বাঙালির আবহমান আশ্রয়
×
দ্রাবিড় সৈকত
প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২০ | ১২:০০
বর্ষবরণের প্রথা আমাদের সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। কৃষি ও বাণিজ্য নির্ভর অর্থনীতির এই বাংলায় নববর্ষের বহুবিধ তাৎপর্য। নতুন ফসল ঘরে তোলা, দোকানে দোকানে হালখাতার অনুষ্ঠান, নতুন জামা-কাপড়, নানা পদের সুস্বাদু ব্যঞ্জন, রং-বেরঙের মেলা ও আনন্দের অনুষঙ্গে প্রাণের উৎসব বাঙালির নববর্ষ। বর্ষবরণে আমরা মিলিত হই পারস্পরিক মঙ্গল কামনায়। প্রতি বছরই আমরা নানা আয়োজনে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করি। বৈশাখকে ঘিরে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সর্বজনীন মিলনমেলায় পরিণত হয় বাঙালি অধ্যুষিত পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চল। কিন্তু এবারের বৈশাখ আসছে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। প্রায় পুরো পৃথিবীর মানুষ গৃহবন্দি, ছোঁয়াচে মহামারির আতঙ্ক গ্রাস করেছে মানুষের আত্মা ও আত্মীয়তাকে। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার জন্য সর্বত্র চলছে প্রাণান্ত প্রচেষ্টা। বেঁচে থাকার এখন একমাত্র পথ হলো আক্রান্ত না হওয়া। যেহেতু এই ভাইরাসের কোনো ভ্যাকসিন এখনও আবিস্কৃত হয়নি। কাজেই উৎসব এখন অবান্তর প্রশ্ন, কেননা উৎসবের নামে একসঙ্গে মিলিত হওয়াই হতে পারে আমাদের মৃত্যু সনদ। এখানেই ফুটে উঠছে মানুষের অন্য একটি রূপ। একান্ত নিজের পরিবার, সমাজ ও দেশের বাইরে আমাদের আর কোনো আশ্রয় নেই। পৃথিবীর সব সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, আপন পরাণ বাঁচাতে মরিয়া মানুষজন অন্যের দিকে সহানুভূতির দৃষ্টি দেওয়ার অবকাশই পাচ্ছে না। আমরা পৃথিবীব্যাপী দেখতে পাচ্ছি মানুষের স্বার্থপরতার নতুন নতুন অবয়ব। মানবতার নিদারুণ এই সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে কভিড-১৯ নামক এক ভাইরাসের আক্রমণে মৃত্যুর মিছিল।
বৈশাখ উদযাপনে আমাদের কোনো অবহেলা বা আগ্রহের কমতি ছিল না কোনোকালেই, কিন্তু এবারের বৈশাখ আমাদের অন্যভাবে ভাবিয়ে তুলছে। সাধারণত উৎসব বিষয়ে আমাদের কোনো জোরালো দ্বিমত না থাকলেও অন্য প্রায় সবকিছুতেই আছে বাঙালিত্বের বিরোধিতার চড়া সুর। বাঙালিয়ানার বিরুদ্ধে, বাঙালির বিরুদ্ধে কতশত প্রচারণা করে চলেছেন আমাদের পণ্ডিত-বুদ্ধিজীবী মহল, যারা জোরেশোরে স্থানিকতার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে আমাদের বিশ্বায়িত করার কাজে সদা-সর্বদা নিবেদিত প্রাণ রয়েছেন। কিন্তু এই প্রচার এবং প্রসারের ফলে আমরা ইংরেজ আমলের শেষ দিক থেকে আজ পর্যন্ত নিবেদিত থেকে জাতীয় জীবনে কতটুকু উন্নতি করতে সক্ষম হয়েছি? উন্নত বিশ্বের সেবাদাস হওয়ার বাইরে আমরা অন্যকিছু হতে পেরেছি কি? পণ্যের বিশ্বায়নের ধোঁকাকে যারা নিজেদের বিশ্বায়িত ভাবার আহ্লাদে ভোগেন, জ্ঞানের বিশ্বায়িত ধারণার প্রতাপে যারা স্থানীয় সব জ্ঞান-বিজ্ঞানকে অস্বীকার করার মানসিক কাঠামোকে ক্রমান্বয়ে শক্ত করে তুলেছেন। নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে যারা আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করার মতো সামগ্রী ভাবেন কিংবা যারা মনে করেন বাঙালির অতীত এক বৃহৎ কলঙ্কজনক অধ্যায় তারা কি আসলে নিজেদের জ্ঞান-বিজ্ঞান, সমাজ-অর্থনীতি-রাজনীতিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন? এখানে দেশাত্মবোধ কিংবা জাতীয়তাবাদের (ভূমিভিত্তিক) কথা বলা রীতিমতো অপরাধ। কেমন একটা কূপমণ্ডূকতার তকমা সাঁটিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের চেহারায় যারা নিজেদের কথা বলতে চান। এ এক অদ্ভুত মনোবিকলন। এখন এই করোনা মহামারির কালে কারা আপনাদের রক্ষা করবে? কে আপনার খাদ্য ও চিকিৎসা নিশ্চিত করবে? পৃথিবীতে যাদের শ্রেষ্ঠ বলে এতদিন ঘোষণা করে এসেছেন, যাদের রূপ-গুণ-সম্পদের কোনো অভাব নেই, যাদের সম্পদ দেখে মরিয়া হয়ে তাদের কেনা গোলামের মতো আচরণ করেছেন, দেশের সব সম্পদ তাদের ব্যাংকে জমা করেছেন, শ্রেষ্ঠ মেধাকে প্ররোচিত করেছেন, তাদের হয়ে তাদের জন্য নতুন নতুন আবিস্কারের দরজা খুলে দিতে, ভালো ফল, মাছ, সবজি, পোশাক, সন্তান, টাকা সবকিছু পাচার করেছেন, সেখানে কি আপনার আশ্রয় মিলবে? নিজের দেশের প্রতি, সংস্কৃতির প্রতি, মানুষের প্রতি ঘৃণা জমাতে জমাতে আপনারা এক একটা বোমায় পরিণত হয়েছেন এবং যত্রতত্র ফাটিয়ে চলছেন, এর করুণ পরিণতি কে ভোগ করবে? আপনি, আপনার সন্তান, প্রতিবেশী, আত্মীয়, বন্ধুরাই এর ভুক্তভোগী, সেই মহান বিদেশিরা আপনার আত্মীয় পরিজনের দুঃখের ভাগ নিতে আসবে না, আপনি মহত্ত্ব দেখিয়ে তাদের গোলামি করতে পারেন, তারা করবে না। বরং এমন দুর্যোগের সময় ঘাড় ধরে বের করে দেবে; আপনি ফিরে আসবেন সেই অবহেলিত, ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের শিকার নিপীড়িত বাংলাদেশেই। বাংলাদেশ আপনাকে গ্রহণ করবে, কারণ আপনি তার সন্তান।
আন্তর্জাতিকতার নামে আমরা কতটা দেউলিয়া আর অন্তঃসারশূন্য হয়ে উঠেছি তা হয়তো এই করোনাভাইরাস নামক মহামারি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। নিজের দেশ, স্বজাতি ছাড়া যে চূড়ান্ত বিপদের মুহূর্তে আর কোনো গন্তব্য নেই সেটি এই ছোঁয়াচে রোগের প্রকোপের কালে আমরা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছি। অপরের জন্য কিছু করার উদারতা অবশ্যই থাকতে হবে কিন্তু নিজেকে উলঙ্গ রেখে অন্যের পোশাকের নকশা করা নেহায়েত বোকামি ছাড়া কিছুই নয়। আমরা এই বোকামিকে উদারতা ভেবে দীর্ঘকাল ধরেই সভ্যতার মাঠে নিজেদের নগ্নতা নিয়ে কুণ্ঠিত আছি। এই বিপর্যস্ত সময় যদি আমাদের বোঝাতে পারে, যে সর্ববিষয়ে নিজেদের সমৃদ্ধির বাইরে কোনো বিকল্প নেই। পশ্চিমের দাসত্ব করে সমান হয়ে ওঠার ভাবনাটি অত্যন্ত হাস্যকরভাবেই অসম্ভব, কিন্তু আপনারা বুদ্ধিজীবী-পণ্ডিত মহল গম্ভীর মুখে সেই প্রচারণাই করে যাচ্ছেন। ফলে আমরা দেশীয় সব উৎসব সাড়ম্বরে উদযাপন করছি ঠিকই কিন্তু দেশাত্মবোধের প্রশ্নে বা দেশকে ভালোবাসার প্রশ্নে কিংবা দেশের প্রতি দায়িত্বশীলতার প্রশ্নে আমরা অত্যন্ত লজ্জাজনক ও নিচু সারিতে অবস্থান করছি। আমাদের সবকিছুই বিদেশি, বিদেশের জন্য উৎসর্গকৃত। আমাদের উদ্যমী ব্যবসায়ী, তারুণ্যের স্বপ্ন, সবচেয়ে ভালো ইলিশ, উৎকৃষ্ট ফল, নিখুঁত বস্ত্র, মেধাবী শিক্ষার্থী, সবকিছুই বিদেশিদের জন্য প্রস্তুত হয়। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় আমরা দেখতে পাচ্ছি পৃথিবীর সেসব স্বপ্নপুরী আমাদের আশ্রয় দিতে চাচ্ছে না, আমাদের রেমিট্যান্স নামক সোনার ডিম পাড়া হাঁসের পেটে ঢুকে যাচ্ছে ঘাতকের ছুরি, আমাদের অতি আদরের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। আমাদের সব বিদেশি গন্তব্য ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। বিশ্বায়নের অন্ধ সমর্থনে নিজেদের ঐতিহ্য-ইতিহাস-ভাষা-সম্পদ-চিকিৎসা-বিজ্ঞান সর্বত্র অবহেলার করুণ চিত্রগুলো প্রকাশিত হয়ে যাচ্ছে। মহামারির পাশাপাশি আমরা শুনতে পাচ্ছি দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি। অথচ আমাদের কৃষি-শিল্প-মেধা যুগোপযোগী হতে পারত। আমাদের উদ্যোক্তা, তারুণ্য, বুদ্ধিজীবিতা- সবকিছু আবর্তিত হতে পারত বাংলাদেশকে কেন্দ্রে রেখে। উদযাপিত উৎসবকে অন্তরে ধারণ করলে দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সমৃদ্ধি হতে পারত আমাদের লক্ষ্য। কিন্তু তা হয়নি, লাখো মানুষ উৎসবে সমাগত হচ্ছি ঠিকই, পারস্পরিক মঙ্গল কামনায় করছি বিবিধ আড়ম্বর, কিন্তু এসব কি একান্তই বানোয়াট অভিব্যক্তি নয়? পারস্পরিক মঙ্গল কামনা যদি প্রকৃতই হয়ে থাকে তাহলে আমরা প্রতিবেশী-আত্মীয়-পরিজনের কল্যাণকে তুচ্ছ করে কীভাবে নিজেদের শ্রম-মেধা-জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সব শ্রেষ্ঠ উৎপাদন অন্যদের জন্য নিবেদন করছি?
এই মহামারিকালে আমরা নিজেদের মঙ্গলের স্বার্থেই সম্মিলিতভাবে উৎসবে সমবেত হতে পারব না। অধিকাংশ মানুষই আছেন একান্ত নিজেদের ঘরোয়া পরিবেশে। উৎসবে আমরা মিলিত হতে পারব না বলেই সুযোগ তৈরি হলো নিজেদের ভাবনা-চিন্তাকে পুনর্বিন্যস্ত করার। আমরা আসলেই দেশকে ভালোবাসি? বর্ষবরণ আমাদের প্রাণের উৎসব? বাংলাকে ভালোবাসি আমরা? যদি ভালোই বাসি তাহলে তার কাজের রূপ কেমন হতে পারে? অনেক নিন্দা করেছেন বাংলা ও বাঙালিকে। অনেক গালমন্দ করেছেন বাংলাদেশকে, হয়তো রাগ-ক্ষোভ-অভিমানে আপনার অবস্থান সঠিক। ঘৃণায় দূরে ঠেলে দিলে যেভাবে প্রিয় মানুষ বিপথে চলে যেতে পারে, তেমনি দেশটাও পারে উল্টো পথে চলা শুরু করতে। হয়তো তাই হয়েছে। বাংলাদেশ তার সন্তানদের অবহেলা, ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের শিকার হয়ে তীব্র অভিমানে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ব্রত নিয়েছে। আসুন এই নববর্ষে একটা শপথ করি যে, এই ১৪২৭ বঙ্গাব্দে বাংলাকে, বাঙালিকে একটিও কটু কথা বলব না, তার শত দোষ এবং অক্ষমতাকে ভালোবাসার চাদরে জড়িয়ে নেব, আদর-স্নেহ-মায়ায় ঘিরে তাকে করে তুলব সবচেয়ে সুসভ্য ও সমৃদ্ধ দেশের অন্যতম। নববর্ষ এবার হয়ে উঠুক অনাড়ম্বর প্রতিজ্ঞা ও গভীরতর অনুধাবনের উজ্জ্বলতম মাহেন্দ্র সময়। া
লেখক
কবি
চিত্রশিল্পী
বৈশাখ উদযাপনে আমাদের কোনো অবহেলা বা আগ্রহের কমতি ছিল না কোনোকালেই, কিন্তু এবারের বৈশাখ আমাদের অন্যভাবে ভাবিয়ে তুলছে। সাধারণত উৎসব বিষয়ে আমাদের কোনো জোরালো দ্বিমত না থাকলেও অন্য প্রায় সবকিছুতেই আছে বাঙালিত্বের বিরোধিতার চড়া সুর। বাঙালিয়ানার বিরুদ্ধে, বাঙালির বিরুদ্ধে কতশত প্রচারণা করে চলেছেন আমাদের পণ্ডিত-বুদ্ধিজীবী মহল, যারা জোরেশোরে স্থানিকতার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে আমাদের বিশ্বায়িত করার কাজে সদা-সর্বদা নিবেদিত প্রাণ রয়েছেন। কিন্তু এই প্রচার এবং প্রসারের ফলে আমরা ইংরেজ আমলের শেষ দিক থেকে আজ পর্যন্ত নিবেদিত থেকে জাতীয় জীবনে কতটুকু উন্নতি করতে সক্ষম হয়েছি? উন্নত বিশ্বের সেবাদাস হওয়ার বাইরে আমরা অন্যকিছু হতে পেরেছি কি? পণ্যের বিশ্বায়নের ধোঁকাকে যারা নিজেদের বিশ্বায়িত ভাবার আহ্লাদে ভোগেন, জ্ঞানের বিশ্বায়িত ধারণার প্রতাপে যারা স্থানীয় সব জ্ঞান-বিজ্ঞানকে অস্বীকার করার মানসিক কাঠামোকে ক্রমান্বয়ে শক্ত করে তুলেছেন। নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে যারা আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করার মতো সামগ্রী ভাবেন কিংবা যারা মনে করেন বাঙালির অতীত এক বৃহৎ কলঙ্কজনক অধ্যায় তারা কি আসলে নিজেদের জ্ঞান-বিজ্ঞান, সমাজ-অর্থনীতি-রাজনীতিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন? এখানে দেশাত্মবোধ কিংবা জাতীয়তাবাদের (ভূমিভিত্তিক) কথা বলা রীতিমতো অপরাধ। কেমন একটা কূপমণ্ডূকতার তকমা সাঁটিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের চেহারায় যারা নিজেদের কথা বলতে চান। এ এক অদ্ভুত মনোবিকলন। এখন এই করোনা মহামারির কালে কারা আপনাদের রক্ষা করবে? কে আপনার খাদ্য ও চিকিৎসা নিশ্চিত করবে? পৃথিবীতে যাদের শ্রেষ্ঠ বলে এতদিন ঘোষণা করে এসেছেন, যাদের রূপ-গুণ-সম্পদের কোনো অভাব নেই, যাদের সম্পদ দেখে মরিয়া হয়ে তাদের কেনা গোলামের মতো আচরণ করেছেন, দেশের সব সম্পদ তাদের ব্যাংকে জমা করেছেন, শ্রেষ্ঠ মেধাকে প্ররোচিত করেছেন, তাদের হয়ে তাদের জন্য নতুন নতুন আবিস্কারের দরজা খুলে দিতে, ভালো ফল, মাছ, সবজি, পোশাক, সন্তান, টাকা সবকিছু পাচার করেছেন, সেখানে কি আপনার আশ্রয় মিলবে? নিজের দেশের প্রতি, সংস্কৃতির প্রতি, মানুষের প্রতি ঘৃণা জমাতে জমাতে আপনারা এক একটা বোমায় পরিণত হয়েছেন এবং যত্রতত্র ফাটিয়ে চলছেন, এর করুণ পরিণতি কে ভোগ করবে? আপনি, আপনার সন্তান, প্রতিবেশী, আত্মীয়, বন্ধুরাই এর ভুক্তভোগী, সেই মহান বিদেশিরা আপনার আত্মীয় পরিজনের দুঃখের ভাগ নিতে আসবে না, আপনি মহত্ত্ব দেখিয়ে তাদের গোলামি করতে পারেন, তারা করবে না। বরং এমন দুর্যোগের সময় ঘাড় ধরে বের করে দেবে; আপনি ফিরে আসবেন সেই অবহেলিত, ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের শিকার নিপীড়িত বাংলাদেশেই। বাংলাদেশ আপনাকে গ্রহণ করবে, কারণ আপনি তার সন্তান।
আন্তর্জাতিকতার নামে আমরা কতটা দেউলিয়া আর অন্তঃসারশূন্য হয়ে উঠেছি তা হয়তো এই করোনাভাইরাস নামক মহামারি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। নিজের দেশ, স্বজাতি ছাড়া যে চূড়ান্ত বিপদের মুহূর্তে আর কোনো গন্তব্য নেই সেটি এই ছোঁয়াচে রোগের প্রকোপের কালে আমরা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছি। অপরের জন্য কিছু করার উদারতা অবশ্যই থাকতে হবে কিন্তু নিজেকে উলঙ্গ রেখে অন্যের পোশাকের নকশা করা নেহায়েত বোকামি ছাড়া কিছুই নয়। আমরা এই বোকামিকে উদারতা ভেবে দীর্ঘকাল ধরেই সভ্যতার মাঠে নিজেদের নগ্নতা নিয়ে কুণ্ঠিত আছি। এই বিপর্যস্ত সময় যদি আমাদের বোঝাতে পারে, যে সর্ববিষয়ে নিজেদের সমৃদ্ধির বাইরে কোনো বিকল্প নেই। পশ্চিমের দাসত্ব করে সমান হয়ে ওঠার ভাবনাটি অত্যন্ত হাস্যকরভাবেই অসম্ভব, কিন্তু আপনারা বুদ্ধিজীবী-পণ্ডিত মহল গম্ভীর মুখে সেই প্রচারণাই করে যাচ্ছেন। ফলে আমরা দেশীয় সব উৎসব সাড়ম্বরে উদযাপন করছি ঠিকই কিন্তু দেশাত্মবোধের প্রশ্নে বা দেশকে ভালোবাসার প্রশ্নে কিংবা দেশের প্রতি দায়িত্বশীলতার প্রশ্নে আমরা অত্যন্ত লজ্জাজনক ও নিচু সারিতে অবস্থান করছি। আমাদের সবকিছুই বিদেশি, বিদেশের জন্য উৎসর্গকৃত। আমাদের উদ্যমী ব্যবসায়ী, তারুণ্যের স্বপ্ন, সবচেয়ে ভালো ইলিশ, উৎকৃষ্ট ফল, নিখুঁত বস্ত্র, মেধাবী শিক্ষার্থী, সবকিছুই বিদেশিদের জন্য প্রস্তুত হয়। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় আমরা দেখতে পাচ্ছি পৃথিবীর সেসব স্বপ্নপুরী আমাদের আশ্রয় দিতে চাচ্ছে না, আমাদের রেমিট্যান্স নামক সোনার ডিম পাড়া হাঁসের পেটে ঢুকে যাচ্ছে ঘাতকের ছুরি, আমাদের অতি আদরের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। আমাদের সব বিদেশি গন্তব্য ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। বিশ্বায়নের অন্ধ সমর্থনে নিজেদের ঐতিহ্য-ইতিহাস-ভাষা-সম্পদ-চিকিৎসা-বিজ্ঞান সর্বত্র অবহেলার করুণ চিত্রগুলো প্রকাশিত হয়ে যাচ্ছে। মহামারির পাশাপাশি আমরা শুনতে পাচ্ছি দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি। অথচ আমাদের কৃষি-শিল্প-মেধা যুগোপযোগী হতে পারত। আমাদের উদ্যোক্তা, তারুণ্য, বুদ্ধিজীবিতা- সবকিছু আবর্তিত হতে পারত বাংলাদেশকে কেন্দ্রে রেখে। উদযাপিত উৎসবকে অন্তরে ধারণ করলে দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সমৃদ্ধি হতে পারত আমাদের লক্ষ্য। কিন্তু তা হয়নি, লাখো মানুষ উৎসবে সমাগত হচ্ছি ঠিকই, পারস্পরিক মঙ্গল কামনায় করছি বিবিধ আড়ম্বর, কিন্তু এসব কি একান্তই বানোয়াট অভিব্যক্তি নয়? পারস্পরিক মঙ্গল কামনা যদি প্রকৃতই হয়ে থাকে তাহলে আমরা প্রতিবেশী-আত্মীয়-পরিজনের কল্যাণকে তুচ্ছ করে কীভাবে নিজেদের শ্রম-মেধা-জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সব শ্রেষ্ঠ উৎপাদন অন্যদের জন্য নিবেদন করছি?
এই মহামারিকালে আমরা নিজেদের মঙ্গলের স্বার্থেই সম্মিলিতভাবে উৎসবে সমবেত হতে পারব না। অধিকাংশ মানুষই আছেন একান্ত নিজেদের ঘরোয়া পরিবেশে। উৎসবে আমরা মিলিত হতে পারব না বলেই সুযোগ তৈরি হলো নিজেদের ভাবনা-চিন্তাকে পুনর্বিন্যস্ত করার। আমরা আসলেই দেশকে ভালোবাসি? বর্ষবরণ আমাদের প্রাণের উৎসব? বাংলাকে ভালোবাসি আমরা? যদি ভালোই বাসি তাহলে তার কাজের রূপ কেমন হতে পারে? অনেক নিন্দা করেছেন বাংলা ও বাঙালিকে। অনেক গালমন্দ করেছেন বাংলাদেশকে, হয়তো রাগ-ক্ষোভ-অভিমানে আপনার অবস্থান সঠিক। ঘৃণায় দূরে ঠেলে দিলে যেভাবে প্রিয় মানুষ বিপথে চলে যেতে পারে, তেমনি দেশটাও পারে উল্টো পথে চলা শুরু করতে। হয়তো তাই হয়েছে। বাংলাদেশ তার সন্তানদের অবহেলা, ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের শিকার হয়ে তীব্র অভিমানে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ব্রত নিয়েছে। আসুন এই নববর্ষে একটা শপথ করি যে, এই ১৪২৭ বঙ্গাব্দে বাংলাকে, বাঙালিকে একটিও কটু কথা বলব না, তার শত দোষ এবং অক্ষমতাকে ভালোবাসার চাদরে জড়িয়ে নেব, আদর-স্নেহ-মায়ায় ঘিরে তাকে করে তুলব সবচেয়ে সুসভ্য ও সমৃদ্ধ দেশের অন্যতম। নববর্ষ এবার হয়ে উঠুক অনাড়ম্বর প্রতিজ্ঞা ও গভীরতর অনুধাবনের উজ্জ্বলতম মাহেন্দ্র সময়। া
লেখক
কবি
চিত্রশিল্পী
- বিষয় :
- বাঙালির আবহমান আশ্রয়
