ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ ওয়াসিম

‘বড় ভাই নামের বটবৃক্ষের ছায়াটা হারিয়েছি’

‘বড় ভাই নামের  বটবৃক্ষের ছায়াটা  হারিয়েছি’
×

ওয়াসিম আকরাম

 ইব্রাহিম খলিল মামুন, কক্সবাজার ও হিরু আলম, পেকুয়া‎

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:২৭ | আপডেট: ০৫ আগস্ট ২০২৬ | ১২:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

কোটা সংস্কার আন্দোলনে চট্টগ্রামের ষোলশহরে গুলিতে নিহত পেকুয়ার শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরামের পরিবারের সবাই স্বজন হারানোর ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন। পরোপকারী ও মানবিক ওয়াসিমের সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন ছিল। তাঁর অকালমৃত্যুতে পরিবারের স্বপ্ন ভেঙেছে।

কক্সবাজারের পেকুয়ার মেহেরনামা বাজারপাড়া এলাকা থেকে চলে যাওয়া সড়কের শেষ পাকা বাড়িটি ওয়াসিমের। গত রোববার দুপুরে এ বাড়ির সামনে যেতেই দেখা হয় তাঁর মা জোসনা বেগমের সঙ্গে। ঘরের বারান্দায় সোফায় বসে ওয়াসিমের কয়েকটা ছবি বুকে নিয়ে কান্না করছিলেন। পাশে বসেছিলেন ‎ওয়াসিমের ছোট বোন সাবরিনা ইয়াসমিন। তিনি চট্টগ্রামের একটি কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
সাবরিনা বলেন, ‘ভাইয়া ছিল আমাদের পরিবারের বড় ভরসা। এসএসসি পরীক্ষার পর আমাকে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি করিয়েছিল। ওর স্বপ্ন ছিল, আমাকে ডাক্তার বানাবে। কিন্তু মা-বাবা আমার বিয়ের কথা বললে ভাইয়া বাধা দিয়ে বলেছিল, আগে ওর পড়াশোনা শেষ হোক। প্রয়োজন হলে আমি চাকরি করে ওর লেখাপড়ার খরচ চালাব। এর আগেই ভাইয়াকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আজও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, মাথার ওপরের বড় ভাই নামের সেই বটবৃক্ষের ছায়াটা আমি হারিয়ে ফেলেছি।’

ছেলেকে হারানোর পর জোসনা বেগমের রাত যেন আর কাটে না। কখনও মোবাইল ফোনে সংরক্ষিত ছেলের কণ্ঠস্বর শোনেন, কখনও চুপচাপ বসে থাকেন। দিনের বেলায় সুযোগ পেলে চলে যান কবরের পাশে। কান্নাভেজা কণ্ঠে বললেন, ‘কবরের পাশে গেলে আসতে মন চায় না। মনে হয়, ছেলেটা এখানেই আছে। খুব কষ্ট লাগে।’
জোসনা বেগম বলেন, ‘ওয়াসিম ছিল সবার নয়নের মণি। তার মানবিক কাজের জন্য সবাই তাকে খুব স্নেহ করত। সে সব সময় মানুষের বিপদে-আপদে এগিয়ে যেত। এলাকায় বন্যা হলে সে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষের খোঁজখবর নিত; তাদের বাজার-সদাই করে দিত।’
‎ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম বলেন, ‘অনেক কষ্ট, স্বপ্ন ও আশা নিয়ে ওয়াসিমকে পড়ালেখা করিয়েছি। তার স্বপ্ন ছিল, সরকারি কর্মকর্তা হয়ে দেশের মানুষের সেবা করবে। এলাকার সুবিধাবঞ্চিত ছেলেমেয়েদের পড়ালেখায় উদ্বুদ্ধ করত সে।’
সৌদি আরবে থাকাকালে ছেলের মৃত্যুসংবাদ শুনে শফিউল আলমের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছিল। তবে ভিসা জটিলতার কারণে সঙ্গে সঙ্গে দেশে ফিরতে পারেননি তিনি। এক মাস ১৭ দিন পর দেশে ফিরে প্রথম ছেলের কবরের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। এরপর তিনি আর প্রবাসে ফেরেননি।
শফিউল আলম বলেন, ‘বড় ছেলে আর ওয়াসিমকে নিয়ে সংসারটা দাঁড় করাতে চেয়েছিলাম। সবকিছু ধীরে ধীরে গুছিয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু ছেলের মৃত্যু সবকিছু এলোমেলো করে দিল।’

ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় পরিবার
ওয়াসিমকে হত্যার ঘটনায় ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়। ওয়াসিমের মা জোসনা বেগম বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
শফিউল আলম বলেন, ‘দোষীদের শাস্তি হোক আর নির্দোষরা যেন মুক্তি পায়। কেউ বিনা অপরাধে শাস্তি পেলে আমাদের সন্তানরা কবরে শান্তি পাবে না।’ জোসনা বেগম বলেন, ‘দুই বছর হয়ে গেল। এখনও বিচার হলো না। আমরা শুধু ন্যায়বিচার চাই।’
ওয়াসিমের পরিবার জানিয়েছে, গত ১৩ জুন পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের মেহেরনামার মুরারপাড়ায় ওয়াসিমের কবর জিয়ারত শেষে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সাক্ষাৎকালে ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম ও মা জোসনা বেগমের হাতে সরকারের তরফে ২০ লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র হস্তান্তর করেন প্রধানমন্ত্রী।
এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তিন দফায় ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র দেওয়া হয়। এর বাইরে বিএনপির পক্ষ থেকে এক লাখ টাকা, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দুই লাখ টাকা এবং এনসিপি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে পাঁচ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা পেয়েছে পরিবারটি।

আরও পড়ুন

×