সাক্ষাৎকার
ঋণ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করা প্রয়োজন
ফয়সাল রহমান
ফয়সাল রহমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রাইম ব্যাংক
প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ | ০৮:০১
| প্রিন্ট সংস্করণ
সমকাল : অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত কীভাবে অবদান রাখছে?
ফয়সাল রহমান : বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নে এমএসএমই খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বহুমাত্রিক ভূমিকা পালন করছে। স্বল্প মূলধন ও সহজ প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় এমএসএমই খাত দ্রুত ব্যবসা শুরুর সুযোগ সৃষ্টি করে, যা নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। এ খাতের সবচেয়ে বড় অবদান হলো গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি। নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে এবং নারী উদ্যোক্তা বিকাশে এমএসএমই একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। এমএসএমই খাত স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করে, যা আমদানি-নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি রপ্তানিমুখী ক্ষুদ্র শিল্পের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও অবদান রাখে। আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায়ও এ খাত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি রাজধানীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক চাপ কমিয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রসারিত করে। সার্বিকভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো এমএসএমই খাত।
সমকাল : বর্তমানে অর্থনীতি বেশ চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। এ অবস্থায় এসএমই উদ্যোগে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কীভাবে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে?
ফয়সাল রহমান : অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে এসএমই উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখা, সম্প্রসারণ এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা আরও সক্রিয়, উদ্ভাবনী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়া জরুরি। ব্যাংকগুলোর উচিত ঋণপ্রাপ্তির প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, দ্রুত এবং সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করা, যাতে উদ্যোক্তারা সময়মতো অর্থায়ন পেতে পারেন এবং ব্যবসার গতি বজায় রাখতে পারেন। জামানত নির্ভরতা কমিয়ে ব্যবসার প্রকৃত সক্ষমতা, নগদ প্রবাহ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ভিত্তিতে ঋণ প্রদান ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন, যা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদে পুনঃঅর্থায়ন, দীর্ঘমেয়াদি ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সুবিধা এবং নমনীয় পরিশোধ পরিকল্পনা চালু রাখা জরুরি, যাতে তারা চাপের মধ্যেও ব্যবসা সচল রাখতে পারেন। নারী উদ্যোক্তা, তরুণ উদ্যোক্তা এবং প্রান্তিক পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ তহবিল ও সহজ শর্তের ঋণ সুবিধা বাড়ানো গেলে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে। ডিজিটাল ব্যাংকিং, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং ফিনটেক সমাধানের মাধ্যমে গ্রামীণ ও দূরবর্তী অঞ্চলে আর্থিক সেবার পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে কেউ আর্থিক সেবা থেকে বঞ্চিত না হয়। পাশাপাশি সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স, ইনভয়েস ডিসকাউন্টিং এবং ট্রেড ফাইন্যান্সের মতো আধুনিক অর্থায়ন পদ্ধতি আরও বিস্তৃত করা হলে ক্ষুদ্র ব্যবসার নগদ প্রবাহ স্থিতিশীল থাকবে। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ক্রেডিট স্কোরিং ব্যবস্থা আধুনিকীকরণের মাধ্যমে ঋণ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করা প্রয়োজন, যাতে সঠিক উদ্যোক্তা সহজে অর্থায়ন পেতে পারেন।
সমকাল: এসএমই খাতে প্রাইম ব্যাংকের অর্থায়ন সম্পর্কে জানতে চাই।
ফয়সাল রহমান: প্রাইম ব্যাংক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ, দ্রুত ও গ্রাহকবান্ধব ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করতে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। বিশেষ করে জামানতবিহীন ঋণ পণ্য চালুর মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। ডিজিটাল ব্যাংকিং ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালুর মাধ্যমে ঋণ প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও স্বচ্ছ করার উদ্যোগ রয়েছে। প্রাইম ব্যাংক নিয়মিতভাবে এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ, সচেতনতা কার্যক্রম ও আর্থিক সাক্ষরতা কর্মসূচির আয়োজন করছে, যা উদ্যোক্তার দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করছে। এ ছাড়া সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স, ইনভয়েস ফাইন্যান্সিং এবং ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সহায়তার মাধ্যমে ব্যবসার নগদ প্রবাহ সচল রাখতে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। গ্রাম ও শহরাঞ্চলে শাখা ও এজেন্ট নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো হচ্ছে, যাতে প্রান্তিক উদ্যোক্তারা সহজে ব্যাংকিং সুবিধা পেতে পারে। সার্বিকভাবে প্রাইম ব্যাংক এসএমই খাতের টেকসই উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে বহুমুখী ও আধুনিক ব্যাংকিং সেবা প্রদান করে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
সমকাল : এসএমই খাতে আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা কীভাবে আরও কাজে লাগানো যায়?
ফয়সাল রহমান : আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা এসএমই খাতের অর্থায়ন ও ব্যবসা পরিচালনাকে আরও দ্রুত, সহজ এবং স্বচ্ছ করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ঋণ আবেদন, মূল্যায়ন এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় করা গেলে উদ্যোক্তাদের সময় ও খরচ উভয়ই কমে যাবে এবং অর্থায়ন প্রাপ্তি আরও দ্রুত সম্ভব হবে। একই সঙ্গে মোবাইল ব্যাংকিং ও অনলাইন ব্যাংকিং সেবা বিস্তারের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা যে কোনো স্থান থেকে সহজেই আর্থিক সেবা নিতে পারবেন, যা আর্থিক অন্তর্ভুক্তি আরও শক্তিশালী করবে। ডেটা অ্যানালিটিকস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ক্রেডিট স্কোরিং ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে জামানত ছাড়াই সঠিক উদ্যোক্তা নির্বাচন করা সহজ হবে এবং ঋণ ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে। ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যবসার ক্যাশফ্লো মনিটরিং আরও কার্যকর হবে, যা ব্যাংককে সঠিক সময়ে উপযুক্ত অর্থায়ন সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি ই-ইনভয়েসিং, ডিজিটাল পেমেন্ট ও সাপ্লাই চেইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করলে ব্যবসার স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির ঝুঁকি কমবে। এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য অনলাইন ট্রেনিং, ডিজিটাল ব্যবসা ব্যবস্থাপনা টুলস এবং ভার্চুয়াল পরামর্শ সেবা চালু করা গেলে তাদের দক্ষতা ও ব্যবসায়িক সক্ষমতা বাড়বে।
সমকাল : এমএসএমই খাতের বিকাশে কী কী নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
ফয়সাল রহমান : এমএসএমই খাতের টেকসই বিকাশ ও প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে নীতিগতভাবে আরও কিছু সময়োপযোগী ও ইতিবাচক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। অর্থায়ন ব্যয় আরও যৌক্তিক ও প্রতিযোগিতামূলক করার জন্য পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা ও প্রণোদনা প্যাকেজের পরিধি আরও সম্প্রসারণ এবং তা সহজলভ্য করা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবসা পরিচালনা ও সম্প্রসারণ করতে পারেন। ব্যাংকিং সেবা ও ঋণ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করা গেলে অর্থায়ন আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে– যা উদ্যোক্তাদের সময় ও ব্যয় উভয়ই কমিয়ে দেবে। আধুনিক ক্রেডিট স্কোরিং ও ক্যাশফ্লো বিশ্লেষণভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি আরও শক্তিশালী করা গেলে উদ্যোক্তাদের প্রকৃত সক্ষমতা সঠিকভাবে প্রতিফলিত হবে এবং অর্থায়নের প্রবাহ আরও গতিশীল হবে। নারী, তরুণ ও উদীয়মান উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, সহজ শর্তের অর্থায়ন এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক সহায়তা বাড়ানো গেলে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি আরও ত্বরান্বিত হবে। ক্লাস্টারভিত্তিক শিল্প উন্নয়ন, সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স এবং ডিজিটাল মার্কেটপ্লেসের সঙ্গে সংযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজারে প্রবেশের সুযোগ আরও বিস্তৃত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল লিটারেসি এবং ব্যবসা ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা উন্নয়নের উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন, যা দীর্ঘ মেয়াদে তাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। মোটকথা, একটি সমন্বিত ও ভবিষ্যৎমুখী নীতিগত কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি; যেখানে অর্থায়ন, প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাজার সংযোগ একসঙ্গে কার্যকরভাবে কাজ করবে। এর ফলে এমএসএমই খাত আরও গতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিকশিত হবে।
- বিষয় :
- সাক্ষাৎকার
