ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জুলাই স্মৃতি জাদুঘর আজ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী

জুলাই স্মৃতি জাদুঘর আজ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
×

ভাইয়ের মরদেহ নিয়ে দুই বোনের মিছিলের দৃশ্যটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রতীকে পরিণত হয়। জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে -ফাইল ছবি

 দেলওয়ার হোসেন

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ ৫ আগস্ট বুধবার জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। এরপর গণভবনে অবস্থিত এই জাদুঘর দর্শনার্থীর জন্য খুলে দেওয়া হবে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে জাদুঘরটির উদ্বোধনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি।

এদিকে, জাদুঘর পরিচালনায় জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও ছয় মাসেও পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা যায়নি। ফলে এখন আউটসোর্সিং জনবল দিয়ে চলবে জুলাই জাদুঘর। এ নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ, কোনো প্রতিষ্ঠানে আউটসোর্সিং বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ করার সময় বিভিন্ন ধরনের অসুবিধা ও জটিলতা দেখা দেয়। এর মধ্যে প্রধান সমস্যা হলো– চাকরির অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা না থাকা, স্বল্প পারিশ্রমিক বা বেতন বকেয়া থাকা, নিয়ন্ত্রণ ও গোপনীয়তা বজায় রাখার ঝুঁকি।
প্রাপ্তবয়স্কদের প্রবেশে টিকিটের মূল্য ৫০, শিশুদের ২৫ সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে খুলে দেওয়া হবে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর। 

প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য টিকিটের মূল্য ৫০ টাকা এবং শিশুদের জন্য ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।
সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, আজ সকাল ৯টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাদুঘরটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনের পর সাংবাদিকদের জন্য জাদুঘর পরিদর্শনের সুযোগ রাখা হবে। মন্ত্রী বলেন, একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী এলে ব্যবস্থাপনা কঠিন হতে পারে। এ কারণে নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক (স্লট) প্রবেশের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তাই দর্শনার্থীদের আগে থেকেই অনলাইনে বুকিং করতে হবে।
সংস্কৃতিমন্ত্রী জানান, উদ্বোধন অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বীরত্বগাথা ও আত্মত্যাগের স্মৃতিচারণা করে জুলাইযোদ্ধা এবং জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যরা বক্তব্য দেবেন। একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ, গণমানুষের অংশগ্রহণ এবং বিজয়ের ইতিহাস নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হবে। থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বে দেশের বিশিষ্ট শিল্পীদের অংশগ্রহণে দেশাত্মবোধক গান, আবৃত্তি পরিবেশনার মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, দেশপ্রেম ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ তুলে ধরা হবে। মন্ত্রী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর প্রকল্পে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে, তা তদন্তে কমিটি গঠন করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জাদুঘরের জনবল নিয়োগ নিয়ে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, নিয়োগ মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী করা হবে। জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে রাজধানীসহ সারাদেশে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। জাদুঘর উদ্বোধন উপলক্ষে বিকেলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কনসার্টের আয়োজন করা হয়েছে। 

নিয়োগ হয়নি জনবল
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের ৯৬টি পদে নিয়োগের জন্য গত ২৯ জানুয়ারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আবেদনের সময় দেওয়া হয়েছিল। তবে সেই নিয়োগের পরীক্ষার তারিখ ছয় মাসেও ঘোষণা হয়নি। গত ফেব্রুয়ারিতে লিখিত পরীক্ষা ছাড়া সরাসরি মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হলে সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন চাকরিপ্রার্থীরা। এরপর জাদুঘর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, জাদুঘরের ৯৬টি পদে নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষা গত ৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। এর পর থেকে এই নিয়োগের কোনো অগ্রগতি নেই। জানা যায়, জাতীয় জাদুঘরের ১৫ কর্মকর্তা-কর্মচারী জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। জুলাই জাদুঘর চালু হলে এই ১৫ কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। 
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব বলেন, ৯৬টি পদের বিপরীতে প্রায় ১৫ হাজার প্রার্থী আবেদন করেছেন। আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই চলছে। নিয়োগের জন্য তাড়াহুড়া করা হচ্ছে না। এ জন্য নিয়োগ সম্পন্ন হয়নি। এখন আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কিছু জনবল নিয়োগ দিয়ে কাজ চালানো হবে। এরপর শিগগির নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হবে। এদিকে, গত ২৯ জুলাই জাদুঘরের মহাপরিচালক পদে নতুন নিয়োগ পাওয়া মোহাম্মদ কামরুজ্জামান এখনও যোগদান করেননি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তীব্র গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হন শেখ হাসিনা। তিনি ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর গণভবনে ঢোকে জনতার স্রোত। বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। ভাঙচুরে অনেকটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন। সেই সঙ্গে চলে লুটপাট। ভবনের বিদ্যুতের সুইচবোর্ড পর্যন্ত উপড়ে ফেলা হয়। বড় করে গণভবন লেখা বোর্ডটিও ভেঙে নিয়ে যাওয়া হয়।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত গণভবনের আয়তন ১৭ দশমিক ৬৮ একর। ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভবনটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেয়। ওই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর জাদুঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য সিদ্ধান্ত নেয় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। ওই বছরের ২৪ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সভায় নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।

ঘোষণা দিয়েও হয়নি উদ্বোধন
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাদুঘরটি একাধিকবার উদ্বোধনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাদুঘরটি একাধিকবার পরিদর্শন করে দ্রুত খুলে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। যদিও সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়নি। গত বছরের ১৪ জুলাই গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী জানিয়েছিলেন, ওই বছরের ৫ আগস্ট উদ্বোধন করা হবে। তবে তা আর হয়নি। পরে বিদেশি কূটনীতিকদের জাদুঘর পরিদর্শনে নেওয়া হয়, যা প্রকল্পের দৃশ্যমান অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়। 
গত ১২ মে জাদুঘর পরিদর্শন শেষে সংস্কৃতিবিষয়কমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী জানিয়েছিলেন, চলতি আগস্টের ৫ তারিখের মধ্যেই জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর সবার জন্য উন্মুক্ত করা হবে। আগস্টে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই জাদুঘর উদ্বোধন করবেন– স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদও সংসদে এ কথা জানান।
 
জাদুঘর নির্মাণে খরচ হয়েছে ১১০ কোটি ৯২ লাখ টাকা
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, জাদুঘরটি নির্মাণে গণপূর্ত বিভাগ ও জাতীয় জাদুঘর মোট বরাদ্দ পেয়েছিল ১২৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। মোট খরচ হয়েছে ১১০ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এসব অর্থ ব্যয়ে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া জাদুঘর পরিচালনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। গণভবনের ক্ষতিগ্রস্ত মূল ভবন সংস্কারসহ পূর্ত ও বৈদ্যুতিক অবকাঠামোগত কাজ করেছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। ভাস্কর্য নির্মাণ, নিদর্শন সংগ্রহ ও শিল্পকর্ম কেনা, গ্যালারি সাজানো, তথ্য ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ, অভ্যন্তরীণ শোভাবর্ধন এবং অফিস আসবাব ও সরঞ্জাম কেনার দায়িত্ব ছিল জাতীয় জাদুঘরের।
শুরুর দিকে জাতীয় জাদুঘরের অধীনে এটি পরিচালনার জন্য সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। জাদুঘরের শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ছিল। পরে এ অবস্থান থেকে সরে আসে সরকার। এরপর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গণভবনের সম্পূর্ণ জমি ও স্থাপনা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে হস্তান্তর করে। এ দুই মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এটি বাস্তবায়ন করছে।

 

আরও পড়ুন

×