ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছেলের কবরের পাশে সময় কাটে মিছিলি বেগমের

ছেলের কবরের পাশে সময় কাটে মিছিলি বেগমের
×

জাকির হোসেন

 নেত্রকোনা প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:২৮ | আপডেট: ০৫ আগস্ট ২০২৬ | ১২:৩৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

দুপুরের পর খানিকটা রোদ পড়েছে ঘরের সামনে ছোট্ট কবরস্থানে। একটি কবরের পাশে চুপচাপ বসে আছেন মিছিলি বেগম। কখনও কবরের মাটি ছুঁয়ে দেখেন, আবার কখনও ছেলের পুরোনো জামা বুকে জড়িয়ে ধরেন। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর বিশ্বাস হতে চায় না একমাত্র ছেলে জাকির হোসেন আর ফিরবে না।

নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার বাকলজোড়া গ্রামের জাকির হোসেন (২৪) ২০২৪ সালের ২১ জুলাই নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুরে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।

জাকিরের বয়স যখন পাঁচ বছর, তখন মারা যান তাঁর বাবা ফজলু মিয়া। জমিজমা না থাকায় স্বামীর মৃত্যুর পর ছেলেকে নিয়ে রাজধানীর নতুন বাজার এলাকায় চলে যান মিছিলি বেগম। সেখানে মানুষের বাসায় কাজ করে আর ফাঁকে ফাঁকে ভাঙাড়ি কুড়িয়ে কোনোমতে চলত সংসার। ছেলে একটু বড় হলে মায়ের সঙ্গে ভাঙাড়ি কুড়ানো শুরু করেন। এরপর কাঁচপুরে ঠিকাদারের অধীনে ওয়াসার পানির লাইন মেরামতের কাজ শুরু করেন। তাঁর আয়ে বদলাতে শুরু করে তাদের জীবন।
মিছিলি বেগম বলেন, ছোট ছেলেকে রেখে মানুষের বাসায় কাজ করতে যেতাম। রাস্তায় রাস্তায় ভাঙাড়ি কুড়িয়ে, মানুষের বাসায় কাজ করে ছেলেটাকে বড় করেছি। ভেবেছিলাম, এবার দুঃখের দিন শেষ হবে। কিন্তু একটা গুলি আমার সবকিছু শেষ করে দিল।

তিনি আরও বলেন, ছেলে বলত, মা, আর কষ্ট করতে হবে না। কিছু টাকা জমিয়ে গ্রামের বাড়িতে ১৫ শতক জমি কিনেছি। সেখানে একটা ঘর তুলব, এই ছিল আমাদের স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি।

মিছিলি বেগমের ভাষ্য, জুলাই আন্দোলন শুরু হওয়ার পর কয়েক দিন জাকির বাসায় ফেরেনি। ফোনে বলত, রাস্তাঘাট নিরাপদ নয়, গুলি চলছে। ২১ জুলাই বিকেলে কাজ শেষে সহকর্মীদের সঙ্গে পাশের একটি চায়ের দোকানে যায়। দোকানের সামনে পৌঁছাতেই একটি গুলি তার পিঠে লাগে। প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে একটি গলিতে গিয়ে পড়ে যায়। সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

সেদিন রাতেই সহকর্মীরা জাকিরের মরদেহ নিয়ে যান বাড্ডার বাসায়। এরপর মিছিলি বেগম ছেলের মরদেহ নিয়ে রওনা দেন গ্রামের বাড়ির পথে। পরদিন সকালে জানাজা শেষে তাঁর মরদেহ দাফন করা হয় সেই জমিতেই, যেখানে একদিন থাকার জন্য একটি ঘর নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন মা-ছেলে।

মিছিলি বেগম বলেন, যে জায়গায় ঘর করার কথা ছিল, সেই জায়গাতেই এখন আমার ছেলে ঘুমিয়ে আছে। আমি প্রায় প্রতিদিন ওর কবরের কাছে এসে বসে থাকি। মনে হয়, এই বুঝি ফিরে আসবে। মিছিলি বেগম শান্ত গলায় বলেন, সবই আছে, শুধু আমার ছেলেটা নেই। ও যদি ফিরে আসত, আমার আর কিছু লাগত না।

জাকিরের খালাতো ভাই এন্টাস মিয়া বলেন, আন্দোলনের সময় জাকির নিয়মিত ফোন করে আত্মীয়স্বজনকে সাবধানে চলাফেরা করতে বলত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেই আর ফিরে আসতে পারেনি। খালার পৃথিবীটা ওকেই ঘিরে ছিল। এখন সেই পৃথিবীটাই শূন্য হয়ে গেছে।

নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান জানান, জুলাই আন্দোলনে শহীদ জাকিরের পরিবারের জন্য সরকারি সহায়তার আওতায় একটি ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। তাঁর মায়ের নামে ১০ লাখ টাকার স্থায়ী আমানত (এফডিআর) করা হয়েছে। এ ছাড়াও সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

×