ঢাকা রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬

গানের ভেতর দিয়ে যখন দেখি ভুবনখানি

গানের ভেতর দিয়ে যখন দেখি ভুবনখানি
×

ড. আফসার আহমদ

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২০ | ১২:০০

আজও দিনশেষে সন্ধ্যা এলো। তবে এই সন্ধ্যা আর আগের মতো লাগছে না। আগে সন্ধ্যা দেখেছি ক্ষণিক অবকাশে, নানান সৃজন বাসনার সংরাগে। আজকের সন্ধ্যা অন্যরকম। কেমন যেন দুঃসময়ের ক্ষতের মতো স্যাঁতসেঁতে মন্থর সন্ধ্যা নেমেছে দিগন্তজুড়ে। আজকের সন্ধ্যাটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'কল্পনা' কাব্যগ্রন্থের 'দুঃসময়' কবিতার মতো মনে হয়। ঋষিকবি দুঃসময়ের ক্ষতের ভেতরেও অমৃতের প্রলেপ মেখেছেন আশাজাগানিয়া ভাষায়- "যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে,/সব সঙ্গীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া,/যদিও সঙ্গী নাহি অনন্ত অম্বরে,/যদিও ক্লান্তি আসিছে অঙ্গে নামিয়া,/মহা আশঙ্কা জপিছে মৌন মন্তরে,/দিক্‌-দিগন্ত অবগুণ্ঠনে ঢাকা-/তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,/এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।" হয়তো সন্ধ্যা তেমনি আছে, যেমন দেখেছি আগে কিন্তু বদলে গেছে আমার দেখবার চোখ কিংবা বদলে গেছে সময়। এটা তো সত্য যে, বিশ্ব ক্রমাগত বদলে যাচ্ছে এই বিপর্যস্ত অস্থির সময়ে। পৃথিবীর অদৃশ্য শত্রু করোনাভাইরাস আতঙ্কে বিশ্ব টালমাটাল। আমার মনে বিস্ময়বোধ প্রবল হয় এবং বিস্ময়টা প্রশ্নচিহ্ন হয়ে ঝুলে থাকে চোখের সামনে। পৃথিবীর এত যে বাঘা বাঘা বিজ্ঞানী গোকুলে (পরাশক্তিগুলোর ল্যাবরেটরিতে) বেড়ে উঠেছেন তারা এই ভাইরাসের কথা জানতেন না- তা আমার বিশ্বাস হয় না। সেসব দেশের মদমত্ত সরকারের ক্ষমতাধররা এই মহামারির তাণ্ডব কী ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে, ভাবেননি- তাও আমার প্রত্যয় হয় না। হয়তো তারা ভেবেছিলেন, এটা তাদের দেশের ক্ষতি করতে পারবে না। এটি অন্যদের, বিশেষ করে তাদের শত্রুদের ধ্বংস করবে এই ভেবে তৃপ্ত ছিলেন। আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, জার্মানি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্সসহ আরও অনেক শক্তিমান ভেবেছিল, এই ভয়াবহ বিপদ তাদের পাশ কাটিয়ে চলে যাবে। কিন্তু জানা ছিল না উটপাখির মতো মরুর বালিতে মুখ ঢাকলেই জগৎ ঢেকে রাখা যায় না। ডান ভেবেছে, এটা বামের সমস্যা, বাম ভেবেছে ডানের। ভাবতে পারেনি এটা ডান-বামের নয়, পুরো বিশ্বের সব মানুষের সমস্যা হয়ে উঠবে। পারমাণবিক শক্তির অবলেশ ও ক্লেদে পৃথিবী যে আর নিঃশ্বাস নিতে পারছে না তা ভাবেনি তারা। ক্রমাগত বাড়ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা। সভা, সেমিনার, আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়েছে অনেক। কিন্তু নিজেদের পারমাণবিক শক্তিকে সীমিত কিংবা পরিহার করেনি, ক্রমাগত বাড়িয়েই গেছে। বৈশ্বিক উষ্ণতার কথা জেনেও তারা নিরসনের কথা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবেনি। এখন বিশ্ব মোড়লরা এই করোনা সংকটে পতিত হয়ে যেন বাংলা প্রবাদের সেই বাণীর সমান্তরালে 'সাপ মারতে গিয়ে বাপ মেরে ফেলা'র অনুশোচনায় ভুগছেন। আদৌ ভুগছেন কিনা জানি না। তবে তারা অনুশোচনা করছেন এটা বিশ্বাস করতে চাই, খুব চাই। কারণ আমরা তো চাই শান্তি ও স্বস্তি। করোনার সন্ত্রাস থেকে মানুষ একদিন বেরিয়ে আসবে, আসবেই। কারণ রাতের অন্ধকার চিরকালের নয়। ভোর আসবেই। করোনা- উত্তীর্ণ সেই ভোরে মানুষের সামনে আসবে সারাবিশ্বের অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ। পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহ হুমকি থেকে সরে আসতে পারবে কিনা তার চ্যালেঞ্জ থাকবে মানুষের সামনে। তখন কি বিশ্ব আবার পারমাণবিক যুদ্ধের মুখোমুখি হবে? কে দেবে উত্তর? মানুষ যে কত অসহায় তা এই করোনাঘাতে মানুষ বুঝে গেছে। করোনা মহামারির এই বিপাকে পতিত বিশ্ব কার কাছে প্রতিকার চাইবে? এই সময়ে সভ্যতার বিভ্রান্তি বড় প্রকট হয়ে উঠছে। তবে কি সভ্যতা সৃজনের পথে নয়, কেবলই বিনষ্টির পথে এগিয়েছে এতকাল? এমন অনিশ্চিত সময়ে কোনো রকম অস্থিরতা কিংবা ভয় যে কাজ করে না, তা বলব না। মানুষের মধ্যে যত ভয় কাজ করে, বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা ততটাই প্রবল হয়ে ওঠে। তবে এখন একা বেঁচে থাকার বাসনা একসঙ্গে বেঁচে থাকার বাসনার দিকে ধাবমান। তাই আমরা এখন ভয়ও করছি একসঙ্গে। আশাও করছি একসঙ্গে। বাঁচতেও চাচ্ছি একসঙ্গে। আজকের উত্তীর্ণ বিকেলে, সূর্য ডোবার প্রাক্কালে, পশ্চিমাকাশ যখন সূর্যের বিদায়ী লাল আভায় ক্ষণিক রক্তিমাভ, তখন রবীন্দ্রনাথের "আমি ভয় করবো না ভয় করব না/দু'বেলা মরার আগে মরব না, ভাই, মরব না"- এই অতি পরিচিত গান শুনতে শুনতে উপলব্ধি হলো, গানের মানেটাও ক্রমাগত বদলে যাচ্ছে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সময়ে গানটি লিখেছিলেন কবি। সেই সময়ে দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে উৎসারিত, অন্তরে বিপুল শক্তি সঞ্চারের এই গানটির প্রেক্ষাপট বদলে যায় আমার কাছে এই করোনা আতঙ্কের অস্থির সময়ে। অন্তরে শক্তি জোগায়। এখন সারা বিশ্ব আতঙ্কিত। জনজীবন স্তব্ধ। অদৃশ্য এক শত্রুর বিরুদ্ধে একমাত্র বাঁচার উপায় হিসেবে পৃথিবীর মানুষ বেছে নিয়েছে সংগনিরোধ আত্মগোপনের পন্থা। অন্যের স্পর্শ বাঁচিয়ে নিজের ঘরে নিজে আবদ্ধ থাকা। মাঝেমধ্যে মনে হয়, আহা! একান্ত স্বজনের স্পর্শেও মানুষের আজ এত দ্বিধা, এত সংশয়! স্বজনের যে স্পর্শে সমস্ত পৃথিবীর ভয় মোছার দাওয়াই থাকে, সেই স্পর্শ থেকেও আমরা এখন দূরে। একজনের স্পর্শ থেকে আরেক প্রিয়জনের শরীরে যাতে জীবাণু না ছড়ায় সে জন্যই তো এই সংগনিরোধ বসবাস। স্পর্শদোষ থেকে বাঁচার জন্যই পুরো বিশ্বটাই হয়ে উঠছে কোয়ারেন্টাইন। স্পর্শহীন বিশ্ব এখন তাই স্পর্শের বাইরে থেকেই মমতার স্পর্শ রাখছে মানুষের কপালে। রবীন্দ্রনাথের ভয় বিমোচনের এই গান শুনতে শুনতে নির্ভয়ের উপলব্ধি জাগে মনে। হয়তো তা খানিকটা নিয়তিবাদী। কোনো এক অসীম করুণাময়ের কাছে করুণাভিক্ষা। কিছুই তো আর করার নেই। এখন তো তা-ই ঘটছে বদলে যাওয়া বিশ্বে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গানের মানেও সময়ের প্রাসঙ্গিকতায় বদলে যায়। বিপর্যস্ত এই পৃথিবীতে বড় অন্তরঙ্গ মনে হয় রবীন্দ্রনাথের গান। বিশ্বের সব মানুষের জন্য হাহাকার করে ওঠে অন্তর। আমরাও এই সময়ে যেন 'আমি সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়/আমি তার লাগি পথ চেয়ে আছি পথে যে জন ভাসায়।' এমনি করে সব সর্বনাশে সেই সত্যের কাছে আমরাও আশ্রয় নিই যিনি পথে ভাসান কিন্তু পথের শেষে কল্যাণের হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। তখন এই গান আমার এবং হয়তো আরও অনেকেরই অন্তরে শক্তি জোগায়। আমরা নিঃশেষিত হবো না এমন প্রবল প্রত্যয়ে উচ্চারণ করি- 'আমারে তুমি অশেষ করেছ, এমনি লীলা তব-/ফুরায়ে ফেলে আবার ভরেছ জীবন নব নব।' বিজ্ঞান যেখানে আপাতত অসহায়, এমন দুঃসময়ে আমাদের মানবিক বোধের ভেতর দিয়ে মানুষের অসীম শক্তিকে অনুভব করি। মানুষের স্রষ্টা মানুষকে ভালোবেসেই তো সেই বিপদহরণ মন্ত্র শিখিয়েছেন। আজ করোনাভাইরাস আতঙ্কের এই বিশ্বে মানুষের ভেতরে এক সমষ্টিগত সহমর্মিতার আহ্বান ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয় এবং সেই সহমর্মিতা প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যের সব দেশে মানবতার অভয়বাণীর বীজমন্ত্র হয়ে গুঞ্জরিত। এই সময়ে আমরা সবাই প্রকৃতির এক বিরূপ খেয়ালের কাছে পর্যুদস্ত। আর্ত মানুষের আর্তনাদের ধ্বনি শোনা যায় বিশ্বজুড়ে। নিকট এবং দূরের বন্ধুত্ব রচিত হয় সেই আর্তনাদে। আজ পৃথিবীর মানুষের বেদনার ঐকতান কেবল আর্তের সঙ্গে আর্তের নয়, আর্তের সঙ্গে মিশেছে অনার্তের অন্তস্তল থেকে উৎসারিত কান্না। এখানেও আবার রবীন্দ্রনাথই সান্ত্বনা জোগায়, 'বরিষ ধরা-মাঝে শান্তির বারি/শুস্ক হৃদয় লয়ে আছে দাঁড়াইয়ে/ঊর্ধ্বমুখে নরনারী/না থাকে অন্ধকার, না থাকে মোহপাপ,/না থাকে শোকপরিতাপ,/হৃদয় বিমল হোক, প্রাণ সবল হোক, বিঘ্ন দাও অপসারি।'
আমরাও সকাতরে দেখি বিপন্ন বিশ্ব এখন বিঘ্ন থেকে মুক্তি চাচ্ছে। তবু এ কথা সত্য যে, মানুষ দাঁড়াবে মানুষের পাশে। মানুষের বিপর্যয় ঘটেছে, বিজ্ঞান এখনও কার্যকর কোনো প্রতিকার আবিস্কার করতে পারেনি। মানুষ ফিরে চলেছে প্রকৃতির আশ্রয়ে- সেই বৃক্ষ, উদ্ভিদ, নদী ও আকাশের কাছে। আজ আটলান্টিক আর পদ্মা, প্রশান্ত মহাসাগর আর যমুনা- কোনটি বড় সেই প্রতিযোগিতা ঘুচে গেছে। আজ আমেরিকা আর চীনের বিপর্যস্ত মানুষের যন্ত্রণা আলাদা নয়। এক হয়ে গেছে পৃথিবীর কালো আর সাদা মানুষের মৃত্যুর মিছিল। সারা পৃথিবীর আকাশের নিচে নানা বর্ণের ও মতের মানুষ আজ একই অনিশ্চয়তায় প্রহর গুনছে। সম্পদে, শক্তিতে যেসব দেশের শক্তিধররা ফিরে তাকাত না কারও দিকে, তারাও এখন অসহায় এবং হতাশ বেদনায় স্তব্ধ। আমাদের ব্যক্তিগত বেদনা এখন সমষ্টির বেদনা হয়ে উঠেছে। আমরা এখন ক্রমাগত ক্ষমতাহীন মানুষের গোত্রভুক্ত হয়ে সাম্য ও মানবতায় অসীম সম্ভাবনার দিকে চলেছি। মানুষ উপলব্ধি করছে, এই বিভেদের বিশ্ব একদিন বদলে যাবে। এই বিশ্বায়নের কালে শুধু বাণিজ্য এবং শক্তির অসমতায় নয়, হয়তো মমতার বন্ধনে প্রকৃত বিশ্বায়নের সূচনা ঘটবে। বিশ্বের মানুষ মমতা ও ভালোবাসায় এক কাতারে দাঁড়াবে, দাঁড়াবেই। মানুষ বুঝে ফেলেছে পারমাণবিক শক্তি শুধু দম্ভের প্রতীক, স্বস্তি কিংবা শান্তির নয়। সাম্প্রতিক বিশ্বের এই দুঃসময়ে রবীন্দ্রনাথের বাণী আমার এবং আমাদের অন্তর্গত বিশ্বাসে প্রতিধ্বনিত হয়-
বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারো-
সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারও।
নয়কো বনে, নয় বিজনে-
নয়কো আমার আপন মনে,
সবার যেথায় আপন তুমি, হে প্রিয়,
সেথায় আপন আমারও।
সবার পানে যেথায় বাহু পসারো,
সেইখানেতেই প্রেম জাগিবে আমারও।...
লেখক

শিক্ষাবিদ
প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন

×