ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গবেষণা, উদ্ভাবননির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা গড়তে কাজ করছে ইউআইইউ

গবেষণা, উদ্ভাবননির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা গড়তে কাজ করছে ইউআইইউ
×

ড. মো. আবুল কাশেম মিয়া

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, শিক্ষার মানোন্নয়ন, সামাজিক অগ্রগতি এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দেশের উচ্চশিক্ষার ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার উপযোগী মানবসম্পদ তৈরিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। 
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য শুধু শিক্ষার্থীর সংখ্যা, অবকাঠামো কিংবা একাডেমিক কার্যক্রমের পরিধি দিয়ে পরিমাপ করা উচিত নয়। জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণার উৎকর্ষ, উদ্ভাবনী সক্ষমতা, ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে কার্যকর সংযোগ এবং সমাজ ও দেশের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনার সক্ষমতাই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।

এ লক্ষ্য সামনে রেখে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ) উচ্চশিক্ষাকে কেবল শ্রেণিকক্ষ ও পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও বাস্তব দক্ষতার সমন্বয়ে একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা শুধু শিক্ষার্থীদের হাতে একটি ডিগ্রি তুলে দিই না, বরং তাদের জ্ঞানী, দক্ষ, নৈতিকতা, সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলি; যাতে কর্মক্ষেত্রে সফলতার পাশাপাশি পরিবর্তনশীল বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে জাতীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ে কার্যকর নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হয়।
বর্তমান বিশ্বে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান ও সক্ষমতা নির্ধারণে গবেষণা ও উদ্ভাবনের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। তাই গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উচ্চশিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে ইউআইইউ। আমাদের শিক্ষক ও গবেষকরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, জলবায়ু পরিবর্তন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অর্থনীতি, টেকসই উন্নয়নসহ সমকালীন গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা পরিচালনা করছেন। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন জার্নালে গবেষণা প্রকাশের পাশাপাশি দেশ-বিদেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণা এবং গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও পরিবেশ তৈরিতে আমরা ধারাবাহিকভাবে গুরুত্ব দিচ্ছি। আমরা মনে করি, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেবল জার্নালে প্রকাশিত হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। গবেষণার ফল যেন সরকার, ইন্ডাস্ট্রি ও সমাজের বাস্তব সমস্যার সমাধানে কাজে লাগে, সেগুলোর বিষয়ে আমরা সমানভাবে গুরুত্ব দিচ্ছি।

প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। ইউআইইউর শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক রোবোটিকস, রোভার ও আন্ডারওয়াটার রোবট প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিক সাফল্য অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশের মেধা ও সক্ষমতাকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরছে। এসব অর্জন শুধু প্রতিযোগিতায় ভালো করার সাফল্য নয়; বরং আমাদের তরুণ প্রজন্মের মেধা, সৃজনশীলতা, পরিশ্রম ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রতিফলন। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা সঠিক শিক্ষা, দিকনির্দেশনা, গবেষণার সুযোগ ও উদ্ভাবনের অনুকূল পরিবেশ পেলে বিশ্বমানের প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা তৈরির সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করা উচিত।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো একাডেমিক শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের বাস্তব চাহিদার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করা। চাকরির বাজারের পরিবর্তিত চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ ও যোগ্য গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ইউআইইউ শিক্ষার্থীদের একাডেমিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি তাদের বাস্তব কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। শিক্ষার্থীদের শিল্প খাত ও বাস্তব কর্মপরিবেশের সঙ্গে পরিচিত করতে করপোরেট বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে নিয়মিত সেমিনার, কর্মশালা, সিম্পোজিয়াম, ফিল্ড ভিজিট এবং বিভিন্ন দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। একই সঙ্গে শিল্প খাতের পরিবর্তিত চাহিদা ও করপোরেট বিশেষজ্ঞদের মত বিবেচনায় নিয়ে ইউআইইউর পাঠ্যক্রম নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা পরিবর্তন ও আধুনিকায়ন করা হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা একাডেমিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক জ্ঞান, যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ, পেশাগত আচরণ এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা অর্জনের সুযোগ পায়। ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে সফল হতে এসব দক্ষতার গুরুত্ব অপরিসীম।

আমার দৃষ্টিতে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন ও কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় ও ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে শক্তিশালী অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা জরুরি। ইন্ডাস্ট্রি জানে তাদের কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন, আর বিশ্ববিদ্যালয় সেই প্রয়োজন অনুযায়ী জ্ঞান ও দক্ষতা তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। এই দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা যত বাড়বে, তত বেশি কর্মবাজারের উপযোগী গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে যৌথ গবেষণা, শিল্প খাতভিত্তিক প্রকল্প, ইন্টার্নশিপ, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি, কর্মশালা এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মতো উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এর মাধ্যমে যেমন শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করবে, তেমনি শিল্প খাতও নতুন জ্ঞান, প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদের সুবিধা পাবে। একই সঙ্গে এসব উদ্যোগ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও উদ্ভাবনের ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে পারে।

বাংলাদেশ জ্ঞান, উদ্ভাবন, দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের জন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু জ্ঞান প্রদানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তাদের গবেষণা, উদ্ভাবন, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জাতীয় সমস্যার সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতা, নৈতিকতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং একটি টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় তখনই সত্যিকারের একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, যখন তার জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের সুফল বৃহত্তর সমাজ ও দেশের মানুষের উন্নয়নে কাজে লাগে। ইউআইইউ জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির কাজ করে যাচ্ছে। আমার বিশ্বাস, আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের গবেষক, উদ্ভাবক, উদ্যোক্তা, পেশাজীবী ও নেতৃত্বদানকারী নাগরিক। তাদের মেধা, দক্ষতা ও সৃজনশীলতাকে সঠিকভাবে বিকশিত করতে পারলেই আমরা একটি সমৃদ্ধ, জ্ঞাননির্ভর, উদ্ভাবনী এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।

লেখক: অধ্যাপক এবং উপাচার্য, ইউআইইউ

আরও পড়ুন

×