কৃত্রিম খুলি নিয়ে শিশু মুসার লড়াই
বাসিত খান মুসা
বকুল আহমেদ
প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪৪ | আপডেট: ০৫ আগস্ট ২০২৬ | ১২:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আছে দুই শিশু। প্লাস্টিকের খেলনা নিয়ে মেতেছে তারা। বাসায় ঢুকে নাকে তরল খাবারের নল লাগানো শিশুকে দেখে বুঝতে বাকি রইল না, সে বাসিত খান মুসা। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের গুলিতে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছিল সে। মাথার এক পাশে কৃত্রিম খুলি নিয়ে মৃত্যুকে হারিয়ে জীবন লড়াইয়ে জয়ী হলেও সংগ্রাম এখনও থামেনি।
শরীরের এক পাশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত; হাঁটতে পারে না। কথাও স্পষ্ট না। স্বাভাবিক খাবারে ফিরতে পারেনি এখনও। একমাত্র সন্তানকে আবার স্বাভাবিক জীবনে দেখার জন্য প্রতিদিন স্বপ্ন বুনছেন মা-বাবা।
মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়া মুসা বেঁচে গেলেও জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের হিসাবে গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ হারিয়েছে ১২৮ শিশু। কেউ রাস্তায় বের হয়ে, কেউ ঘরবাড়ির ছাদে কিংবা বারান্দায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছে।
মাথায় কৃত্রিম খুলি নিয়ে মুসা
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়েছে। কিন্তু সহিংসতার ক্ষত এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে অনেক শিশু-কিশোর-তরুণ। শিশু বাসিত খান মুসা তাদেরই একজন। গণঅভ্যুত্থানের সময় মুসাদের বাসা ছিল রামপুরা থানার বিপরীত পাশে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সেই বাসা ছেড়ে পরিবার নিয়ে মালিবাগে ভাড়া বাসায় ওঠেন শিশুটির বাবা মোস্তাফিজুর রহমান রনি। গত ১ আগস্ট দুপুরে ওই বাসায় গিয়ে কথা হয় তার বাবা ও ফুফুর সঙ্গে। তখন তার চাকরিজীবী মা কর্মস্থলে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় মুসার বয়স ছিল ৬ বছর।
দুপুরে যে দুই শিশুর সঙ্গে মুসাকে খেলতে দেখা যায়, তারা মুসার ফুফাত ভাই। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসকরা মুসার বাবা মোস্তাফিজুর রহমানকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, তাকে শিশুদের মাঝে রাখতে হবে। তাই একমাত্র বোনের পরিবারসহ একই বাসায় থাকেন মোস্তাফিজ। বোনের দুই ছেলের সঙ্গে সারাক্ষণ খেলাধুলা করে সে।
মুসার বাবা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, হাসপাতাল থেকে এক বছর পর যখন মুসাকে বাসায় নেওয়া হয়েছিল, তখন কথা বলতে পারত না। এখন অস্পষ্ট হলেও কথা বলার চেষ্টা করে। চিবিয়ে খেতে পারে না। নলের মাধ্যমে তরল খাবার দিতে হয়। নলের ঝুলে থাকা অংশ খুব যত্ন করে ঘাড়ে ঝুলিয়ে রাখে সে। ডান হাত ও ডান পা পক্ষাঘাতগ্রস্ত। একা হাঁটতে পারে না। ধরে হাঁটানোর চেষ্টা করা হয়।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই দুপুরে মালিবাগে নিজেদের ইলেকট্রিক পণ্যের দোকানে থাকা বাবার খাবার নিয়ে যাওয়ার জন্য বের হবেন। তখন ৩টা। এ সময় মুসা বায়না ধরে আইসক্রিম খাবে। দাদি মায়া ইসলাম ও বাবার সঙ্গে সিঁড়ি বেয়ে বাসার নিচে নামে মুসা। তখন বাসার সামনে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ চলছিল। মা ও ছেলেকে নিয়ে বাসার নিচে গ্যারেজে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। হঠাৎ একটি গুলি এসে লাগে মুসার মাথায়। মাথা ভেদ করে গুলিটি বেরিয়ে শিশুটির দাদির পেটে লাগে। দাদি পরদিন মারা যান।
মুসাকে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য নিতে হয় সিঙ্গাপুরে।
- বিষয় :
- জুলাই গণহত্যা