ঢাকা রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬

অসুখ, মহামারি ও লোকায়ত শক্তি

অসুখ, মহামারি ও লোকায়ত শক্তি
×

পাভেল পার্থ

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২০ | ১২:০০

হাম বসন্ত ওঠল তাতে
ফুল ছড়ালো সকল পথে
এ ফুল যাবে মায়ের চরণে।
মা শীতলা ওঠল রথে
ফুল ছড়ালো সকল পথে
এ ফুল যাবে মায়ের চরণে।
(বসন্ত রোগবিনাশী শীতলা পূজার গীত, সংগ্রহ : জেলেখালী, শ্যামনগর, সাতক্ষীরা)
প্রকৃতির অসুস্থতাই মানুষের সমাজে 'রোগ' হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই রোগ ক্রমান্বয়ে 'অসুখ' ও 'মহামারি' তৈরি করে। রোগের সঙ্গে উপনিবেশ আর উন্নয়নের এক গভীর যোগসূত্র আছে। কলম্বাস যেমন লাল আদিবাসীদের আমেরিকায় নানা রোগ-ব্যাধি নিয়ে গিয়েছিলেন, এই বাংলাতেও উপনিবেশকালে বহিরাগতদের মাধ্যমে ঘটেছে নানা রোগের বিস্তার। চলতি করোনার কালেও বাংলাদেশ আক্রান্ত হয়েছে দেশের বাইরে থেকে আসা মানুষের মাধ্যমেই। যখন দেশে প্রথম রেললাইন হলো, বাড়ল ম্যালেরিয়া। একইভাবে দেশে কয়েক বছরে মেট্রোরেলসহ দশাসই সব উন্নয়ন প্রকল্প ডেঙ্গু কি চিকুনগুনিয়ার বিস্তার বাড়িয়েছে। কোনো মহামারি কেবল মৃত, সুস্থ কি আক্রান্ত মানুষ, কি ভূগোলের পরিসংখ্যান মাত্র নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নানামুখী শঙ্কা, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, অনাস্থা, আহাজারি, গুজব, আতঙ্ক কি আশার হাতছানি। কলেরা কি কালাজ্বর, বসন্ত কি ম্যালেরিয়ার কালে আমাদের গ্রামজনপদে বহু নিম্নবর্গীয় সুরক্ষার চল ঘটেছিল। মহামারি থেকে গ্রামের সুরক্ষা দিতে লড়াইয়ের নজির আমাদের আছে। করোনার কালে আমাদের মহামারি সামাল দেওয়ার সেসব সমষ্টিগত অভিজ্ঞতাকে কেন স্মরণে আনতে পারছি না? ওলাওঠা নামের এক রোগে ভুগত গ্রামবাংলার মানুষ। ১৮ শতকে এই ওলাওঠা রোগটিই বিশ্বব্যাপী কলেরা নামে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। কলেরার বিস্তার ঠেকাতে অনেক গ্রামে ওলাবিবি-ওলাইচণ্ডী-ওলাদেবীর থান গড়ে উঠেছিল। গুটিবসন্ত ঠেকাতেও গ্রামীণ নিম্নবর্গ শীতলা দেবীর থান তৈরি করেছে। কোনো গ্রামে ওলাওঠা কি গুটিবসন্ত ছড়িয়ে গেলে মানুষ 'গ্রাম বন্ধ' করে দিত কিছুদিনের জন্য। টানা কয়েক বছর এমন অভিজ্ঞতার ফলে মৌসুমভিত্তিক রোগ সামাল দেওয়ার জন্য গ্রামবাংলার মানুষের মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতিও গড়ে উঠেছিল। মহামারির বিপদ থেকে গ্রামকে বাঁচাতে মান্দিরা 'দেনমারাংআ' পূজার আয়োজন করতেন। কোচ, বর্মণ, রাজবংশীদের ভেতরেও অসুখের বিপদ থেকে গ্রামের সুরক্ষায় প্রতি বছর কয়েকদিনের জন্য গ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে 'গেরাম পূজা' আয়োজনের রেওয়াজ ছিল। খাগড়াছড়ির পাহাড়ে ত্রিপুরা আদিবাসীরা 'ম্যালেরিয়ার' বিস্তার রোধে 'সুকুন্দ্রায়-বুকুন্দ্রায়' পূজার সময় গ্রামকে 'শুদ্ধ' করতে চলাচল সীমিত করেন। মহামারির বিস্তার ঠেকাতে এলাকাকে সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন করা কি নানাবিধ সংগনিরোধের বহু নজির আমাদের নিম্নবর্গের অভিজ্ঞতা ও আখ্যানে আছে। গ্রামীণ নিম্নবর্গের বর্ষপঞ্জিকা প্রাণ ও প্রকৃতির নির্দেশনাকে মেনেই গড়ে তুলেছিল নানা কৃত্য ও বার্ষিক আয়োজন। সংক্রান্তি হলো বর্ষপঞ্জিকার এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। প্রতি মাসের শেষ হলো সংক্রান্তি আর প্রতি মাসের শুরু হলো মাস-পয়লা। ঋতুভিত্তিক পরিবর্তনে সমাজকে প্রস্তুত করবার সকল আয়োজন গড়ে উঠেছিল এ সময়টাতেই। এর ভেতর আবার চৈত্রসংক্রান্তি, ফাল্কগ্দুনসংক্রান্তি, পৌষসংক্রান্তি, ভাদ্রসংক্রান্তি, শ্রাবণসংক্রান্তি, কার্তিকসংক্রান্তির আয়োজন পার্বণময়। চলতি আলাপে বাঙালি ও আদিবাসী জীবনের অসুখ ও মহামারি সামাল দেওয়ার লোকায়ত চর্চাগুলো নিয়ে কথা বলব। আলাপের কেন্দ্রে রাখব সংক্রান্তিপরবগুলো। কারণ এ সময়টাতে সমাজ-পরবর্তী ৩৬৫ দিনের জন্য সামগ্রিক প্রস্তুতি নেয় শরীর ও মনে। আর এখানেই সংক্রান্তির শক্তি, অসুখ ও মহামারি মোকাবিলার লোকায়ত সাহস।
দেনমারাংআ
রোগের সংক্রমণ কি মহামারির বিপদ থেকে গ্রামকে বাঁচাতে মান্দি বা গারোরা 'দেনমারাংআ' পূজার আয়োজন করতেন। গ্রামের প্রবেশের পথগুলো মাটি-শণ দিয়ে কয়েক স্তর উঁচু করে বন্ধ করে দেওয়া হতো। একে 'কুশি' বলে। যখনই অসুখ বা মহামারি ছড়িয়ে পড়ত, তখনই গ্রামে বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়ে যেত, গ্রামের লোকজনও কিছুদিন গ্রাম থেকে বাইরে বেরোতেন না। কোচ, বর্মণ, রাজবংশীদের ভেতরেও অসুখের বিপদ থেকে সুরক্ষায় প্রতি বছর কয়েকদিনের জন্য গ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে 'গেরাম পূজা' আয়োজনের রেওয়াজ ছিল।
আং ডুব
বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকায় ম্রোদের অসুখ ও মহামারি থেকে বাঁচার জন্য গ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার যে কৃত্য পালিত হতো, তার নাম 'আং ডুব'। আশপাশে কোথায় মহামারির বিস্তার হলে গ্রামের লোকেরা কিছুদিন গ্রামেক বিচ্ছিন্ন রাখার প্রস্তুতি নিতেন। জঙ্গলের ঝিরি-ছড়া থেকে ভোরবেলা স্নান সেরে তুলে আনা হতো ছোট ছোট পাথর। পাথরে মহামারি তাড়ানোর মন্ত্র লেখা হতো সুইয়ের আঁচড়ে। সবাই কার্পাস তুলার সুতা দিয়ে গ্রামের চারধারে বাঁধন দিতেন। সব প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হতো। প্রতিটি প্রবেশপথে মাটির তলায় গুঁজে রাখা হতো মন্ত্রপূত পাথর।
আদাম বন গারানা
মহামারি থেকে গ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে রাখাকে চাকমা ভাষায় বলে 'আদাম বন গারানা'। গ্রামে প্রবেশের যত পথ আছে, পথের মোড়ে বাঁশের বেড়া দিয়ে দেওয়া হয়। সবাই গ্রামেই থাকেন এবং চাকমা তালিকশাস্ত্র অনুযায়ী পাহাড়ি বৈদ্যদের কাছ থেকে নানা ভেষজ চিকিৎসা গ্রহণ করেন।
কের পূজা
ত্রিপুরাদের ভেতর অসুখ ও মহামারি থেকে বাঁচতে 'কের পূজা'র চল আছে। পূজার আগের দিন নানা নিয়ম পালন করতে হয়। পাহাড়ি শাকসবজি ও ঘরে তৈরি পানীয় ঘরের বাইরে এনে রাখতে হয়। এই নিয়মগুলো গ্রামের সবাইকে পালন করে। মহামারি থেকে সুরক্ষায় গ্রামের সবাই কিছুদিন গ্রামেই বসবাস করতেন। তারপর মহামারি থামলে সবাই মিলে ছড়ার পাড়ে গিয়ে বারিনি মাতাই পূজার আয়োজন করতেন। কের পূজাতে গাজীকালুর কৃত্যও পালন করা হয়।
বাহা
ফৌগুন (ফাল্কগ্দুন) মাস থেকেই শুরু হয় সাঁওতালি বর্ষ। বর্ষবিদায় ও বরণের উৎসব বাহাও পালিত হয় এ মাসে। এ সময় গাছে গাছে সারজম, ইচৌক, মুরুপ্‌ আর মহুয়া ফুল ফোটে। বাহা পরবের ভেতর দিয়েই সাঁওতাল সমাজ এসব ফুলের মধু পান ও ব্যবহারের অনুমতি প্রার্থনা করে প্রকৃতির কাছে। বাহার আগে এসব ফুলের ব্যবহার সামাজিকভাবে নিষেধ। পরবে রোগ-জরা নিরাময়ে নতুন ফুলের স্পর্শ গ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রার্থনা করে সাঁওতাল সমাজ। প্রতিটি সাঁওতাল গ্রামে থাকে জাহেরথান। জাহেরথানে মহামারি থেকে গ্রামকে নিরাপদ রাখার প্রার্থনা জানানো হয়।
হেচড়া
'হেচড়পেচড় হেচড়া ঠাকরন, পেচড়াভরা চুল গো তোমার, পেচড়াভরা চুল।/ তাইতে আমি আইন্যা দেবো কুমড়ালতার ফুল।'- (হেচড়া পূজার গান, সংগ্রহ : উজানী, বাসুদেবপুর, গোপালগঞ্জ)
গোপালগঞ্জ-মাদারীপুরের চান্দারবিল এলাকায় হেচড়া দেবী পূজিত হন বসন্তকালে খোসপাঁচড়া, বসন্ত, চুলকানি নিরাময়ে। এই দিনে গো-ফাল্কগ্দুন রীতিও পালন করা হয়। গোবরে বউন্যা (বরুণ) ও ভাটির (ভাঁট) ফুল গেঁথে সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় ফাল্কগ্দুন মাসে এবং কোথাও চৈত্রসংক্রান্তিতে ভাঁট এবং বরুণ ফুল দিয়ে কৃত্য পালিত হয়।
পঞ্চমদোল
ফাল্কগ্দুনসংক্রান্তিতে আয়োজিত 'পঞ্চমদোল' বেশ কয়েকটি পর্ব ও আচারকৃত্যে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলে। প্রথম দোলভিটে মেরামত, দোলপূর্ণিমার প্রথম দিন কুঁড়া পোড়ানো পর্ব, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন দোলপূজা, চতুর্থ দিন হোলি, পঞ্চম দিন পুণ্যাহ বা সমাপ্তি। দোলভিটের সামনে পুবমুখী করে বগাঝোল, বাইল্যাবাত, মধুশাইল, নেপালদীঘা, ভাওয়াইল্যা, কইতরমণি, পোখরাজ- এরকম স্থানীয় আমন ধানের পল (খড়) ও মুলিবাঁশ দিয়ে পুরুষরা কুঁড়াঘর তৈরি করেন। গ্রাম থেকে অশান্তি, রোগশোক ও অশুভ শক্তিকে দূর করার জন্য এই কৃত্য পালিত হয়।
শীতলা পূজা
বসন্তরোগবিনাশী দেবী শীতলা। ফাল্কগ্দুন-চৈত্রে আয়োজিত শীতলা পূজা ঘিরে নরসিংদী, গাজীপুর, মৌলভীবাজার, সিলেট, সাতক্ষীরাসহ দেশের নানা প্রান্তে আয়োজন ও মেলা হয়। শীতলা পূজায় ১০৮টি মাটির ছোট প্রদীপ লাগে। একটি দেবী ঘট, একটি ফুল-জলের হাঁড়ি লাগে। এতে দুধ-বাতাসা- বেলপাতা-তুলসীপাতা-ডাবের জল মেশানো হয়। পূজার পরে সবাইকে এটি খেতে দেওয়া হয়। হোম যজ্ঞের কালি ও ঘি একত্রে মিশিয়ে মাথা-কপালে লাগানো হয়। সাতক্ষীরা অঞ্চলে প্রতি বছর মানুষের হাম-বসন্ত-পাতলা পায়খানা-জ্বর হলে এবং গরু-ছাগলের গায়ে গুটি বের হলে, পাতলা পায়খানা করলে শীতলা পূজার মানত করা হয়।
ঘাটাবান্ধাবর্ত
হাওরাঞ্চলে বসন্তকালীন রোগব্যাধি থেকে মুক্ত থাকতে এই ব্রত পালিত হয়। চালতাপাতা দিয়ে ঘাটা বাঁধা, ঘরবাড়ির চারপাশ, জমিন ও গৃহপ্রবেশের মুখে স্থাপন করা হয়। একইভাবে কমপক্ষে আট রকমের শাকসবজি দিয়ে আটআনাজবর্তও পালিত হয় যাতে মানুষের শরীরে কোনো জরাব্যাধি প্রবেশ না করতে পারে।
হাজরা ও বাইশাখী
রবিদাসদের ভেতর বাইশাখী পূজা ও হাজরা-কৃত্যের মাধ্যমে বর্ষবিদায় পালিত হয়। এদিন যবের ছাতু ও কাঁচা আম একত্রে মিশিয়ে আম-ছাতুয়া খাওয়া হয়। মৌসুমি ফল আমকে বর্ষবিদায়ের এ রীতির ভেতর দিয়েই সমাজ গ্রহণ করে রোগব্যাধি সামাল দেওয়ার জন্য। বছরের প্রথম দিন ঘরের দেওকুড়ি নামের পবিত্রস্থলে কর্মের পূজা করা হয়। রবিদাসদের ভেতর যে যে কর্মপেশায় জড়িত, তারা সেই কর্মের সঙ্গে জড়িত আনুষঙ্গিক উপকরণগুলো দেওকুড়িতে রাখে। হাতুড়ি, কোদাল, শাবল, কাঁচি, ছুরি, বাটাল যার কর্মে যা লাগে সব।
চইতবিশমা
দিনাজপুরের বিরলের কড়া আদিবাসীরা চৈত্রসংক্রান্তিতে আয়োজন করে চইতবিশমা। সংক্রান্তির কয়েকদিন আগে থেকেই পাড়া-গ্রাম পরিচ্ছন্ন করা হয়। এই দিনে নিমপাতার কাঁচা রস ও নানা পদের তিতা শাক খাওয়া হয়। পেঁয়াজ-রসুন-শুকনো মরিচ ঝুলানো হয় ঘরের দরজায়। কড়াদের প্রতিটি বাড়িতে পিড়াঘার নামে এক পবিত্র পূজাস্থল থাকে। সেখানে চইতবিশমা পূজা শেষে হাঁড়িয়া পান ও নৃত্যগীতের আয়োজন হয়।
চইতপরব
প্রকৃতিতে তিতা জাতীয় শাকের উপস্থিতি জানান দেয় চৈত্র মাস শেষ হয়ে যাচ্ছে, বৈশাখ সমাগত। এটি বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের সন্ধিস্থলের এক অনন্য চিহ্ন। গিমা তিতা, নাইল্যা, গিমা, দণ্ডকলস, আমরুল, থানকুনি, নিম, নিশিন্দা, তেলাকুচা, মালঞ্চ, কানশিরা- এমন ১৩ থেকে ২৯ রকমের তিতা স্বাদের শাক খাওয়ার চল আছে দেশের নানা জনপদে। আদিবাসী বেদিয়া-মাহাতোরা চৈত্রসংক্রান্তির দিন বথুয়া, কাঁটাখুঁড়ে, গিমাসহ নানান জাতের তিতা শাক খায়। হাওরাঞ্চলে চৈত্রসংক্রান্তির দিন আয়োজিত এ কৃত্যের নাম 'বেগুনপাতার বর্ত'। এ দিনটিকে অনেকে 'হার বিষুও' বলেন, কেউ বলেন 'চইতপরব'। চইতপরবে বর্তের আগ পর্যন্ত বাড়ির নারীরা উপবাস থাকেন। ভোরে উঠে বাড়িঘর সাফসুতরো করতে হয়। বেগুনপাতার বর্তের জন্য বাড়ির বিছরাক্ষেতের (আঙিনা বাগান) বেগুনগাছ থেকে ৫ থেকে ১৩টি পাতা সংগ্রহ করা হয়। ১৩টি পাতায় ১৩ জাতের তরিতরকারি রান্না করে ভাতসহ দেওয়া হয়। বর্ত শেষে বেগুনপাতাগুলো নদীর জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। চাকমারা এ সময় আয়োজন করে বিজু। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিরা এ সময় বিষু আয়োজন করেন। মারমা ও রাখাইনরা সাংগ্রাই আয়োজনে পবিত্র জল দিয়ে আগত সবাইকে ভিজিয়ে শুদ্ধ করেন। অনাগত রোগ ও মহামারি থেকে আসন্ন বছরকে সুরক্ষিত করতেই চৈত্রসংক্রান্তির এ সব আয়োজন।
জরা-ব্যাধি বিনাশী সংক্রান্তির লোকায়ত শক্তি
প্রতিটি ঋতুর সন্ধিক্ষণ হলো সংক্রান্তি। এই সময়টা জরা-ব্যাধি জয় করে নতুন বছরের সঞ্জীবনী সঞ্চয়ের সময়। গ্রামীণ নিম্নবর্গ অসুখ ও মহামারিকে সামাল দিতে সংক্রান্তির সময়গুলোতে নানা প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল। খাদ্য থেকে শুরু করে চারপাশের পরিচ্ছন্নতা, সাময়িক বিচ্ছিন্নতা থেকে নানামুখী সংগনিরোধ- এসব মিলিয়েই সংক্রান্তি আয়োজন। সংক্রান্তি কেবলমাত্র গাজনের গীত বা তিতা শাকের পরব নয়। প্রকৃতিকে জানা-বোঝার জন্য এক সামাজিক আহ্বান। এর ভেতর দিয়ে সমাজ জানাতে চায় প্রকৃতিতে বেঁচে থাকার জন্য মানুষ হিসেবে আমাদের কিছু করণীয় ও বিধি আছে। বাঙালি জনপদে চৈত্র মাসে শিমুইর (শিম), ফাল্কগ্দুনে মুলা, শ্রাবণে কচু, আষাঢ়ে ওল, জ্যৈষ্ঠ গিমাতিতা শাক খায় না অনেকেই। গ্রামের প্রবীণরা এখনও মনে করেন জ্যৈষ্ঠ মাসে কোনো শস্য ফসল লাগাতে হয় না, এতে জ্যেষ্ঠ সন্তানের অমঙ্গল হয়। শনি ও মঙ্গলবারে সাধারণত কোনো শস্য লাগানোর নিয়ম নেই। সন্ধ্যা, রাত ও ভোররাতে কোনো কিছু লাগানোর নিয়ম নেই। আমাদের তথাকথিত আধুনিক ও 'সভ্য' শহুরে সমাজে প্রতিদিন প্রকৃতির ব্যাকরণকে অমান্য ও তছনছ করা হয়। নাগরিক জীবনে প্রকৃতিঘনিষ্ঠ কোনো বিধিনিষেধ নেই। এখন সারাবছর বাজারমুখী শস্যফসল মেলে। দেখে বোঝার উপায় নেই এটা কোন ঋতু। এমন করপোরেট ভোগবাদী উন্নয়নে কার লাভ আর কার ক্ষতি করছি? প্রকৃতির ধারাপাত চুরমার করে দিচ্ছি বলেই ইবোলা, ডেঙ্গু কি আজ করোনায় দুনিয়া বিপর্যস্ত। গ্রামীণ নিম্নবর্গের সংক্রান্তি পালনের ভেতর প্রকৃতির বিজ্ঞানকে মান্য করবার এক অবিস্মরণীয় শক্তি ও দর্শন আছে। অসুখ ও মহামারি সামাল দিতে গ্রামীণ নিম্নবর্গ সংক্রান্তি ও নানা পূজাকৃত্যের মাধ্যমে ব্যক্তি নয়, সামষ্টিক সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে 'সাময়িক বিচ্ছিন্নতা' ও 'সংগনিরোধের' কঠোর নিয়ম পালন করেছেন। পরবর্তীতে রোগের চিকিৎসার দিকে নজর দিয়েছেন। করোনা সংকটেও আমরা 'কোয়ারেন্টাইন' আর 'লকডাউনের' পদ্ধতিই গ্রহণ করেছি, তাকিয়ে আছি প্রতিষেধকের দিকে। সংক্রান্তির শক্তি জানায় যে, কোনো সংকট ও মহামারি কাল কেটে আবার এক স্বপ্নময় জীবন শুরু হবে। তবে তার জন্য দরকার শরীর ও মনের প্রস্তুতি। করোনা সংকট মোকাবিলায় আমরা সংক্রান্তির ঐতিহাসিক শক্তির প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারি। ব্যক্তি নয়, সামষ্টিক অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েই সংকট ও মহামারি মোকাবিলা করতে হবে। নিয়ম ও বিধি মেনে চলতে হবে। প্রকৃতির প্রতি বিশ্বাস রাখলে প্রকৃতিই নাশ করবে সংকটকাল।
লেখক

গবেষক
প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন

×