সাক্ষাৎকার
মুক্তিযুদ্ধের অর্জন পুনর্নির্মাণ করতে হবে
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অমরেশ রায়
প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:০১ | আপডেট: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
মুক্তিযুদ্ধকে জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন বলে গর্ববোধ করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সেই বিজয় আজ প্রায় সবটাই হাতছাড়া হয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের শত্রুরা ইতিহাসের অর্জন মুছে দেওয়ার জন্য অভিযান শুরু করেছে। এই পরিস্থিতি অবসানের জন্য তিনি শ্রমিক শ্রেণি তথা মেহনতি মানুষের নেতৃত্ব কায়েম করার ওপর জোর দিয়েছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অমরেশ রায়
সমকাল: বিজয়ের ৫৪ বছর পৌঁছে আপনার ব্যক্তিগত অনুভূতি জানতে চাই।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: মুক্তিযুদ্ধ আমার এবং দেশবাসীর গৌরবের সম্পদ। ইতিহাসের বিচারে এটা হলো দেশের জনগণের এ যাবৎকালের সর্বশ্রেষ্ঠ পদক। আমি গর্বিত যে সেই ইতিহাস রচনায় অংশীদার ছিলাম। একই সঙ্গে এটাই আমার দুঃখ, সেই বিজয় আজ প্রায় সম্পূর্ণ হাতছাড়া হয়ে গেছে। ইতিহাসের সেই অর্জন মুছে দেওয়ার জন্য শত্রুরা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্যপূর্ণ অভিযান শুরু করেছে। আমরা বীরের জাতি, লড়াই করে অনেক বড় বড় বিজয় অর্জন করেছি। কিন্তু আমরা একই সঙ্গে দুর্ভাগা জাতি। কারণ বিজয় অর্জন করে সে বিজয় আমরা ধরে রাখতে পারি না। এই উপলব্ধি আমাকে এ সিদ্ধান্তে নিয়ে এসেছে যে যতদিন পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনায় শ্রমিক শ্রেণি তথা মেহনতি মানুষের নেতৃত্ব কায়েম না হবে ততদিন এই দুঃখজনক পরিস্থিতির অবসান হবে না। সে ক্ষেত্রে অবশ্য আমি আশাবাদী– আস্তে আস্তে হলেও মেহনতি মানুষ এবং তার সঙ্গে বিপ্লবী সংগ্রামী ছাত্রসমাজ ও মধ্যবিত্ত জনগণ সচেতন হয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে সে রকম একটা আমূল পরিবর্তন আনার জন্য উপস্থিত হচ্ছে। তারা একটা সার্বিক পরিবর্তন তথা সমাজ বিপ্লবে কামিয়াব হওয়ার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।
সমকাল: মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয়ের প্রেক্ষাপট তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কোনগুলো এবং কেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: মুক্তিযুদ্ধ ছিল শোষিত বঞ্চিত বাঙালি জাতির কয়েক যুগ ধরে পরিচালিত গণসংগ্রামের একটা শীর্ষ অধ্যায়, সশস্ত্র অধ্যায়। এর সূচনা আসলে হয়েছিল ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম এবং ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে জাতির ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। এই সংগ্রামের ধাপে ধাপে কমিউনিস্ট বামপন্থি প্রগতিশীল এবং জাতীয়তাবাদীসহ রাজনীতির সব ধারা একত্র হয়, অভূতপূর্ব ঐক্য প্রতিষ্ঠা হয়। যেটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সফল পরিণতি আনতে সক্ষম হয়।
সমকাল: ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র স্থায়ী হয় না; সাংস্কৃতিক ভিন্নতার জন্য পাকিস্তানের বিভক্তি চূড়ান্ত ছিল– মুক্তিযুদ্ধ কি এ ধারণাকে সত্য প্রমাণ করল?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: অবশ্যই। আমি মনে করি, পাকিস্তান রাষ্ট্রকে দ্বিখণ্ডিত করে একটা কোটেশনে ‘বাংলাস্থান’ পাওয়ার জন্য আমরা মুক্তিযুদ্ধ করিনি। পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক নীতি-আদর্শ এবং ব্যবস্থার বিপরীতে একটা গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ সমাজতন্ত্র অভিমুখী প্রগতিশীল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি।
সমকাল: মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভবিষ্যতে কীভাবে মূল্যায়িত হবেন বলে আপনি মনে করেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: আমি মনে করি, বঙ্গবন্ধুর অবদানকে ইতিহাসের আলোকেই বিবেচনা করা উচিত। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর একটা বিশেষ ভূমিকা ছিল। কিন্তু যদি বলা হয়, এককভাবে তিনিই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের নেতা এবং এককভাবে আওয়ামী লীগ আমাদের মুক্তিসংগ্রাম চালিয়েছে, সেটা একটা মিথ্যাচার হবে। আসলে আমাদের মুক্তিসংগ্রামের আসল নায়ক ও কারিগর হচ্ছে এ দেশের জনগণ। তবে এটাও স্পষ্ট, জনগণের ভূমিকার পাশাপাশি নেতার ভূমিকাকেও কেউ অস্বীকার করতে পারে না। সে ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন ভূমিকা রেখেছেন, তেমনি মওলানা ভাসানী, শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং কমরেড মণি সিংহরাও অনন্যসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন। সবার অবদান আমাদের স্বীকার করা উচিত। আসলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো আজকের দিনে খুবই জরুরি। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের অর্জনগুলোকে পুনর্নির্মাণ করতে হবে।
আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধকে নিজেদের করায়ত্ত করতে যে কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা করে গেছে, সেখান থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত বয়ান তথা প্রকৃত বস্তুনিষ্ঠ উপস্থাপনা জনগণের কাছে নিয়ে যেতে হবে।
সমকাল: চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক, স্থাপত্য ও ভাস্কর্য ভাঙা এবং নেতাদের নিয়ে কটূক্তি ইত্যাদি অহরহ দেখা যাচ্ছে। এই প্রবণতা কি সমাজে উগ্রবাদ বা সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দেওয়ার শামিল নয়?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও লক্ষ্যই ছিল দেশকে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা এবং অর্জনের পথে ফিরিয়ে নেওয়া। সেই বিবেচনায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে এবং পাশাপাশি স্থাপত্য ও ভাস্কর্য ভাঙা চলছে, সেগুলো খুবই ন্যক্কারজনক। এটা আসলে গণঅভ্যুত্থানের শক্তির মধ্যে অনুপ্রবেশকারী ও অনুচরদের কার্যকলাপ, যা দেশের আপামর মানুষ অনুমোদন করে না। তবে এটাও ঠিক, বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ, কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। সুতরাং এটা বলা যায়, এ দেশের মানুষই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মুষ্টিমেয় কিছু অনুপ্রবেশকারীর এই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেবে।
সমকাল: এ ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এই অপতৎপরতা প্রতিরোধে সরকারের যে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল, সেটা তারা করতে পারেনি বা ব্যর্থ হয়েছে। সরকার ক্রমাগতভাবে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর চাপের কাছে আত্মসমর্পণ করে চলেছে। সরকারের ভেতরেও একাধিক প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি সক্রিয়, যারা কিনা এসব অপতৎপরতায় ইন্ধন দিয়ে চলেছে। এখন এই সরকারের উচিত হবে তার ওপর জনগণের যে ম্যান্ডেট ছিল সেটার বাস্তবায়ন করা। অর্থাৎ একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা দিয়ে বিদায় নেওয়া। না হলে মুক্তিযুদ্ধকে কলঙ্কিত ও বিতর্কিত করে দেশের মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন বিজয়কে ধূলিসাৎ করার অপচেষ্টা চলতেই থাকবে।
সমকাল: ক্রমাগত মিথ্যা ও বিকৃতির সামনে মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত অধ্যায় ও ইতিহাসের অবিকৃত পাঠ নতুন প্রজন্মের সামনে উপস্থাপনার জন্য আপনার দলের কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: অবশ্যই। আমরা এই প্রচেষ্টা আগে থেকে চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা এটাকে আরও এগিয়ে নেব। ১৩ ডিসেম্বর আমরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনীর মিলনমেলা করলাম। প্রদর্শনী এবং নানা রকম কর্মসূচির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সচিত্র ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রচেষ্টাও আমরা নেব। নতুন প্রজন্ম আজ হাতড়ে বেড়াচ্ছে, কোন পথে দেশের সমস্যার সমাধান হবে? আমরা তাদের প্রতি এই আহ্বানই জানাই, তারা যেন মুক্তিযুদ্ধের ধারাকে কেবল রক্ষাই নয়, সেটার ওপর ভিত্তি করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার সংগ্রামে নেমে পড়ে। আমরাও নতুন ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করার প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে সচেষ্ট থাকব। আর সেটা হবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অর্জনের ওপর দাঁড়িয়ে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর ভিত্তি করে।
সমকাল: লাখ লাখ মানুষের আত্মত্যাগ ও বীরত্বে পাওয়া স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধারা তাদের প্রাপ্য সম্মান সবচেয়ে বেশি কীভাবে পেতে পারেন বলে আপনি মনে করেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: এটা হতে পারে তখনই, যখন আমরা মুক্তিযুদ্ধকে পরাজিত শত্রুর হাত থেকে মুক্ত করতে পারব। মুক্তিযুদ্ধকে তার কলঙ্কিত ও মিথ্যা ন্যারেটিভ থেকে মুক্ত করতে পারব। সর্বোপরি আমরা যদি মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী দেশ গড়ে তুলতে পারি, সেটাই হবে সবচেয়ে বড় সার্থকতা। এর মধ্য দিয়েই মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধারা তাদের প্রাপ্য সম্মান পেয়ে যাবেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমিও সেটাতে দায়বদ্ধ। তাই মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দিতে আমি এবং আমরা নিরন্তর কাজ করি যাচ্ছি।
সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: সমকালকেও ধন্যবাদ।
- বিষয় :
- মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
- বিজয় দিবস
