ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শুধু সনদ নয়, সক্ষমতাও বাড়াচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

শুধু সনদ নয়, সক্ষমতাও বাড়াচ্ছে  বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়
×

ফারুক হাসান

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫০

| প্রিন্ট সংস্করণ

শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিবর্তন এবং নতুন কর্মসংস্থানের ধরন আমাদের সামনে যেমন সম্ভাবনা তৈরি করছে, তেমনি দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার চ্যালেঞ্জও বাড়াচ্ছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে তরুণ প্রজন্ম। আধুনিক জ্ঞান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ ও নেতৃত্বের দক্ষতা দিতে পারলে বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত সুবিধা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে। সে কারণেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব এখন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

উচ্চশিক্ষা বিস্তারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় 
তিন দশকের বেশি সময়ে বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খাত উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সালে ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১১০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদিত ছিল। এর মধ্যে ১০৩টি শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৪১৪ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছিলেন; তাঁদের মধ্যে নারী ১ লাখ ২৫ হাজার ১০ জন এবং বিদেশি শিক্ষার্থী ৮২৬ জন।
প্রকৌশল ও প্রযুক্তি, ব্যবসায় প্রশাসন, আইন, ফার্মাসি, কম্পিউটার বিজ্ঞান, ফ্যাশন, টেক্সটাইলসহ নানা কর্মমুখী বিষয়ে এসব বিশ্ববিদ্যালয় বিপুলসংখ্যক তরুণকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দিচ্ছে। ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এখন আর উচ্চশিক্ষার বিকল্প ব্যবস্থা নয়; মানবসম্পদ উন্নয়নের মূল কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। 

সনদ নয়, সক্ষমতাই হোক সাফল্যের মাপকাঠি
শুধু একটি সনদ কর্মজীবনের সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। জ্ঞানকে কাজে লাগানো, তথ্য বিশ্লেষণ, সমস্যা সমাধান, দলগত কাজ এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও জরুরি। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপে তৃতীয় পর্যায়ের শিক্ষা অর্জনকারীদের বেকারত্বের হার ছিল ১১.২ শতাংশ, যেখানে জাতীয় গড় ৪.২ শতাংশ। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা ও কর্মবাজারের প্রয়োজনীয় দক্ষতার মধ্যে সংযোগ আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
তাই ডিগ্রিভিত্তিক শিক্ষা থেকে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় যেতে হবে। পাঠ্যক্রমকে নিয়মিত হালনাগাদ করে প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা, ল্যাবরেটরি কাজ, শিল্পপরিদর্শন, ইন্টার্নশিপ, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি, কেস স্টাডি ও বাস্তব সমস্যার সমাধানের সুযোগ বাড়াতে হবে।

শিল্পের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেতুবন্ধ
তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্প এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ৮.৮৪ শতাংশ বেড়ে ৩৯.৩৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে নিটওয়্যার রপ্তানি ২১.১৬ বিলিয়ন এবং ওভেন পোশাক ১৮.১৯ বিলিয়ন ডলার। আরএমজি খাত দেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮১.৫ শতাংশ জোগান দিয়েছে এবং প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা শুধু সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করতে পারে না। উৎপাদনশীলতা, অটোমেশন, এআই, পণ্য বৈচিত্র্য, ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন, টেকসই উৎপাদন, সার্কুলার অর্থনীতি ও উচ্চমূল্যের পণ্যে যেতে প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ। এখানেই বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প অংশীদারিত্বের গুরুত্ব।

বিইউএফটির অভিজ্ঞতা
এই দর্শন বিইউএফটির শিক্ষাদর্শনের অন্যতম ভিত্তি। টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং, নিটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, অ্যাপারেল ম্যানুফ্যাকচারিং ও টেকনোলজি, অ্যাপারেল মার্চেন্ডাইজিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টসহ শিল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি ল্যাব, ইন্টার্নশিপ, প্রকল্প ও গবেষণার সুযোগ রয়েছে। অ্যাপারেল স্টাডিজ অনুষদে প্রায় ৩ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছেন এবং ব্যবহারিক শিক্ষা ও শিল্প-সম্পৃক্ততার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউএফটির) ক্যারিয়ার বিভাগ ক্যারিয়ার পরামর্শ, ইন্টার্নশিপ, চাকরির সুযোগ, শিল্পপ্রশিক্ষণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সহযোগিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছে। ২০২৬ সালে উর্মি গ্রুপ, যমুনা গ্রুপ, সুরমা গার্মেন্টস, ফ্যাশন পাওয়ার গ্রুপসহ ছয়টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ ছাড়া নর্দান তসরিফা গ্রুপ, একেএইচ গ্রুপ ও মিথিলা গ্রুপের সঙ্গেও শিল্প ও একাডেমিয়ার মধ্যে সহযোগিতা গড়ে উঠেছে। এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি, যৌথ গবেষণা সম্প্রসারণ এবং শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করা।

এআই ও অটোমেশনের যুগে শিক্ষা
এআই, মেশিন লার্নিং, ডেটা অ্যানালিটিক্স, রোবোটিকস ও অটোমেশন এখন উৎপাদন থেকে ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা, বিপণন, ডিজাইন ও ব্যবসা ব্যবস্থাপনা সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আনছে। তাই প্রযুক্তি আর শুধু কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের বিষয় নয়। ভবিষ্যতের শিক্ষায় প্রয়োজন হবে নিজের বিষয়+প্রযুক্তি+মানবিক দক্ষতা। একজন ডিজাইনারকে ডিজিটাল প্রযুক্তি, মার্চেন্ডাইজারকে ডেটা, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারকে অটোমেশন এবং ব্যবসায় শিক্ষার্থীকে এআইনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্পর্কে জানতে হবে।
অটোমেশনকে চাকরি হারানোর আতঙ্ক হিসেবে না দেখে দক্ষতার রূপান্তরের সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর পোশাকশিল্পে ডেটা, ডিজিটাল উৎপাদন, কোয়ালিটি কন্ট্রোল, ডিজাইন ও ব্যবস্থাপনায় নতুন দক্ষতার চাহিদা তৈরি হচ্ছে।

গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা
বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শুধু বিদ্যমান জ্ঞান বিতরণ নয়; নতুন জ্ঞান সৃষ্টি ও বাস্তব সমস্যার সমাধানও তার দায়িত্ব। কম পানি ব্যবহার, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, পুনর্ব্যবহৃত উপকরণ, এআইভিত্তিক চাহিদা পূর্বাভাস ও সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনা এসব ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প যৌথ গবেষণার সুযোগ রয়েছে।

শ্রেণিকক্ষের বাইরের শিক্ষা ও অন্তর্ভুক্তি
একজন দক্ষ পেশাজীবী শুধু বই পড়ে তৈরি হন না। নেতৃত্ব, যোগাযোগ, দলগত কাজ, সৃজনশীলতা, সময় ব্যবস্থাপনা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিতর্ক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, ক্রীড়া, ফ্যাশন, প্রযুক্তি ও ব্যবসা ক্লাব, স্বেচ্ছাসেবা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডকে শিক্ষার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে। ২০২১ সালে ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ হাজার ৫৬৯ জন দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থী এবং ১ হাজার ৬৮৮ জন পূর্ণ বিনামূল্যের শিক্ষার্থী ছিল। বৃত্তি ও আর্থিক সহায়তা তাই ব্যয় নয়, দেশের ভবিষ্যৎ মেধাশক্তিতে বিনিয়োগ।

ভবিষ্যতের বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ
বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের পরবর্তী বাস্তবতায় প্রবেশ করছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয়, পরিবেশগত চাপ এবং এআই আমাদের প্রচলিত কর্মসংস্থান ও ব্যবসার মডেল বদলে দিচ্ছে। বিশেষ করে আরএমজি খাতের ৩৯.৩৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ধরে রাখতে ও বাড়াতে হলে উচ্চমূল্যের পণ্য, নতুন বাজার, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং, উদ্ভাবন ও টেকসই শিল্পব্যবস্থার দিকে যেতে হবে। এই রূপান্তরের কেন্দ্রে থাকবে দক্ষ মানুষ, আর সেই মানুষ তৈরির অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব তাই শুধু আরও বেশি শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেওয়া নয়; ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে প্রস্তুত করা। আমাদের এমন শিক্ষার্থী তৈরি করতে হবে, যারা শুধু চাকরি খুঁজবে না, নতুন কাজ সৃষ্টি করবে; শুধু বিদ্যমান জ্ঞান ব্যবহার করবে না, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করবে; শুধু দেশের বাজারের জন্য নয়, বিশ্ববাজারের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করবে। 

লেখক: চেয়ারম্যান, বোর্ড অব ট্রাস্টিজ, বিইউএফটি

আরও পড়ুন

×