বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস ২০২৬
হেপাটাইটিস প্রতিরোধে প্রয়োজন জনসচেতনতা
অধ্যাপক ডাঃ মোহাম্মদ ইজাজুল হক লিভার রোগ বিশেষজ্ঞ
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৭ | আপডেট: ২৮ জুলাই ২০২৬ | ১২:৪৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
২০১৫ সালে বিশ্বজুড়ে ১৩ লাখ ৪০ হাজার লোক মারা গেছেন ভাইরাল হেপাটাইটিসের জটিলতায়। আর ২৫ কোটিরও বেশি মানুষ হেপাটাইটিস বি ভাইরাস (এইচবিভি) এবং প্রায় ৭ কোটি মানুষ হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের (এইচসিভি) দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ নিয়ে বসবাস করছেন। এখন বরং টিবি ও এইডসের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা কমছে; বাড়ছে ভাইরাল হেপাটাইটিসে মৃত্যুর সংখ্যা।
হেপাটাইটিসে মৃত্যুর ৯৬ শতাংশই এইচবিভি অথবা এইচসিভির কারণে। পৃথিবীতে ৮০ শতাংশ লিভার ক্যান্সারের কারণ এইচবিভি ও এইচসিভি সংক্রমণ। পরিতাপের বিষয় হলো, ৯০ শতাংশ এইচবিভি এবং ৮০ শতাংশ রোগী তাদের এই অবস্থা সম্পর্কে অবহিত নন। ফলে তারা জীবদ্দশায় কোনো এক সময়ে জটিল লিভার রোগে আক্রান্ত হন এবং তাদের অজ্ঞাতেই অন্যকেও সংক্রমিত করেন।
হেপাটাইটিস বা জন্ডিস
লিভার প্রদাহের বহিঃপ্রকাশ হলো জন্ডিস। লিভারে প্রদাহের জন্য দায়ী হেপাটাইটিস এ, বি, সি এবং ই ভাইরাস। হেপাটাইটিস এ ভাইরাস (এইচএভি) এবং হেপাটাইটিস ই ভাইরাস (এইচইভি) দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে ছড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে সংক্রমণ করে না। এইচবিভি এবং এইচসিভি রক্তের মাধ্যমে ছড়ায়। ব্যথা ও টিবির ওষুধের মতো কোনো কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও লিভারে প্রদাহ ও জন্ডিস হতে পারে। উন্নত দেশগুলোতে অতিরিক্ত মদ্যপান হেপাটাইটিসের একটি বড় কারণ।
হেপাটাইটিস বি ভাইরাস
১৯৬৫ সালে এক অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসীর রক্তে এইচবিভি আবিষ্কৃত হয়। এখন বিশ্বে প্রায় ২৫ কোটি লোক এইচবিভি আক্রান্ত, তাদের ৭৫ শতাংশই এশিয়া মহাদেশের। বাংলাদেশেই প্রায় এক কোটি মানুষ এইচবিভি আক্রান্ত। এইডসের চেয়েও ১০০ গুণ বেশি সংক্রামক এই এইচবিভি। যৌনমিলন থেকে নারী-পুরুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। মানুষের লালা এবং শরীরের যে কোনো ধরনের নিঃসরণ থেকেও সংক্রমণ হয়। এইচবিভি আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির রক্তমাখা সুচের খোঁচায় সংক্রমের সম্ভাবনা প্রায় ৩০ শতাংশ। এইচবিভি আক্রান্ত মায়ের সন্তানের জন্মের পর আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৯০ শতাংশ। তবে হ্যান্ডশেক ও কোলাকুলির মতো সামাজিক মেলামেশা অথবা রোগীর গ্লাস, চশমা, তোয়ালে, জামাকাপড় থেকে এ রোগ ছড়ায় না। আক্রান্ত মায়ের দুধের মাধ্যমেও এই ভাইরাস ছড়ায় না। আক্রান্ত হলে ১০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি এবং প্রায় ৯০ শতাংশ শিশুর বেলায় লিভারে স্থায়ী ইনফেকশন দেখা দেয়। এ ধরনের রোগীদের প্রায়ই কোনো লক্ষণ থাকে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিদেশ যাওয়ার সময় রক্ত পরীক্ষা কিংবা রক্ত দিতে অথবা টিকা নিতে গিয়ে রোগীরা তাদের শরীরে এইচবিভির উপস্থিতির কথা জানতে পারেন।
এইচবিভি প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হলো টিকা। প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু প্রত্যেকের জন্যই টিকা নেওয়া আবশ্যক। সাধারণত এক মাস পরপর করে মোট তিনটি টিকা এবং এক বছর পর আরেকটি টিকা নিতে হয়। ভাইরাসের সংক্রমণ আগেভাগে ধরা পড়লে নিরাময়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। চিকিৎসার ক্ষেত্রে মুখে খাবার ওষুধ ও ইনজেকশন রয়েছে; যেমন- এনটেকাভির, টেনোফোভির, ল্যামিভিউডিন, এডিফোভির, টেলবিভুডিন এবং ইন্টারফেরন। দেশীয় একাধিক কোম্পানিতে উৎপাদিত এসব ওষুধ সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যেই আছে।
হেপাটাইটিস সি ভাইরাস
১৯৮৯ সালে এই ভাইরাস আবিষ্কৃত হয়। পৃথিবীতে এইচসিভি আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা সাত কোটি। প্রতি বছর নতুন করে প্রায় ৩০-৪০ লাখ লোক এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন। তবে রক্ত সঞ্চালনের আগে পরীক্ষা করার ফলে উন্নত বিশ্বে এ সংক্রমণ কমে আসছে। অন্যদিকে বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশে এইচসিভির সংক্রমণ বাড়তে দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে প্রায় ৪০ লাখ লোক আক্রান্ত।
এইচসিভি ছড়ায় রক্তের মাধ্যমে, বিশেষ করে দূষিত সিরিঞ্জ ব্যবহারে। মাদকসেবীরা নিজেদের মধ্যে একই সিরিঞ্জ বারবার ব্যবহার করে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। এ ছাড়া শেভিং রেজার, ব্লেড বা ক্ষুর ব্যবহারে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। তবে যৌনমিলন বা আক্রান্ত মায়ের গর্ভস্থ শিশুর এই ভাইরাসে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা খুবই কম। শরীরে একবার এই ভাইরাস প্রবেশ করলে ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রে লিভারে স্থায়ী সংক্রমণ তৈরি করে। এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে রোগের কোনো লক্ষণ সাধারণত থাকে না। অথচ ১০-১৫ বছরের মধ্যে এদের অনেকেই লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হন; পরে তাদের লিভার ক্যান্সারও দেখা দিতে পারে। তাই এই ভাইরাসকে নীরব ঘাতক বলা হয়।
এইচসিভি ঠেকাতে কার্যকর কোনো টিকা নেই। অবশ্য প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে এইচসিভি নিরাময় যোগ্য। এর চিকিৎসায় পেগিলেটেড ইন্টারফেরন, রিবাভিরিন ও অন্যান্য মুখে খাবার ওষুধ আমাদের দেশেই পাওয়া যায়। এরপরও চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল। তাই প্রত্যেকের উচিত এইচসিভি সম্পর্কে সচেতন থেকে ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ ব্যবহার নিশ্চিত করা। শরীরে রক্ত নেওয়ার দরকার হলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং করে নিতে হবে।
এইচবিভি ও এইচসিভির দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ লোকের মৃত্যু হচ্ছে। আশার কথা হচ্ছে, এইচবিভি ও এইচসিভি প্রতিরোধযোগ্য এবং আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসায় সুস্থ করে তোলা সম্ভব। কিন্তু জনসচেতনতার অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না। তাই সরকার, চিকিৎসক, গণমাধ্যম, পেশাজীবী সংগঠন, রোগী ও সাধারণ মানুষ মিলে হেপাটাইটিসের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে; তাহলেই ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস নির্মূলে সফল হবো আমরা।
- বিষয় :
- হেপাটাইটিস
- হেপাটাইটিস বি
- দিবস