সুপার শপের মেয়ে
×
হাবিব আনিসুর রহমান
প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২০ | ১২:০০
গুলশান নন্দন টাওয়ারের নিচতলায় বিশাল স্পেস নিয়ে অর্কিড সুপার শপ। সকালে সেলস গার্লরা তাদের মোটা মোটা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ঢুকে পড়ে অর্কিডের ভেতর। ব্যাগগুলো নির্দিষ্ট জায়গাতে রেখে চলে যায় পোশাক পাল্টাতে।
মেয়েরা নিজ নিজ সেকশনে যাবার আগে শপের ভেতরের নৈমিত্তিক কাজগুলো সেরে নেয়। এয়ার ফ্রেশনার স্প্রে করে শপের আনাচে-কানাচে। কাঁচা লেবুর টাটকা সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত ঘরের ভেতর। এসি ছেড়ে দেয়। বিশাল অ্যাকোয়ারিয়ামের লাল, হলুদ, কালো, রঙ-বেরঙের মাছগুলোকে খাবার দেয়। খাবার পেয়ে মাছগুলো চঞ্চল হয়ে ওঠে। টবের গাছগুলোর সবুজ পাতার ওপর পানি স্প্রে করে, তখন পাতাগুলোও সজীব হয়ে ওঠে। শপের ম্যানেজার হাসান আবদুল্লাহ নির্ধারিত গানের সিডি ঢুকিয়ে দেন সিডি প্লেয়ারে। সমস্ত সেকশনের সাউন্ড সিস্টেমে গান বেজে ওঠে হালকা মিষ্টি সুরে- আনন্দ ধারা বহিছে ভুবনে...।
বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয় না, ক্রেতারা চলে আসে, যার যা ইচ্ছেমতো জিনিস কিনে নিয়ে চলে যায়, এভাবেই প্রতিদিন সকাল থেকে রাত অব্দি অর্কিড সরগরম থাকে।
এক যুবক ফাস্টফুড সেকশনের সামনে এসে দাঁড়ায়। তার কানে ইয়ারফোন লাগানো, ফেড জিন্সের সাথে ব্ল্যাক টি-শার্ট গায়ে, মাথার পেছনে লম্বা চুলে ব্যান্ড, গায়ের রঙ ফরসা। ব্রাউন কালার ফ্যাশন শু পায়ে। যুবক মৌমিতার সামনে দাঁড়িয়ে খাবারের মেন্যু দেখছিলো। সে জানতে চাইলো, চিনি কম দিয়ে এক কাপ কফি দেয়া যাবে? মৌমিতা সাথে সাথে জবাব দিলো- শিওর স্যার, কেনো দেয়া যাবে না? যুবক একটা চিকেন বার্গার গরম করে দিতে বলে। পুরো শপের ভেতর কোথাও বসার ব্যবস্থা নেই। যুবকের দিকে তাকিয়ে শারমিন মৌমিতাকে বললো,
-দারুণ!
-কী? জানতে চাইলো মৌমিতা।
পারফিউম সেকশনে দাঁড়িয়ে শিলা ডি কস্টাও দূর থেকে যুবকের দিকে তাকিয়ে আছে মুগ্ধ চোখে। শিলার মা বলতো, পুরুষের সৌন্দর্যের কোনো তুলনা হয় না। তখন মায়ের কথা বুঝতে পারেনি শিলা। এখন সামনের যুবককে দেখে মায়ের কথা বুঝতে পারে। মা আসলে ঠিকই বলেছিল। যেমন যুবকের গায়ের রং, পোশাক-পরিচ্ছদ, তেমন তার সুন্দর স্বাস্থ্য। সত্যিই সুন্দর লাগছে তাকে। যুবক কফি খায়। যুবকের দিকে তাকিয়ে নানান কথা ভাবে শিলা। যদি পারফিউম সেকশনে এসে দাঁড়ায়, তাহলে তাকে দামি দামি পারফিউম দেখাবে, আফটার শেভ লোশান দেখাবে। শিলা যখন কল্পনায় যুবকের সঙ্গে কথা বলছিলো তখন তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ভীষণ মোটা এক মহিলা। শিলাকে বললেন- আচ্ছা নিনা রিচি দেখছি না তো? শিলা সম্বিৎ ফিরে পেলো- জি ম্যাম, ইয়েস ম্যাম, নিনা? শিলা মহিলাকে মেয়েদের পারফিউমগুলো দেখায় এক এক করে। মহিলা একটা নিনা রিচি তুলে তার বাস্কেটের এক পাশে রেখে বললো- থ্যাংকস। ওয়েলকাম ম্যাম, আবার আসবেন ম্যাম। শিলা আবার যুবকের দিকে তাকায়। শিলার কাণ্ড দেখে মোটা মহিলা মুচকি হাসে, কিন্তু তিনিও বারবার তাকাতে লাগলেন যুবকের দিকে। যুবকের উপস্থিতি মেয়েগুলোর দৃষ্টি কেড়ে নেয়, শারমিনকে তখন ডেকে পাঠিয়েছেন হাসান আবদুল্লাহ। মৌমিতা একদম একা। তার সামনে যুবক। সে মৌমিতাকে কিছু জিজ্ঞাসা করলে হেসে ফেলে মৌমিতা। আবার মৌমিতা যুবককে কিছু জিজ্ঞাসা করলে যুবকও একটু হাসে।
ঘরে ঢুকেই মায়ের চিৎকার শুনে বুক কেঁপে ওঠে মৌমিতার- মৌমিতা শিগগির আয়। ছুটে গিয়ে দেখে, মা মৌটুসিকে জড়িয়ে ধরে আছে, বললো- তাড়াতাড়ি স্যাভলন আর ব্যান্ডেজ আন। মৌমিতা দৌড়ে গিয়ে স্যাভলন ক্রিম আর ব্যান্ডেজ এনে বলে- কী হলো মা?- দেখ্ হাত কেটে কী করেছে তোর বোন! মৌমিতা কাঁদতে কাঁদতে বোনের হাতে ব্যান্ডেজ বেঁধে দেয়, বলে- কী যে করো না আপু! আমাদের খারাপ লাগে না বুঝি? মৌটুসি মৌমিতার বড় বোন, সে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। ডাক্তার যখন ইনজেকশন দেয় তখন একটু ভালো থাকলেও আবার সে আগের মতো বোকা হয়ে যায়। অসুস্থ হয়ে পড়ে। সারাদিনই ঘরে বসে থাকে, একা একা কথা বলে। সবসময় টিভির সামনে রিমোট কন্ট্রোল হাতে নিয়ে বসে থাকে। ইচ্ছেমতো চ্যানেল ঘোরায়। কার্টুন দেখে।
ডাইনিং টেবিলে খাবার দিলেন মৌমিতার মা। তাড়াতাড়ি খেয়ে উঠে ঘরে গিয়ে মোবাইলে ফেসবুক ওপেন করে মৌমিতা। প্রথমেই ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টের ওপর ক্লিক করে। একটা একটা করে তাদের প্রোফাইল, মিউচুয়াল ফ্রেন্ডের সংখ্যা, ছবি, এসব দেখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। তিন নম্বরে গিয়ে ক্লিক করতেই আকাশ থেকে পড়লো মৌমিতা, একি! যে যুবক অর্কিডে কফি খেয়ে গেছে, সে! মানে শারমিন যাকে হ্যান্ডসাম উপাধি দিয়েছে, সেই যুবক তাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে। বিষয়টা ওর কাছে অকল্পনীয়। গত পরশু কফি খাওয়ার পর বলেছিলো আপনার নামটা বলবেন প্লিজ? সে উত্তর দিয়েছিলো,
-মৌমিতা আদনান, আদনান আমার বাবার নাম।
-এত সুন্দর নাম আপনার! আপনি দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি আপনার নামটাও সুন্দর!
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেলো মৌমিতার। তাড়াহুড়ো করে একটা রিকশা নেয়। অর্কিডে ঢুকে দেখে অন্য মেয়েরা সবাই চলে এসেছে। ওরা এখন কাজে ব্যস্ত। বাহাদুর মিয়া ঘর পরিস্কার করে পোশাক পাল্টে বসে গেছে তার নির্দিষ্ট জায়গায়। শারমিন তাদের ফাস্টফুড সেকশনের সবকিছু ঝেড়েমুছে ঝকঝকে করে রেখেছে। আবদুল্লাহ স্যার তার ঘরে বসে নাশতা করছেন। আজ খুব সুন্দর একটা গান বাজছে- আকাশ ভরা সূর্য তারা, বিশ্ব ভরা প্রাণ...। মৌমিতার নাকে শুচি স্নিগ্ধ তাজা বেলিফুলের ঘ্রাণ ভেসে এলে সে উর্বশীর দিকে তাকলো,
-কিরে? বেলি ফুল!
-নতুন এয়ার ফ্রেশনার, বেলিফুলের ঘ্রাণ, খুব সুন্দর না? হাসতে হাসতে
উর্বশী বলে।
-সত্যিই খুব সুন্দর ঘ্রাণ, নিশ্চয়ই ম্যানেজার স্যার এনেছেন?
-না, সকালে কিবরিয়া ভাই অর্কিডের জন্যে গিফট এনেছেন, যেন আমরা এই কোম্পানির ফ্রেশনার ইউজ করি। উর্বশীর কথা শুনে হেসে ফেলে মৌমিতা।
পারফিউম সেকশনে গেল মৌমিতা। শিলার সাথে কথা বলবে সে। শিলা কটাক্ষ করলো,
-তোর মজা দেখলাম মৌমিতা।
-কীসের মজা?
-ওই যে ওই দিন শারমিন ছিলো না, তুই আর ওই হ্যান্ডসাম কথা বলছিলি, কী এত কথা বললো রে, বল না প্লিজ, আমার না শুনতে খুব ইচ্ছা করে, ইস যদি আমার সেকশনে আসতো তাহলে...।
-তাহলে কী, একটা দামি পারফিউম গিফট দিয়ে দিতিস?
-না, তা করতাম না, তবে একটা কিছু করতাম।
- জড়িয়ে ধরে কিস করতিস?
মৌমিতার ঠিক কথাতে খিলখিল করে হেসে ওঠে শিলা, সে মাথা ওপর-নিচ করে অর্থাৎ সত্যিই সে কিস করতো!
মৌমিতা ফিরে এলো। শিলার মতলব ভালো না। শিলা জানে না, শারমিনও জানে না, অর্কিডের কেউই জানে না সেই সুন্দর যুবকের নাম আবীর হাসান, সে এখন মৌমিতার ফেসবুক ফ্রেন্ড, মৌমিতা নয় ওই যুবকই তাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে বন্ধু হবার জন্য। মৌমিতা শুধু ওই রিকোয়েস্ট কনফার্ম করেছে ব্যস, আর এসব গোপন কথা সে কাউকে জানাবে না কোনোদিনও। কারণ শিলার কাছে গেলে শিলা এমন কিছু করবে বা এমন কিছু ইঙ্গিত করবে তাতে যে কোনো পুরুষ মানুষের মাথা ঘুরে যেতে বাধ্য। শিলা পারে না এমন কোনো কাজ নেই। আর শারমিন, বাপরে বাপ, এমন স্টাইল করে কথা বলবে যেন তার কতদিনের চেনাজানা, কত আপনজন। শারমিনের এসব ঢং দেখলে গা জ্বলে যায় মৌমিতার। যদি আজ আবীর হাসান আসে তাহলে তাকে কী বলবে মৌমিতা, চোখের ইশারায় বোঝানোর চেষ্টা করবে যে, কোনোভাবেই শারমিন বা শিলার সামনে যেন ফেসবুকের প্রসঙ্গ না তোলে আবীর।
আবীর শারমিনের সঙ্গে কী কথা বলছে! শুনতে পাচ্ছে না মৌমিতা, শুধু শারমিনের মুখে কেমন একটা রহস্যময় হাসি। কাছে যেতেই শুনতে পেলো 'ওই তো চলে এসেছে।' মৌমিতা ঢুকতেই আবীর হাসান বললো,
-ভালো আছেন?
-হ্যাঁ, ভালো আছি, আপনি?
-ভালো। আবীর বললো।
আজো আবীরকে খুব সুন্দর লাগছে। দু'জন দু'জনার দিকে তাকিয়ে থাকলো কয়েক সেকেন্ড। বিষয়টা শারমিনের চোখ এড়ালো না। দূরে দাঁড়িয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে শিলা। তার মনটা এখন কসমেটিকস বা পারফিউমস সেকশনে নেই, সে এখন কফি শপের যুবকের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। শিলা দেখছিলো আবীর হাসানকে। ওহ্ ঈশ্বর, মানুষ এত সুন্দর হয়! আজো যুবক ম্যাচ করা পোশাক আর জুতা পরে এসেছে!
-কী খাবেন? মৌমিতা জানতে চাইলো
-এখানে এলে কী খেতেই হবে, কথা বলা যাবে না?
-না তা নয়, তবে এটাতো খাবার সেকশন তাই। মৌমিতা বললো।
-দিন, আপনি যা ভালো বোঝেন।
- চিকেন ফ্রাই দিই, আর এক কাপ কড়া কফি? মৌমিতা একটু হেসে বললো।
-দ্যাটস রাইট, দিন চিকেন দিন, কফি দিন, আজ দুপুরে লাঞ্চ করা হয়নি, সারাদিন কাজের মধ্যে ছিলাম। একটা চিজ বার্গারও দিন।
মৌমিতার মনে হলো আজ এদিকে কোথাও কাজে এসেছে আবীর হাসান, একদিন একটুখানি বলেছিল, তার একটা প্রোডাকশন হাউস আছে এই গুলশানেই, এসব মৌমিতা জানে না, জানার কথাও নয়। মৌমিতা বললো, এখানে কি আপনার কোন বিজনেস আছে?
- হ্যাঁ আছে, ওই তো ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিমে- কারুকাজ।
- খুব সুন্দর নাম, কী হয় ওখানে?
- যুবক-যুবতীদের পোশাক বিক্রি করি।
মৌমিতা নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না, হঠাৎ সে বলে ফেললো,
-শারমিনকে কিছু বলেছেন?
-কোন্ ব্যাপারে?
-ওই যে ফেসবুক? মাথা নত করে উত্তরের অপেক্ষায় থাকলো মৌমিতা।
-না, না, ওকে বলবো কেন, ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট তো পাঠিয়েছি আমি, তাই না? থ্যাংকস যে আপনি আমাকে অ্যাকসেপ্ট করেছেন।
-ইউ আর ওয়েলকাম। মৌমিতা বললো।
একদিন হঠাৎ মৌমিতা বললো, শারমিন শুনেছিস? কী? চিনদেশে নাকি নতুন একটা রোগ ছড়িয়েছে? -হ্যাঁ শুনেছি, টিভির খবরে দেখেছি, কেনো? -ওই রোগের নাকি কোনো চিকিৎসা নেই, রোগটা নাকি ছোঁয়াচে? -কী জানি ভাই, এটা তো আমাদের কোনো হেডেক না, চীন বহুদূর।
তারপর শারমিনের সাথে মৌমিতার কথা হয়েছে প্রায় প্রতিদিন। তারা শুনেছে রোগটার নাম করোনাভাইরাস, ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের দেশে।
সন্ধ্যার পর নন্দন টাওয়ারের সামনে চা খাচ্ছিলেন হাসান আবদুল্লাহ, হঠাৎ দেখলেন একটা দামি গাড়ি তার সামনে দিয়ে ছুটে গিয়ে ব্রেক করলো। গাড়ি থেকে নেমে এলো সুন্দর এক যুবক। পোশাক-পরিচ্ছদে দারুণ স্মার্ট সে। আবদুল্লাহ হয়তো কোথাও দেখেছেন তাকে, কোথায় হতে পারে? যুবকের সামনে এসে দাঁড়ালো এক সুন্দরী তরুণী। একি! আমাদের মৌমিতা আদনান! যুবকের সামনে দাঁড়িয়ে কিছু বললো, তারপর উঠে গেল গাড়িতে! বোকার মতো সেদিকে তাকিয়ে থাকলেন হাসান আবদুল্লাহ। তাহলে! মাথা ঘুরে যাবার অবস্থা হলো তার। দ্রুত চা শেষ করে একটা সিগারেট ধরালেন। বেশ জোরে বললেন- ধূমপান মৃত্যুর কারণ। ইমোশনাল হলে তিনি ঘন ঘন সিগারেট ধরান আর বলেন- ধূমপান মৃত্যুর কারণ। অদ্ভুত মানুষ আবদুল্লাহ! মৌমিতা আজ ঘণ্টা দুয়েক আগে ছুটি নিয়ে অফিস ছেড়েছে। তাহলে এখন কোথা থেকে এলো সে? কোথায় ছিলো, বিউটি পার্লার বা অন্য কোথাও ছিল! ছুটি নেবার আগে বলেছিলো, স্যার, ভীষণ দাঁতব্যথা করছে, কোনো কিছু জিজ্ঞাসা না করেই ছুটি দিয়েছিলেন আবদুল্লাহ, কারণ দাঁতের ব্যথা ভয়ংকর কষ্টের। তাহলে এখন কী দেখলেন তিনি! নিশ্চয়ই দাঁতের ডাক্তার মৌমিতাকে চকচকে দামি গাড়িতে চড়িয়ে নিয়ে যেতে আসেননি।
পরদিন সকালবেলা হাসান আবদুল্লাহ ডেকে পাঠালেন মৌমিতা আদনানকে। সামনে এসে হাসিমুখে দাঁড়ালো মৌমিতা,
-সালাম স্যার।
-কেমন আছো মৌমিতা?
-আমি ভালো আছি, স্যার আপনি?
-ভালো, আচ্ছা মৌমিতা গতকাল বিকেলে তুমি বললে খুব দাঁতব্যথা করছে, ডাক্তারের কাছে যেতে হবে, মনে আছে তোমার?
-কেন মনে থাকবে না স্যার, এখান থেকে বের হয়ে সোজা ডাক্তারের কাছে চলে গেলাম, ডাক্তার সাহেব ব্যথার দাঁতটা দেখে বললেন, ফিলিং করতে হবে, আগামীকাল যেতে বলেছেন।
পুরনো টিনের চালে শ্রাবণের হঠাৎ আসা বৃষ্টির শব্দের মতো মৌমিতার কণ্ঠ থেকে কথা ঝরছিলো। আবদুল্লাহর প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলো মৌমিতা, খুব স্বাচ্ছন্দ্যে। অবিশ্বাস্য রকমের সুন্দরী এই মেয়ে অন্য কোথাও চাকরি না করে অর্কিডের মতো শপে সামান্য সেলস গার্লের চাকরি করছে কেন, বুঝতে পারলেন না হাসান আবদুল্লাহ। কী বলবেন! তাকে যা-ই জিজ্ঞাসা করা হোক না কেন, সে সবগুলোর উত্তর দেবে সঠিক এবং দ্রুত। আবদুল্লাহ সাহেব বললেন, ঠিক আছে যাও।
- থ্যাংক ইউ স্যার। মৌমিতা তার সেকশনে চলে গেল।
এখন মন ভালো থাকে না মৌমিতার, রিকশায় বসলেই একটা গভীর ভাবালুতা চেপে ধরে তাকে, কাস্টমার আসছে না শপে, আগে এই বাইশ তলা ভবনটা গমগম করতো মানুষের ভিড়ে, একটা চাইনিজ, একটা ইটালিয়ান দুটো বড় বড় রেস্টুরেন্ট, প্রত্যেকটা ফ্লোরের সবাই কেনাকাটা করতো অর্কিডে, কী দ্রুত বদলে গেল সবকিছু, এখন দুশ্চিন্তা হয় কটা দিন পার হলে কী করে চালডাল কিনবে, কী করে মা-বোনের মুখে খাবার তুলে দেবে।
একদিন মাকে বলেই ফেললো মৌমিতা -মা, চারপাশের অবস্থা দেখে খুব খারাপ লাগছে আমার, পাড়ার দর্জিকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম ওরা প্লেইন পাঞ্জাবি তৈরি করে দিতে পারবে কিনা, ওরা বলেছে পারবে। ওরা পাঞ্জাবি তৈরি করে দিলে আমরা পাঞ্জাবির বুকের ওপর সুঁই-সুতার কাজ করতে পারবো না? মা সাথে সাথে উত্তর দিয়েছে, হ্যাঁ মা আমরা পারবো, কিন্তু কাজ করার পর আমরা যদি ওসব কাজ করা পাঞ্জাবি বড় কোনো কোম্পানির কাছে সাপ্লই করতে পারতাম, তাহলে আমাদের হাতে কিছু লাভ থাকতো।
চারপাশের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেল। সরকার বলেছে সমস্ত সুপার শপ বন্ধ রাখতে হবে। সারা দুনিয়া আতঙ্কগ্রস্ত! ঘরে বসে এলোমেলো ভাবছিলেন হাসান আবদুল্লাহ, অর্কিডের মেয়েরা সবাই কাজ করতে চায়, কিন্তু কে কীভাবে এখন কাজ দেবে ওদের। করোনা আতঙ্ক কতোদিনে কাটবে, কেউ কিছুই বলতে পারবে না, এসব ভেবে কোনো কূল-কিনারা পান না হাসান আবদুল্লাহ, সবগুলো মেয়েই সুন্দরী আর স্মার্ট, সবকিছু এভাবে থেমে গেলে পেটের দায়ে ওরা বিপথে চলে যেতে পারে, গভীর ভাবালুতায় ডুবে গেলেন তিনি! মৌমিতা মেয়েটার বাবা নেই, ঘরে মা আর এক প্রতিবন্ধী বোন, কীভাবে চলবে ওরা, কী খাবে, এসব পরিবারের তো খাবার সমস্যা আগে।
স্পেন-ইটালি-আমেরিকাতে প্রতিদিন আটশো নয়শো মারা যাচ্ছে করোনায়। লাখ লাখ মানুষ আক্রান্ত। ওসব দেশে বাংলাদেশের মানুষ কাজ করতো, ওখানেই বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি হতো, ওসব দেশের অফিস-আদালত-হোটেল সবকিছু বন্ধ হয়ে গেছে, প্রবাসীরা দেশে ফিরে আসছে হু হু করে! চারদিকে লকডাউন আর লকডাউন, অর্কিড বন্ধ হয়ে গেছে, বোন আর মাকে নিয়ে কোথায় দাঁড়াবে মৌমিতা, হায়! দু'দিন পর কী হবে তাদের? দুশ্চিন্তায় হাবুডুবু খায় মৌমিতা। কোনো কূলকিনারা করতে পারে না!
মোবাইল ফোন বেজে ওঠে মৌমিতার, চমকে ওঠে সে, আবীর হাসান ফোন করেছে, কেন! কী বলতে চায় সে!
- হ্যালো...।
- মৌমিতা, কিছুদিন আগে আপনি বলেছিলেন বুকের দু'পাশে সুন্দর কাজ করা পাঞ্জাবি পাওয়া যাবে, ঈদের আগেই শ'পাঁচেক পাঞ্জাবি সাপ্লই করতে পারবেন? আমরা অনলাইনে হোম ডেলিভারি সার্ভিস চালাবো, পারবেন দিতে? ডুবন্ত মানুষের কাছে খড়কুটো যেমন, মৌমিতার কাছে ঠিক তেমনই মনে হলো আবীর হাসানের ফোনটাকে!
-অবশ্যই পারবো, হ্যাঁ পারবো, অবশ্যই পারবো।
দ্রুত উঠে যায় মৌমিতা, মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। া
লেখক
কথাসাহিত্যিক
মেয়েরা নিজ নিজ সেকশনে যাবার আগে শপের ভেতরের নৈমিত্তিক কাজগুলো সেরে নেয়। এয়ার ফ্রেশনার স্প্রে করে শপের আনাচে-কানাচে। কাঁচা লেবুর টাটকা সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত ঘরের ভেতর। এসি ছেড়ে দেয়। বিশাল অ্যাকোয়ারিয়ামের লাল, হলুদ, কালো, রঙ-বেরঙের মাছগুলোকে খাবার দেয়। খাবার পেয়ে মাছগুলো চঞ্চল হয়ে ওঠে। টবের গাছগুলোর সবুজ পাতার ওপর পানি স্প্রে করে, তখন পাতাগুলোও সজীব হয়ে ওঠে। শপের ম্যানেজার হাসান আবদুল্লাহ নির্ধারিত গানের সিডি ঢুকিয়ে দেন সিডি প্লেয়ারে। সমস্ত সেকশনের সাউন্ড সিস্টেমে গান বেজে ওঠে হালকা মিষ্টি সুরে- আনন্দ ধারা বহিছে ভুবনে...।
বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয় না, ক্রেতারা চলে আসে, যার যা ইচ্ছেমতো জিনিস কিনে নিয়ে চলে যায়, এভাবেই প্রতিদিন সকাল থেকে রাত অব্দি অর্কিড সরগরম থাকে।
এক যুবক ফাস্টফুড সেকশনের সামনে এসে দাঁড়ায়। তার কানে ইয়ারফোন লাগানো, ফেড জিন্সের সাথে ব্ল্যাক টি-শার্ট গায়ে, মাথার পেছনে লম্বা চুলে ব্যান্ড, গায়ের রঙ ফরসা। ব্রাউন কালার ফ্যাশন শু পায়ে। যুবক মৌমিতার সামনে দাঁড়িয়ে খাবারের মেন্যু দেখছিলো। সে জানতে চাইলো, চিনি কম দিয়ে এক কাপ কফি দেয়া যাবে? মৌমিতা সাথে সাথে জবাব দিলো- শিওর স্যার, কেনো দেয়া যাবে না? যুবক একটা চিকেন বার্গার গরম করে দিতে বলে। পুরো শপের ভেতর কোথাও বসার ব্যবস্থা নেই। যুবকের দিকে তাকিয়ে শারমিন মৌমিতাকে বললো,
-দারুণ!
-কী? জানতে চাইলো মৌমিতা।
পারফিউম সেকশনে দাঁড়িয়ে শিলা ডি কস্টাও দূর থেকে যুবকের দিকে তাকিয়ে আছে মুগ্ধ চোখে। শিলার মা বলতো, পুরুষের সৌন্দর্যের কোনো তুলনা হয় না। তখন মায়ের কথা বুঝতে পারেনি শিলা। এখন সামনের যুবককে দেখে মায়ের কথা বুঝতে পারে। মা আসলে ঠিকই বলেছিল। যেমন যুবকের গায়ের রং, পোশাক-পরিচ্ছদ, তেমন তার সুন্দর স্বাস্থ্য। সত্যিই সুন্দর লাগছে তাকে। যুবক কফি খায়। যুবকের দিকে তাকিয়ে নানান কথা ভাবে শিলা। যদি পারফিউম সেকশনে এসে দাঁড়ায়, তাহলে তাকে দামি দামি পারফিউম দেখাবে, আফটার শেভ লোশান দেখাবে। শিলা যখন কল্পনায় যুবকের সঙ্গে কথা বলছিলো তখন তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ভীষণ মোটা এক মহিলা। শিলাকে বললেন- আচ্ছা নিনা রিচি দেখছি না তো? শিলা সম্বিৎ ফিরে পেলো- জি ম্যাম, ইয়েস ম্যাম, নিনা? শিলা মহিলাকে মেয়েদের পারফিউমগুলো দেখায় এক এক করে। মহিলা একটা নিনা রিচি তুলে তার বাস্কেটের এক পাশে রেখে বললো- থ্যাংকস। ওয়েলকাম ম্যাম, আবার আসবেন ম্যাম। শিলা আবার যুবকের দিকে তাকায়। শিলার কাণ্ড দেখে মোটা মহিলা মুচকি হাসে, কিন্তু তিনিও বারবার তাকাতে লাগলেন যুবকের দিকে। যুবকের উপস্থিতি মেয়েগুলোর দৃষ্টি কেড়ে নেয়, শারমিনকে তখন ডেকে পাঠিয়েছেন হাসান আবদুল্লাহ। মৌমিতা একদম একা। তার সামনে যুবক। সে মৌমিতাকে কিছু জিজ্ঞাসা করলে হেসে ফেলে মৌমিতা। আবার মৌমিতা যুবককে কিছু জিজ্ঞাসা করলে যুবকও একটু হাসে।
ঘরে ঢুকেই মায়ের চিৎকার শুনে বুক কেঁপে ওঠে মৌমিতার- মৌমিতা শিগগির আয়। ছুটে গিয়ে দেখে, মা মৌটুসিকে জড়িয়ে ধরে আছে, বললো- তাড়াতাড়ি স্যাভলন আর ব্যান্ডেজ আন। মৌমিতা দৌড়ে গিয়ে স্যাভলন ক্রিম আর ব্যান্ডেজ এনে বলে- কী হলো মা?- দেখ্ হাত কেটে কী করেছে তোর বোন! মৌমিতা কাঁদতে কাঁদতে বোনের হাতে ব্যান্ডেজ বেঁধে দেয়, বলে- কী যে করো না আপু! আমাদের খারাপ লাগে না বুঝি? মৌটুসি মৌমিতার বড় বোন, সে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। ডাক্তার যখন ইনজেকশন দেয় তখন একটু ভালো থাকলেও আবার সে আগের মতো বোকা হয়ে যায়। অসুস্থ হয়ে পড়ে। সারাদিনই ঘরে বসে থাকে, একা একা কথা বলে। সবসময় টিভির সামনে রিমোট কন্ট্রোল হাতে নিয়ে বসে থাকে। ইচ্ছেমতো চ্যানেল ঘোরায়। কার্টুন দেখে।
ডাইনিং টেবিলে খাবার দিলেন মৌমিতার মা। তাড়াতাড়ি খেয়ে উঠে ঘরে গিয়ে মোবাইলে ফেসবুক ওপেন করে মৌমিতা। প্রথমেই ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টের ওপর ক্লিক করে। একটা একটা করে তাদের প্রোফাইল, মিউচুয়াল ফ্রেন্ডের সংখ্যা, ছবি, এসব দেখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। তিন নম্বরে গিয়ে ক্লিক করতেই আকাশ থেকে পড়লো মৌমিতা, একি! যে যুবক অর্কিডে কফি খেয়ে গেছে, সে! মানে শারমিন যাকে হ্যান্ডসাম উপাধি দিয়েছে, সেই যুবক তাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে। বিষয়টা ওর কাছে অকল্পনীয়। গত পরশু কফি খাওয়ার পর বলেছিলো আপনার নামটা বলবেন প্লিজ? সে উত্তর দিয়েছিলো,
-মৌমিতা আদনান, আদনান আমার বাবার নাম।
-এত সুন্দর নাম আপনার! আপনি দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি আপনার নামটাও সুন্দর!
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেলো মৌমিতার। তাড়াহুড়ো করে একটা রিকশা নেয়। অর্কিডে ঢুকে দেখে অন্য মেয়েরা সবাই চলে এসেছে। ওরা এখন কাজে ব্যস্ত। বাহাদুর মিয়া ঘর পরিস্কার করে পোশাক পাল্টে বসে গেছে তার নির্দিষ্ট জায়গায়। শারমিন তাদের ফাস্টফুড সেকশনের সবকিছু ঝেড়েমুছে ঝকঝকে করে রেখেছে। আবদুল্লাহ স্যার তার ঘরে বসে নাশতা করছেন। আজ খুব সুন্দর একটা গান বাজছে- আকাশ ভরা সূর্য তারা, বিশ্ব ভরা প্রাণ...। মৌমিতার নাকে শুচি স্নিগ্ধ তাজা বেলিফুলের ঘ্রাণ ভেসে এলে সে উর্বশীর দিকে তাকলো,
-কিরে? বেলি ফুল!
-নতুন এয়ার ফ্রেশনার, বেলিফুলের ঘ্রাণ, খুব সুন্দর না? হাসতে হাসতে
উর্বশী বলে।
-সত্যিই খুব সুন্দর ঘ্রাণ, নিশ্চয়ই ম্যানেজার স্যার এনেছেন?
-না, সকালে কিবরিয়া ভাই অর্কিডের জন্যে গিফট এনেছেন, যেন আমরা এই কোম্পানির ফ্রেশনার ইউজ করি। উর্বশীর কথা শুনে হেসে ফেলে মৌমিতা।
পারফিউম সেকশনে গেল মৌমিতা। শিলার সাথে কথা বলবে সে। শিলা কটাক্ষ করলো,
-তোর মজা দেখলাম মৌমিতা।
-কীসের মজা?
-ওই যে ওই দিন শারমিন ছিলো না, তুই আর ওই হ্যান্ডসাম কথা বলছিলি, কী এত কথা বললো রে, বল না প্লিজ, আমার না শুনতে খুব ইচ্ছা করে, ইস যদি আমার সেকশনে আসতো তাহলে...।
-তাহলে কী, একটা দামি পারফিউম গিফট দিয়ে দিতিস?
-না, তা করতাম না, তবে একটা কিছু করতাম।
- জড়িয়ে ধরে কিস করতিস?
মৌমিতার ঠিক কথাতে খিলখিল করে হেসে ওঠে শিলা, সে মাথা ওপর-নিচ করে অর্থাৎ সত্যিই সে কিস করতো!
মৌমিতা ফিরে এলো। শিলার মতলব ভালো না। শিলা জানে না, শারমিনও জানে না, অর্কিডের কেউই জানে না সেই সুন্দর যুবকের নাম আবীর হাসান, সে এখন মৌমিতার ফেসবুক ফ্রেন্ড, মৌমিতা নয় ওই যুবকই তাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে বন্ধু হবার জন্য। মৌমিতা শুধু ওই রিকোয়েস্ট কনফার্ম করেছে ব্যস, আর এসব গোপন কথা সে কাউকে জানাবে না কোনোদিনও। কারণ শিলার কাছে গেলে শিলা এমন কিছু করবে বা এমন কিছু ইঙ্গিত করবে তাতে যে কোনো পুরুষ মানুষের মাথা ঘুরে যেতে বাধ্য। শিলা পারে না এমন কোনো কাজ নেই। আর শারমিন, বাপরে বাপ, এমন স্টাইল করে কথা বলবে যেন তার কতদিনের চেনাজানা, কত আপনজন। শারমিনের এসব ঢং দেখলে গা জ্বলে যায় মৌমিতার। যদি আজ আবীর হাসান আসে তাহলে তাকে কী বলবে মৌমিতা, চোখের ইশারায় বোঝানোর চেষ্টা করবে যে, কোনোভাবেই শারমিন বা শিলার সামনে যেন ফেসবুকের প্রসঙ্গ না তোলে আবীর।
আবীর শারমিনের সঙ্গে কী কথা বলছে! শুনতে পাচ্ছে না মৌমিতা, শুধু শারমিনের মুখে কেমন একটা রহস্যময় হাসি। কাছে যেতেই শুনতে পেলো 'ওই তো চলে এসেছে।' মৌমিতা ঢুকতেই আবীর হাসান বললো,
-ভালো আছেন?
-হ্যাঁ, ভালো আছি, আপনি?
-ভালো। আবীর বললো।
আজো আবীরকে খুব সুন্দর লাগছে। দু'জন দু'জনার দিকে তাকিয়ে থাকলো কয়েক সেকেন্ড। বিষয়টা শারমিনের চোখ এড়ালো না। দূরে দাঁড়িয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে শিলা। তার মনটা এখন কসমেটিকস বা পারফিউমস সেকশনে নেই, সে এখন কফি শপের যুবকের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। শিলা দেখছিলো আবীর হাসানকে। ওহ্ ঈশ্বর, মানুষ এত সুন্দর হয়! আজো যুবক ম্যাচ করা পোশাক আর জুতা পরে এসেছে!
-কী খাবেন? মৌমিতা জানতে চাইলো
-এখানে এলে কী খেতেই হবে, কথা বলা যাবে না?
-না তা নয়, তবে এটাতো খাবার সেকশন তাই। মৌমিতা বললো।
-দিন, আপনি যা ভালো বোঝেন।
- চিকেন ফ্রাই দিই, আর এক কাপ কড়া কফি? মৌমিতা একটু হেসে বললো।
-দ্যাটস রাইট, দিন চিকেন দিন, কফি দিন, আজ দুপুরে লাঞ্চ করা হয়নি, সারাদিন কাজের মধ্যে ছিলাম। একটা চিজ বার্গারও দিন।
মৌমিতার মনে হলো আজ এদিকে কোথাও কাজে এসেছে আবীর হাসান, একদিন একটুখানি বলেছিল, তার একটা প্রোডাকশন হাউস আছে এই গুলশানেই, এসব মৌমিতা জানে না, জানার কথাও নয়। মৌমিতা বললো, এখানে কি আপনার কোন বিজনেস আছে?
- হ্যাঁ আছে, ওই তো ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিমে- কারুকাজ।
- খুব সুন্দর নাম, কী হয় ওখানে?
- যুবক-যুবতীদের পোশাক বিক্রি করি।
মৌমিতা নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না, হঠাৎ সে বলে ফেললো,
-শারমিনকে কিছু বলেছেন?
-কোন্ ব্যাপারে?
-ওই যে ফেসবুক? মাথা নত করে উত্তরের অপেক্ষায় থাকলো মৌমিতা।
-না, না, ওকে বলবো কেন, ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট তো পাঠিয়েছি আমি, তাই না? থ্যাংকস যে আপনি আমাকে অ্যাকসেপ্ট করেছেন।
-ইউ আর ওয়েলকাম। মৌমিতা বললো।
একদিন হঠাৎ মৌমিতা বললো, শারমিন শুনেছিস? কী? চিনদেশে নাকি নতুন একটা রোগ ছড়িয়েছে? -হ্যাঁ শুনেছি, টিভির খবরে দেখেছি, কেনো? -ওই রোগের নাকি কোনো চিকিৎসা নেই, রোগটা নাকি ছোঁয়াচে? -কী জানি ভাই, এটা তো আমাদের কোনো হেডেক না, চীন বহুদূর।
তারপর শারমিনের সাথে মৌমিতার কথা হয়েছে প্রায় প্রতিদিন। তারা শুনেছে রোগটার নাম করোনাভাইরাস, ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের দেশে।
সন্ধ্যার পর নন্দন টাওয়ারের সামনে চা খাচ্ছিলেন হাসান আবদুল্লাহ, হঠাৎ দেখলেন একটা দামি গাড়ি তার সামনে দিয়ে ছুটে গিয়ে ব্রেক করলো। গাড়ি থেকে নেমে এলো সুন্দর এক যুবক। পোশাক-পরিচ্ছদে দারুণ স্মার্ট সে। আবদুল্লাহ হয়তো কোথাও দেখেছেন তাকে, কোথায় হতে পারে? যুবকের সামনে এসে দাঁড়ালো এক সুন্দরী তরুণী। একি! আমাদের মৌমিতা আদনান! যুবকের সামনে দাঁড়িয়ে কিছু বললো, তারপর উঠে গেল গাড়িতে! বোকার মতো সেদিকে তাকিয়ে থাকলেন হাসান আবদুল্লাহ। তাহলে! মাথা ঘুরে যাবার অবস্থা হলো তার। দ্রুত চা শেষ করে একটা সিগারেট ধরালেন। বেশ জোরে বললেন- ধূমপান মৃত্যুর কারণ। ইমোশনাল হলে তিনি ঘন ঘন সিগারেট ধরান আর বলেন- ধূমপান মৃত্যুর কারণ। অদ্ভুত মানুষ আবদুল্লাহ! মৌমিতা আজ ঘণ্টা দুয়েক আগে ছুটি নিয়ে অফিস ছেড়েছে। তাহলে এখন কোথা থেকে এলো সে? কোথায় ছিলো, বিউটি পার্লার বা অন্য কোথাও ছিল! ছুটি নেবার আগে বলেছিলো, স্যার, ভীষণ দাঁতব্যথা করছে, কোনো কিছু জিজ্ঞাসা না করেই ছুটি দিয়েছিলেন আবদুল্লাহ, কারণ দাঁতের ব্যথা ভয়ংকর কষ্টের। তাহলে এখন কী দেখলেন তিনি! নিশ্চয়ই দাঁতের ডাক্তার মৌমিতাকে চকচকে দামি গাড়িতে চড়িয়ে নিয়ে যেতে আসেননি।
পরদিন সকালবেলা হাসান আবদুল্লাহ ডেকে পাঠালেন মৌমিতা আদনানকে। সামনে এসে হাসিমুখে দাঁড়ালো মৌমিতা,
-সালাম স্যার।
-কেমন আছো মৌমিতা?
-আমি ভালো আছি, স্যার আপনি?
-ভালো, আচ্ছা মৌমিতা গতকাল বিকেলে তুমি বললে খুব দাঁতব্যথা করছে, ডাক্তারের কাছে যেতে হবে, মনে আছে তোমার?
-কেন মনে থাকবে না স্যার, এখান থেকে বের হয়ে সোজা ডাক্তারের কাছে চলে গেলাম, ডাক্তার সাহেব ব্যথার দাঁতটা দেখে বললেন, ফিলিং করতে হবে, আগামীকাল যেতে বলেছেন।
পুরনো টিনের চালে শ্রাবণের হঠাৎ আসা বৃষ্টির শব্দের মতো মৌমিতার কণ্ঠ থেকে কথা ঝরছিলো। আবদুল্লাহর প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলো মৌমিতা, খুব স্বাচ্ছন্দ্যে। অবিশ্বাস্য রকমের সুন্দরী এই মেয়ে অন্য কোথাও চাকরি না করে অর্কিডের মতো শপে সামান্য সেলস গার্লের চাকরি করছে কেন, বুঝতে পারলেন না হাসান আবদুল্লাহ। কী বলবেন! তাকে যা-ই জিজ্ঞাসা করা হোক না কেন, সে সবগুলোর উত্তর দেবে সঠিক এবং দ্রুত। আবদুল্লাহ সাহেব বললেন, ঠিক আছে যাও।
- থ্যাংক ইউ স্যার। মৌমিতা তার সেকশনে চলে গেল।
এখন মন ভালো থাকে না মৌমিতার, রিকশায় বসলেই একটা গভীর ভাবালুতা চেপে ধরে তাকে, কাস্টমার আসছে না শপে, আগে এই বাইশ তলা ভবনটা গমগম করতো মানুষের ভিড়ে, একটা চাইনিজ, একটা ইটালিয়ান দুটো বড় বড় রেস্টুরেন্ট, প্রত্যেকটা ফ্লোরের সবাই কেনাকাটা করতো অর্কিডে, কী দ্রুত বদলে গেল সবকিছু, এখন দুশ্চিন্তা হয় কটা দিন পার হলে কী করে চালডাল কিনবে, কী করে মা-বোনের মুখে খাবার তুলে দেবে।
একদিন মাকে বলেই ফেললো মৌমিতা -মা, চারপাশের অবস্থা দেখে খুব খারাপ লাগছে আমার, পাড়ার দর্জিকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম ওরা প্লেইন পাঞ্জাবি তৈরি করে দিতে পারবে কিনা, ওরা বলেছে পারবে। ওরা পাঞ্জাবি তৈরি করে দিলে আমরা পাঞ্জাবির বুকের ওপর সুঁই-সুতার কাজ করতে পারবো না? মা সাথে সাথে উত্তর দিয়েছে, হ্যাঁ মা আমরা পারবো, কিন্তু কাজ করার পর আমরা যদি ওসব কাজ করা পাঞ্জাবি বড় কোনো কোম্পানির কাছে সাপ্লই করতে পারতাম, তাহলে আমাদের হাতে কিছু লাভ থাকতো।
চারপাশের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেল। সরকার বলেছে সমস্ত সুপার শপ বন্ধ রাখতে হবে। সারা দুনিয়া আতঙ্কগ্রস্ত! ঘরে বসে এলোমেলো ভাবছিলেন হাসান আবদুল্লাহ, অর্কিডের মেয়েরা সবাই কাজ করতে চায়, কিন্তু কে কীভাবে এখন কাজ দেবে ওদের। করোনা আতঙ্ক কতোদিনে কাটবে, কেউ কিছুই বলতে পারবে না, এসব ভেবে কোনো কূল-কিনারা পান না হাসান আবদুল্লাহ, সবগুলো মেয়েই সুন্দরী আর স্মার্ট, সবকিছু এভাবে থেমে গেলে পেটের দায়ে ওরা বিপথে চলে যেতে পারে, গভীর ভাবালুতায় ডুবে গেলেন তিনি! মৌমিতা মেয়েটার বাবা নেই, ঘরে মা আর এক প্রতিবন্ধী বোন, কীভাবে চলবে ওরা, কী খাবে, এসব পরিবারের তো খাবার সমস্যা আগে।
স্পেন-ইটালি-আমেরিকাতে প্রতিদিন আটশো নয়শো মারা যাচ্ছে করোনায়। লাখ লাখ মানুষ আক্রান্ত। ওসব দেশে বাংলাদেশের মানুষ কাজ করতো, ওখানেই বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি হতো, ওসব দেশের অফিস-আদালত-হোটেল সবকিছু বন্ধ হয়ে গেছে, প্রবাসীরা দেশে ফিরে আসছে হু হু করে! চারদিকে লকডাউন আর লকডাউন, অর্কিড বন্ধ হয়ে গেছে, বোন আর মাকে নিয়ে কোথায় দাঁড়াবে মৌমিতা, হায়! দু'দিন পর কী হবে তাদের? দুশ্চিন্তায় হাবুডুবু খায় মৌমিতা। কোনো কূলকিনারা করতে পারে না!
মোবাইল ফোন বেজে ওঠে মৌমিতার, চমকে ওঠে সে, আবীর হাসান ফোন করেছে, কেন! কী বলতে চায় সে!
- হ্যালো...।
- মৌমিতা, কিছুদিন আগে আপনি বলেছিলেন বুকের দু'পাশে সুন্দর কাজ করা পাঞ্জাবি পাওয়া যাবে, ঈদের আগেই শ'পাঁচেক পাঞ্জাবি সাপ্লই করতে পারবেন? আমরা অনলাইনে হোম ডেলিভারি সার্ভিস চালাবো, পারবেন দিতে? ডুবন্ত মানুষের কাছে খড়কুটো যেমন, মৌমিতার কাছে ঠিক তেমনই মনে হলো আবীর হাসানের ফোনটাকে!
-অবশ্যই পারবো, হ্যাঁ পারবো, অবশ্যই পারবো।
দ্রুত উঠে যায় মৌমিতা, মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। া
লেখক
কথাসাহিত্যিক
- বিষয় :
- সুপার শপের মেয়ে
