ্যে এখনও যে ঘাটতি রয়েছে, তা দূর করতে শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। 

সমকাল: নারী, তরুণ ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন সহজ করতে কী ধরনের নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন?

মোসলেহ্‌ উদ্দীন আহমেদ: নারী, তরুণ ও নতুন উদ্যোক্তারা দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। তাদের জন্য অর্থায়ন সহজ করতে জামানত নির্ভরতার পরিবর্তে উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক সম্ভাবনা, দক্ষতা, উদ্ভাবনী ধারণা ও নগদ প্রবাহের ওপর ভিত্তি করে অর্থায়ন কাঠামো আরও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আর্থিক সাক্ষরতা, ব্যবসায়িক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাজার সংযোগ তৈরিতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে বিনিয়োগ সুবিধা, দ্রুত প্রসেসিং, উদ্যোক্তাবান্ধব সেবা এবং নিবেদিত সার্ভিস ডেস্কের মাধ্যমে সহায়তা দিচ্ছে। ব্যাংক ইতোমধ্যে নারী ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ‘প্রত্যয়ী’ ও ‘প্রথম উদ্যোগ’ নামক বিশেষ বিনিয়োগ সুবিধা চালু করেছে, যা তাদের আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি ও ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। এ ছাড়া সহজ শর্তে ও স্বল্প মুনাফায় নারী উদ্যোক্তাদের ও তরুণ/স্টার্ট-আপ উদ্যোক্তাদের পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় বিনিয়োগ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। 

সমকাল: এসএমই খাতকে রপ্তানিমুখী করতে কোন ধরনের আর্থিক ও নীতিগত প্রণোদনা সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে?

মোসলেহ্‌ উদ্দীন আহমেদ: বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের অভাবনীয় সাফল্য আমাদের দেখিয়েছে যে সঠিক নীতিগত সমর্থন পেলে একটি খাত কতটা বড় হতে পারে। এখন সময় এসেছে আমাদের সম্ভাবনাময় এসএমই খাতকে বিশ্ববাজারে নিয়ে যাওয়ার। চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, পাটজাত ও হস্তশিল্প, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য এবং আইটি খাতের মতো অসংখ্য এসএমই উপখাতের আন্তর্জাতিক বাজারে যুক্ত হওয়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এসএমই খাতকে রপ্তানিমুখী করতে হলে অর্থায়নের পাশাপাশি উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পণ্য তৈরি, বাজার সংযোগ এবং প্রযুক্তি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। 

সমকাল: আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের এসএমই পণ্যের প্রতিযোগিতা বাড়াতে মান নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও সার্টিফিকেশনের ক্ষেত্রে কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন?

মোসলেহ্‌ উদ্দীন আহমেদ: আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অর্জনের জন্য এসএমই উদ্যোক্তাদের পণ্যের গুণগত মান, উৎপাদন প্রযুক্তি, দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন, ক্রেতাদের আস্থা অর্জন এবং আমাদের তৈরি পণ্যের ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়াতে হলে মান নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তি ও সার্টিফিকেশনের ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় কমানো, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং পণ্যের মান উন্নয়ন করা সম্ভব। পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের জন্য মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, গবেষণা ও উন্নয়ন, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং এবং আন্তর্জাতিক বাজার সংযোগ তৈরিতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। 

সমকাল: এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য কী ধরনের প্রস্তুতি ও সহায়তা সবচেয়ে জরুরি বলে আপনি মনে করেন?

মোসলেহ্‌ উদ্দীন আহমেদ: এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও বৃদ্ধি পাবে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আমরা বৈশ্বিক বাজারে বর্তমানে যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছি, তা ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হয়ে আসবে। বড় রপ্তানিকারকদের পাশাপাশি আমাদের এসএমই খাতের ওপরও এর সরাসরি প্রভাব পড়বে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এসএমই উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তি নির্ভরতা বৃদ্ধি, উৎপাদন দক্ষতা উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা এবং বাজার বৈচিত্র্যকরণের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক অর্থায়ন ব্যবস্থা, রপ্তানি সহায়তা এবং শক্তিশালী ব্যবসায়িক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা জরুরি। একটি শক্তিশালী, প্রযুক্তিনির্ভর ও প্রতিযোগিতামূলক এসএমই খাতই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম ভিত্তি হবে। শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক উদ্যোক্তাদের পাশে থেকে অর্থায়ন, পরামর্শ ও আধুনিক ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে টেকসই ব্যবসায়িক উন্নয়নে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। এলডিসি থেকে উত্তরণকে আমরা কোনো সংকট হিসেবে দেখি না, বরং আমাদের সক্ষমতা প্রমাণের একটি বিশাল সুযোগ বলে মনে করি। শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক আমাদের দেশের এসএমই উদ্যোক্তাদের এই আপৎকালীন প্রয়োজনীয় আর্থিক ও কৌশলগত সহায়তা দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের উদ্যোক্তাদের সহজাত সৃজনশীলতা, সঠিক সরকারি নীতি এবং ব্যাংকিং খাতের আধুনিক অর্থায়ন সুবিধার মেলবন্ধনে বাংলাদেশ এলডিসি-পরবর্তী বৈশ্বিক বাজারেও বিজয়ী হিসেবে টিকে থাকবে।

আরও পড়ুন

×