ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রযুক্তি তৈরিতে প্রস্তুত প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি

প্রযুক্তি তৈরিতে প্রস্তুত প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি
×

প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ল্যাবে কাজ করছেন শিক্ষার্থীরা সমকাল

ড. শহিদুল ইসলাম খান নাঈম

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

একসময় কম্পিউটার ছিল নতুন প্রযুক্তি। পরে ইন্টারনেট বদলে দিয়েছে মানুষের জীবন ও কাজের ধরন। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সেই পরিবর্তনের গতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কাজের ধরন বদলাচ্ছে, নতুন দক্ষতার চাহিদা তৈরি হচ্ছে। ফলে আগামী দিনের কর্মবাজারে বিদ্যমান জ্ঞান ও দক্ষতা যথেষ্ট হবে কিনা, তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থার সামনে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। 
তবে বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রযুক্তির ব্যবহারে একদমই পিছিয়ে নেই। বৈশ্বিক মানের সঙ্গে তাল মেলাতে হলে গবেষণা, আধুনিক গবেষণাগার, শিক্ষক উন্নয়ন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ আরও শক্তিশালী করতে হবে। প্রযুক্তি শুধু কম্পিউটার, স্মার্ট ক্লাসরুম কিংবা আধুনিক সফটওয়্যারের নাম নয়। এর আসল সার্থকতা তখনই, যখন তা শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তিকে শানিত করে, তাকে প্রশ্ন করতে শেখায় এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে সক্ষম করে।

বদলাতে হবে শিক্ষার পুরো ইকোসিস্টেম
আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে শুধু সিলেবাস পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; আধুনিক করতে হবে শিক্ষার পুরো পরিবেশ। প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটিতে এ ক্ষেত্রে শিল্প, উদ্ভাবন ও গবেষণায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিবিষয়ক কর্মশালা, সেমিনার, হ্যাকাথন এবং প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। শহিদুল ইসলাম খানের ভাষায়, শুধু বোর্ডে লিখে টেকনোলজি শেখানো যায় না; প্রযুক্তিকে স্পর্শ করতে হয়, পরীক্ষা করতে হয়, ভুল করতে হয়, আবার নতুন করে চেষ্টা করতে হয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায় প্রকৌশল শিক্ষায়। একজন প্রকৌশলীকে শুধু সূত্র, তত্ত্ব কিংবা পরীক্ষার খাতার উত্তর জানলে চলে না। জানতে হয় কোনো সমস্যা কেন তৈরি হচ্ছে, তার সমাধান কী এবং সেই সমাধান বাস্তবে কতটা কার্যকর। তাই শ্রেণিকক্ষের পাশাপাশি ল্যাবরেটরি, গবেষণা, প্রকল্প ও হাতে-কলমে কাজের গুরুত্ব বাড়ছে।

তত্ত্ব থেকে ল্যাব, ল্যাব থেকে বাস্তব প্রয়োগ
প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই), তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল (ইইই) এবং পুরকৌশল– তিন বিভাগেই পাঠ্যক্রমের সঙ্গে ব্যবহারিক শিক্ষার সমন্বয় করা হয়েছে।

সিএসই বিভাগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং ও ডেটা সায়েন্সের মতো বিষয়ের পাশাপাশি কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, সফটওয়্যার প্রকৌশল, ডিজিটাল লজিক, মাইক্রোপ্রসেসর ও ইন্টারফেসিং, ডিজিটাল সিগন্যাল প্রক্রিয়াকরণ এবং যোগাযোগ প্রযুক্তিতে তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি হাতে-কলমে শেখার সুযোগও বিস্তৃত হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা শুধু কোড লেখা বা তাত্ত্বিক ধারণা শেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; প্রযুক্তিকে বাস্তব সমস্যায় কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেই অভিজ্ঞতাও অর্জন করছে।
ইইই বিভাগে ইলেকট্রনিকস, তড়িৎ যন্ত্র, মাইক্রোপ্রসেসর, যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিয়ে ব্যবহারিক শিক্ষার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অটোমেশন ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মাইক্রোপ্রসেসর, যোগাযোগ প্রযুক্তি, ডিজিটাল লজিক ডিজাইন এবং বিদ্যুৎশক্তি রূপান্তর-সংক্রান্ত ল্যাবে হাতে-কলমে কাজ করছে শিক্ষার্থীরা।
পুরকৌশল বিভাগের বিষয়টি সরাসরি মাঠের সঙ্গে যুক্ত। জরিপ, তরলযন্ত্রবিদ্যা, মাটি, কংক্রিট ও নির্মাণসামগ্রী পরীক্ষা, পরিবহন প্রকৌশল, কাঠামো বিশ্লেষণ, ভূপ্রকৌশল ও পরিবেশ প্রকৌশলের বিভিন্ন ব্যবহারিক কাজের পাশাপাশি নিয়মিত সাইট পরিদর্শন ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান ভ্রমণ শিক্ষার্থীদের বাস্তব নির্মাণকাজের সঙ্গে পরিচিত করছে।
অর্থাৎ, প্রকৌশল শিক্ষাকে পরীক্ষার খাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তত্ত্ব থেকে ল্যাব, ল্যাব থেকে প্রকল্প এবং প্রকল্প থেকে বাস্তব প্রয়োগের ধারায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে।
প্রযুক্তি শেখার পাশাপাশি প্রযুক্তি তৈরির প্রস্তুতি
শিক্ষার্থীদের নিজস্ব আগ্রহে শেখার সুযোগ তৈরিতে প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটিতে রয়েছে প্রাণবন্ত এআই ক্লাব, সাইবার সিকিউরিটি ক্লাব ও রোবটিক্স ক্লাব। এসব প্ল্যাটফর্মে তারা প্রকল্প নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। তবে লক্ষ্য শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার শেখানো নয়। শিক্ষার্থীরা যেন নিজেরাই প্রকল্পের ধারণা দিতে পারে, প্রোটোটাইপ তৈরি করতে পারে, সমস্যার সমাধান উপস্থাপন করতে পারে এবং ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে– সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ গবেষণা
উচ্চশিক্ষার শক্তি শুধু পাঠদানে নয়; গবেষণা ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতেও। অন্যের আবিষ্কার পড়িয়ে ভালো শিক্ষক হওয়া সম্ভব, কিন্তু নতুন জ্ঞান সৃষ্টি ছাড়া সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠা কঠিন। এই ভাবনা থেকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণায় আরও বেশি সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে গবেষণা যেন শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণার ফল মানুষের জীবনে পৌঁছাতে হবে, দেশের সমস্যার সমাধানে কাজে লাগতে হবে এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহার হতে হবে।
গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সহায়তার পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি অর্থায়ন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ গবেষণা এবং বিভিন্ন গবেষণা অনুদানের সুযোগ কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান নিয়মিত গবেষণা বরাদ্দের পাশাপাশি আরও এক কোটি টাকা গবেষণা প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন।

সিজিপিএর বাইরেও মূল্যায়ন 
বর্তমান বিশ্বে শুধু সিজিপিএ দিয়ে একজন শিক্ষার্থীর সাফল্য নির্ধারিত হয় না। সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা, যোগাযোগ, টিমওয়ার্ক ও অভিযোজনের মতো দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রোগ্রামিং কনটেস্ট, হ্যাকাথনের মতো বিষয়ের মাধ্যমে বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি করার চেষ্টা চলছে। 

চাকরি খোঁজার পাশাপাশি কর্মসংস্থান তৈরির প্রস্তুতি
প্রযুক্তি বাংলাদেশের তরুণদের সামনে বৈশ্বিক কর্মবাজারের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। ঢাকায় বসেই বিশ্বের অন্য প্রান্তের ক্লায়েন্টের সঙ্গে কাজ করা সম্ভব। একই সঙ্গে একজন তরুণ উদ্যোক্তা হয়ে অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেন। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতেই শিক্ষার্থীরা যেন বাস্তব প্রকল্পে কাজ করতে পারে, পোর্টফোলিও তৈরি করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য প্রস্তুত হয়– সে লক্ষ্যেই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর অংশ হিসেবে প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির সব বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য সপ্তাহব্যাপী ই-কর্মার্স ও ফিল্যান্সিং সার্টিফিকেট কোর্স চালু করা হয়েছে।
চ্যালেঞ্জের মধ্যেই সম্ভাবনা
বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামনে এখনও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে– যোগ্য শিক্ষক, আধুনিক গবেষণাগার, গবেষণার অর্থায়ন, শিক্ষক উন্নয়ন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে এআই, রোবটিক্স, সাইবার সিকিউরিটি ও অ্যাডভান্সড কম্পিউটিংয়ের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল ক্ষেত্রে কয়েক বছর আগের ল্যাবরেটরি বা কারিকুলাম দিয়ে দীর্ঘদিন এগিয়ে থাকা কঠিন। ফলে শিক্ষাব্যবস্থাকেও প্রযুক্তির পরিবর্তনের গতির সঙ্গে এগোতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের সমন্বয়ও জরুরি। বাংলাদেশের বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। তাদের হাতে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতার সুযোগ তুলে দিতে পারলে তারা শুধু দেশের কর্মবাজারে প্রতিযোগিতা করবে না, বৈশ্বিক কর্মবাজারেও নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের নয়। প্রশ্ন হলো, বিশ্ববিদ্যালয় কি এমন প্রকৌশলী তৈরি করতে পারছে, যারা নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করার পাশাপাশি নতুন সমস্যার সমাধানও তৈরি করতে পারে?
প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল শিক্ষায় ল্যাব, গবেষণা, প্রকল্প ও উদ্ভাবনের ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, সেই বৃহত্তর পরিবর্তনের লক্ষ্যও সেখানেই– শিক্ষার্থী যেন শুধু উত্তর জানে না; সমস্যা শনাক্ত করতে পারে, সমাধান তৈরি করতে পারে এবং সেই সমাধান বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারে।

লেখক: অধ্যাপক ও ডিন, স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি

আরও পড়ুন

×