ঢাকা শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬

দিবস

ফিরে দেখা ৭ নভেম্বর

ফিরে দেখা ৭ নভেম্বর
×
×

এম সাখাওয়াত হোসেন

এম সাখাওয়াত হোসেন

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

৭ নভেম্বর, সময় তখন প্রায় মধ্যরাত পেরিয়ে যাচ্ছে। চারদিকে গোলাগুলির আওয়াজ আর জিন্দাবাদের ধ্বনির মধ্যে ঘুম ভেঙে গেল। হকচকিয়ে বিছানা থেকে উঠে গেলাম। 
আমার নিচের তলাতেই থাকতেন এনটি এয়ারক্রাফট ইউনিটের অধিনায়ক লে. কর্নেল মাশাহেদ চৌধুরী, যাঁর ইউনিটের একটি ব্যাটারি তেজগাঁও বিমানবন্দরে রাখা হয়েছিল বিমানবন্দর বন্ধ করে দেওয়ার জন্য। তারা আমাদের ডেকে নিচে তাদের বসার ঘরে নিয়ে গেলেন। তারপর তিনি ভবিতব্য অনেক কথাই বললেন কীভাবে ইউনিটের এক ব্যাটারি তাঁর নির্দেশ ব্যতিরেকে বিমানবন্দরে নিয়ে গিয়ে মোতায়েন করা হয়। তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে প্রায় সকাল হয়ে এলো। ভোর হতেই তাড়াতাড়ি ইউনিফর্ম পরে আমার প্রতিবেশী মেজর হারুনের সঙ্গে (পরে কর্নেল অবসরপ্রাপ্ত) হাঁটতে হাঁটতে ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারের দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। 

প্রধান সড়কে উঠতে দুজন পরিচিত অফিসারের দেখা পেলাম। তারা আমাদের দেখে বলল, জেনারেল জিয়াউর রহমানকে এইমাত্র বন্দি অবস্থা থেকে বের করে ২ ফিল্ড রেজিমেন্টে নিয়ে আসা হয়েছে এবং সেখানেই আমাদের চলে যেতে বলল। ওখানে অন্যান্য অফিসারও আছেন। আর কিছু বলার সময় তারা পেল না আর আমরাও কিছু শুনতে পারছিলাম না। পথে উল্টোদিক থেকে একটি সামরিক ট্রাকভর্তি সৈনিক এবং কিছু বেসামরিক তরুণে ভর্তি হয়ে আমাদের পাশ কাটিয়ে যাওয়ায় সময় গুলি ছুড়তে ছুড়তে আর ধ্বনি দিতে দিতে দ্রুতগতিতে চলে গেল। এ ধ্বনি আমি প্রথম শুনলাম আর শোনার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের রক্ত হিম হয়ে গেল। তারা স্লোগান দিচ্ছিল, ‘সিপাহি সিপাহি ভাই ভাই, অফিসারের রক্ত চাই। সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ, জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’। পরে জানলাম এসব বেসামরিক তরুণ কর্নেল তাহেরের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গণবাহিনীর সদস্য। 

বারান্দায় দাঁড়িয়েই দেখতে পেলাম কর্নেল তাহের কিছু সৈনিক আর গণবাহিনীর সদস্যদের দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় ২ ফিল্ড রেজিমেন্টে এসে জিয়াউর রহমানের রুমে ঢুকলেন। প্রথমে একবার দুজনে কোলাকুলি করে পরে তাহের জিয়াউর রহমানকে রেডিও স্টেশনে গিয়ে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে বলেন। কিন্তু জিয়াউর রহমান ওখানে বসে তাহেরের আসার আগেই অন্যান্য অফিসারের পরামর্শে তাঁর ভাষণ টেপ করে রেডিওতে পাঠিয়ে দেন। পরে তাহের সৈনিকদের পক্ষ থেকে জিয়াকে কিছু দাবিদাওয়ার লিস্ট দিলে তিনি পরে বিবেচনা করে দেখবেন বলে রেখে দেন। তাহের জিয়ার এমন আচরণে খুব খুশি হতে পারলেন না। তিনি একান্তে জিয়ার সঙ্গে কিছু কথা বলে উত্তেজিত হয়ে অফিসকক্ষ ত্যাগ করেন। 

আমি তখনও বাইরে দাঁড়ানো। সেখানে দাঁড়িয়ে সেদিনকার অনেক নাটকীয় দৃশ্য দেখলাম। দেখলাম কয়েকজন সৈনিক কর্নেল মান্নাফ (পরে মেজর জেনারেল ও রাষ্ট্রদূত), যাঁর কথা আগে বলা হয়েছে, আর তাঁর ব্রিগেড মেজর, মেজর তফসির আহমেদকে রীতিমতো চ্যাংদোলা অবস্থায় ধরে নিয়ে এসেছে। এ লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পরে দুজনই অত্যন্ত বিব্রত বোধ করছিলেন। তফসির তাঁর মনোবল সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেন। সুবেদার মেজর আনিস দৌড়ে গিয়ে তাদের সিপাহিদের কবল হতে উদ্ধার করেন। এ ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে সংবাদ এলো শেরেবাংলা নগরের এমপি হোস্টেলে অবস্থানরত ১০ই বেঙ্গলের লাইনেই খালেদ মোশাররফ, যিনি মুক্তিযুদ্ধকে ফোর্স কমান্ডার হিসেবে ১০ই বেঙ্গল পুনর্গঠিত করেন, কর্নেল কে এন হুদা, যিনি ব্রিগেড কমান্ডার হিসেবে কয়েকদিন পূর্বে এ ইউনিটকে ঢাকায় নিয়ে আসেন, আর লে. কর্নেল হায়দার এ তিনজনকেই শেরেবাংলা নগরে এমপি হোস্টেলের সামনে উচ্ছৃঙ্খল সিপাহিরা নির্মমভাবে হত্যা করে। জিয়াউর রহমান এ খবর শুনে তাদের মৃতদেহ সেনানিবাসে পাঠাতে বললেন আর এ মৃতদেহগুলো তিনি দেখবেন বলেই ২ ফিল্ড রেজিমেন্টে আনা হচ্ছে। এ খবর শুনে আমার হাত-পা সিঁধিয়ে আসছিল। 

আমি নুরউদ্দীন খানের অফিসে বসে থাকতে থাকতেই জিয়াউর রহমান, মীর শওকত আলী প্রমুখ বাইরে কোথাও রওনা হয়ে গেলেন। ইতঃপূর্বে জিয়াউর রহমানের আগে ধারণকৃত দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষণখানি রেডিওতে প্রচার করা হয়, তবে সে ভাষণে সৈনিকদের দাবিদাওয়া গ্রহণের কোনো কথা বলা হয়নি। বরং সৈনিকদের শান্ত ও শৃঙ্খলার মধ্যে থাকতে বলেন। আর দেশবাসীকে শান্ত থেকে যার যার কর্মক্ষেত্রে যেতে বলেন। যথারীতি সরকারের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে বলেন। 

আমি কয়েক ঘণ্টা লে. কর্নেল নুরউদ্দীন খানের অফিসে বসে কাটাই আর ভাবতে থাকি আমার এ পরিস্থিতিতে কী করা উচিত। প্রায় দুপুরের দিকে ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার থেকে একটি জিপে ব্রিগেডের সিনিয়র জেসিও (জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার) ও আরও কিছু সৈনিক খবর পেয়ে আমাকে ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে নিয়ে যেতে উপস্থিত হলো। আমি ঠিক মন স্থির করতে পারছিলাম না যে এহেন পরিস্থিতিতে আমার এভাবে সশস্ত্র সৈনিকদের সঙ্গে যাওয়া ঠিক হবে কিনা। অনেক সাহস সঞ্চয় করে তাদের সঙ্গে ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে যাওয়াই মনস্থ করলাম। তবে রওনা হওয়ার আগে লে. কর্নেল নুরউদ্দীন খানের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে জানালাম। তিনি অত্যন্ত শান্ত গলায় বললেন, খোদা হাফেজ। 

পরের দিন, ৮ নভেম্বরে জিয়াউর রহমান আবার সেনাপ্রধানের পদে সেনাসদরে পৌঁছলেন। ব্রিগেডিয়ার মীর শওকত আলী খালেদ মোশাররফের জায়গায় সিজিএস হিসেবে নিযুক্ত হলেন। 
৮ নভেম্বর থেকে অতি দ্রুত ও দৃঢ়তার সঙ্গে জিয়াউর রহমান সমগ্র সেনানিবাসে ঘুরে সৈনিকদের সঙ্গে কথা বললেন। সেদিন বিকেলের দিকে তিনি ৪ বেঙ্গলের লাইনের কাছে ঢাকা সেনানিবাসের সৈনিকদের ডেকে সেখানে কথা বললেন। আশ্চর্য হলাম সেদিন ঢাকা সেনানিবাসে ৮০ থেকে ৫০ জন অফিসার উপস্থিত ছিলেন। ওই সমাবেশ ছিল সশস্ত্র অস্ত্রের মহড়া। কারণ মাত্র এই ৪০ থেকে ৫০ জন অফিসার ছাড়া আর সব সৈনিকই ছিল সশস্ত্র।

দৃঢ় কণ্ঠে জিয়াউর রহমান অস্ত্র জমা দিয়ে সৈনিকদের নিজ নিজ ব্যারাকে ফিরে যেতে বললেন। তিনি আরও ঘোষণা করেন, সৈনিকদের ন্যায্য দাবিদাওয়া তিনি গ্রহণ করবেন এবং অতিসত্বর এর ওপর বিচার-বিবেচনা করে যথাসময়ে জানাবেন। তিনি এ ঘোষণা সরকারের পক্ষ থেকে দেন। যদিও তখন আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকেই রাষ্ট্রপতি হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে বলা হয়েছিল। 
তাহেরের প্ল্যান যদি কার্যকর হতো, তবে সেদিন রাতে এবং পরের কয়েকদিনের মধ্যেই সেনাবাহিনীর ‘কমান্ড স্ট্রাকচার’ ভেঙে দিয়ে জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করা হতো। তাহের সাধারণ সৈনিকদের দলে টানে বিভিন্ন দাবিদাওয়ার উছিলায় এবং অফিসারদের সামন্ততান্ত্রিক ব্যবহারের অপপ্রচারের মাধ্যমে প্ল্যান অনুযায়ী সেনাবাহিনীর স্ট্রাকচার শেষ করার পর বেসামরিক আমলাতন্ত্রের ওপরও একই ধরনের হামলা হতো। তাতে দেশ চলে যেত এক বিশৃঙ্খল অবস্থায়। 
 
ব্রি. জে. (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন: সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার; তাঁর বই ‘বাংলাদেশ: রক্তাক্ত অধ্যায় (১৯৭৫-১৯৮১)’ অবলম্বনে সংক্ষেপিত 
 

আরও পড়ুন

×