প্রচলিত বাজারের অভিজ্ঞতা বদলে দিচ্ছে সুপারশপ
সব ধরনের নিত্যপণ্য এক ছাদের নিচে। দাম নির্ধারিত। ফলে কেনাকাটায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন ক্রেতারা। আসতে পারেন সপরিবারে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর একটি সুপারশপ থেকে তোলা -সমকাল
জসিম উদ্দিন বাদল
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
নীতিসহায়তা দিয়ে প্রতিযোগী বাড়ানো দরকার, এতে বাজারে স্বচ্ছতা, কর্মসংস্থান ও সরকারের রাজস্ব বাড়বে : ড. এম আবু ইউসুফ ,নির্বাহী পরিচালক, র্যাপিড
থরে থরে সাজানো তাজা শাক-সবজি, মাছ-মাংস কিংবা মুদিপণ্য; গায়ে দামের ট্যাগ আর ডিজিটাল লেনদেন–এই চিত্র এখন শুধু রাজধানী ঢাকার নয়। এই আধুনিক খুচরা ব্যবসা বিস্তার লাভ করেছে দেশের বড় শহরগুলোতেও। কেউ কেউ পৌঁছে গেছে সব জেলা শহরে।
সুপারশপ নামে পরিচিত এই দোকানগুলোয় কেনাকাটা দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশ সুপারমার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে, বর্তমানে এই বাজারের আকার প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা। ২০৩০ সাল নাগাদ এর আকার দাঁড়াবে ২৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
দেশে সুপারশপের প্রতিষ্ঠিত ও পরিচিত ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো–স্বপ্ন, ইউনিমার্ট, মিনাবাজার, অ্যাগোরা, ডেইলি শপিং, প্রিন্স বাজার, আলফা মার্ট, মেট্রোমার্ট, ফ্রেশ সুপারমার্ট। এর বাইরে বিভিন্ন এলাকা ও অঞ্চলভেদে ছোট ছোট অনেক সুপারশপ গড়ে উঠছে এবং ভোক্তার চাহিদা মেটাচ্ছে। এর মধ্যে হোলসেল ক্লাব, আমানা বিগ বাজার, ট্রাস্ট ফ্যামিলি নিডস, লাভেন্ডার এবং চট্টগ্রামে খুলশী মার্ট উল্লেখযোগ্য।
উদ্যোক্তারা জানান, দেশে বর্তমানে ৩০টির মতো সুপারশপ ব্র্যান্ড রয়েছে। তবে ১০ থেকে ১২টি ব্র্যান্ড বেশি পরিচিত। আকারভেদে এসব সুপারশপে আট থেকে ৫০ হাজার রকমের পণ্য পাওয়া যায়।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) নির্বাহী পরিচালক ড. এম আবু ইউসুফ সমকালকে বলেন, একই স্থানে সব ধরনের নিত্যপণ্য পাওয়া যায়। পণ্যের দাম নির্ধারিত থাকে। সেজন্য এ মার্কেটে স্বাচ্ছন্দ্য আছে। এর ক্রেতা মধ্য ও উচ্চবিত্তের ভোক্তারা। তিনি বলেন, এসব শপে পণ্য বিক্রির তথ্য ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসে সংরক্ষিত থাকে। ফলে রাজস্ব আদায়ও সহজ হয়।
কৃষকের ক্ষেত থেকে অথবা উৎপাদকের কারখানা থেকে সরাসরি পণ্য সংগ্রহ ও মান যাচাই করে দোকানে রাখা হয়। আধুনিক বিপণনব্যবস্থা, তুলনামূলক নিরাপদ পরিবেশ এবং দরকষাকষির ঝক্কি না থাকায় ভোক্তার কাছে দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে সুপারশপ।
সুপারশপের উদ্যোক্তারা বলছেন, এই ব্যবসাকে আরও নিরাপদ করতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, সুষ্ঠু কোল্ডচেইন, যথাযথ লজিস্টিকস সহায়তা দরকার। একই সঙ্গে যৌক্তিক করকাঠামো, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ ও নীতিসহায়তা পেলে খাতটি দ্রুত সম্প্রসারিত হবে। তাতে খাদ্য নিরাপত্তাও বাড়বে।
খাতটিতে তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির সরাসরি সুযোগ আছে। পাশাপাশি বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারীর সংখ্যাও বাড়বে। সুষ্ঠুধারার প্রতিযোগিতা তৈরি হবে ব্যবসায়ীদের মধ্যে। এর চূড়ান্ত সুফল পাবেন ভোক্তা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারের উচিত প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা দিয়ে এই ব্যবসায় প্রতিযোগী বাড়ানো। এতে বাজারে স্বচ্ছতা তৈরি হবে। কর্মসংস্থান ও রাজস্ব বাড়বে। সুপারশপগুলো কৃষক থেকে সত্যি সরাসরি পণ্য সংগ্রহ করে কিনা এবং ভোক্তারা ন্যায্যমূল্য পান কিনা–তা দেখাও জরুরি।
বদলে যাচ্ছে বাজার
প্রচলিত বাজারের ধারা থেকে বের হয়ে রহিমআফরোজ গ্রুপের হাত ধরে দেশে সুপারশপের যাত্রা শুরু হয়। তারা ২০০১ সালে অ্যাগোরা ব্র্যান্ড নামে এই ব্যবসায়িক মডেল চালু করে। এরপর গত দুই যুগে এ খাতের ব্যবসায়িক মডেলে নানা পরিবর্তন এসেছে। নতুন নতুন ব্র্যান্ড যুক্ত হচ্ছে। চলতি বছরে এ খাতে যুক্ত হয়েছে বিদেশি বিনিয়োগকারী।
এ বছর ইন্দোনেশিয়ার আলফা গ্রুপ, জাপানের মিতসুবিশি করপোরেশন এবং বাংলাদেশের কাজী ফার্মস গ্রুপের যৌথ উদ্যোগ আলফামার্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম ধাপে প্রতিষ্ঠানটির পাঁচ কোটি ডলার বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। আরও সাত কোটি ডলার বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেড ও বাংলাদেশ সুপারমার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের এ বছরের এক যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের নিত্যপণ্যের খুচরা বাজারের আকার প্রায় দুই লাখ ২৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার। এর মধ্যে সুপারশপের অংশ মাত্র তিন শতাংশ বা সাত হাজার কোটি টাকা। তবে বাজার পরিধি দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বর্তমান প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশের কাছাকাছি। আশা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে সুপারশপের বাজার ২৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ছাড়াবে।
কৃষকের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ
সুপারশপের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো উৎপাদন থেকে বিক্রি পর্যন্ত পণ্যের সরবরাহব্যবস্থাকে সমন্বিত করা। স্বপ্ন জানিয়েছে, তাদের ‘সিড টু শেলফ’ মডেলে ১০ হাজারের বেশি কৃষক যুক্ত আছেন। ২২টি সংগ্রহ কেন্দ্র, ১৫০ জন সরবরাহ অংশীদার ও ১৮টি এলাকা থেকে পণ্য আসে তাদের আউটলেটগুলোয়। তাজা পণ্যের ২৩ শতাংশ আসে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে।
স্বপ্নের হিসাবে, প্রচলিত কাঁচাবাজার ব্যবস্থায় কৃষক মুনাফা পান ৭ থেকে ১০ শতাংশ, আর মধ্যস্বত্বভোগীর ভাগ ১১ থেকে ১৫ শতাংশ। কিন্তু তাদের সুপারশপে সরাসরি সংগ্রহে কৃষকের লাভ ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। ক্রেতার সাশ্রয় তিন থেকে পাঁচ শতাংশ।
খাদ্যনিরাপত্তা ও পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ
সুপারশপের সম্ভাবনাময় দিক হলো খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পণ্য সংগ্রহ ও মান নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন ধাপ, সরবরাহকারীর জবাবদিহি, ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি এবং পণ্যের লেবেলিং ব্যবস্থা বজায় রাখা। ফলে মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য পর্যবেক্ষণ, নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ এবং একই ধরনের প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে অনিরাপদ পণ্যের ঝুঁকি কমানোর সুযোগ থাকে। এতে ভোক্তার সচেতনতা বাড়ে। ফলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রচলিত বাজারেও নিরাপদ খাদ্য বিক্রির বিষয়ে চাপ তৈরি হয়।
কর্মসংস্থান
পণ্য সংগ্রহ, পরিবহন, সংরক্ষণ, প্যাকেজিং, সরবরাহ, হিসাবরক্ষণ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা মিলে এ খাতে সাড়ে ১৭ হাজার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে বলে জানায় সুপারশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। সুপারশপের ৭০ শতাংশের বেশি লেনদেন ডিজিটাল পদ্ধতিতে হয়। ডিজিটাল লেনদেন ও বিক্রির নথি সংরক্ষণ আর্থিক স্বচ্ছতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল সমকালকে বলেন, এ খাতে ১০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছেন তারা। সারাদেশে প্রায় ১৬০টি আউটলেট স্থাপনের পাশাপাশি ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল চালু করা হয়েছে। আগ্রহীরা ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করে আউটলেট খুলতে পারছেন।
কামরুজ্জামান কামাল বলেন, আগামী দুই বছরের মধ্যে তাদের আউটলেটের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যাবে। তবে এ খাতে বড় সমস্যা হচ্ছে সুবিধামতো স্থানে দোকান খুঁজে পাওয়া যায় না। আবার উপযুক্ত স্থানে আউটলেট দিতে গেলে অনেক টাকা ভাড়া দিতে হয়। এতে ব্যবসার খরচ বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ সুপারমার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসাইন সমকালকে বলেন, ভোগ্যপণ্যের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই বর্তায়। তাই ভোগ্যপণ্যসহ নিত্যপণ্যকে করমুক্ত রাখতে হবে। অন্তত ন্যূনতম কর এক শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ করা উচিত।
চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ও ব্যবসায় চ্যালেঞ্জ বাড়ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সারা বিশ্বে সুপারমার্কেটগুলো ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। বাংলাদেশে তা সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশ কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ভোক্তাদের জন্য যেসব সুবিধার কথা বলা হচ্ছে আসলে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা, তা জানতে নিয়মিত তদারকি, পণ্য পরীক্ষা করতে হবে। সব দেশে এভাবে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদারকির কার্যকর ব্যবস্থা আছে।
র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক ড. এম আবু ইউসুফ সমকালকে বলেন, কৃষক সঠিক দাম না পেলে এই খাতে যুক্ত হতে তারা নিরুৎসাহিত হবেন। যেহেতু খাতটির দ্রুত সম্প্রসারণ হচ্ছে তাই প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা দিয়ে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এতে বাজারে স্বচ্ছতা, কর্মসংস্থান ও সরকারের রাজস্ব বাড়বে।
- বিষয় :
- সুপারশপ