ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বড় বিড়ম্বনা নিম্নমানের ব্যাটারি

বড় বিড়ম্বনা নিম্নমানের ব্যাটারি
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২১ | আপডেট: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ১১:২২

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভোলার চরফ্যাসনের ব্যবসায়ী মাহমুদুর রহমানের ঘর একসময় রাতে আলোয় ঝলমল করত। ছোট্ট ২০ ওয়াটের সোলার হোম সিস্টেমেই চালাতেন ফ্যান, বাতি আর টিভি। বিদ্যুৎ না থাকলেও ঘর অন্ধকারে ডুবে যেত না, গরমেও ঘাম ঝরত না। এখন সে দিন অতীত। কয়েক বছরের ব্যবধানে সিস্টেমের ব্যাটারি চার্জ ধরে রাখতে পারছে না, নতুন ব্যাটারি লাগানোরও উপায় নেই। যাদের কাছ থেকে তিনি সোলার সিস্টেমটি কিনেছিলেন, সেই সংস্থা এখন আর এলাকায় নেই।

মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘প্রথম দিকে খুব ভালো চলত। চার বছরের মাথায় ব্যাটারি আর চার্জ নিত না। নতুন ব্যাটারি কিনতে গিয়েও বিপদে পড়ি। সংস্থার অফিসই উধাও। সিস্টেমটা অকেজো পড়ে থাকে। গত বছর বিদ্যুৎ বিভ্রাট শুরু হলে বাধ্য হয়ে নতুন ব্যাটারি কিনি।’

চরফ্যাসন বা ধনিয়ার মতো এলাকায় ব্যাটারি বিভ্রাটের ঘটনা এখন খুব পরিচিত। ধনিয়া ইউনিয়নের আবদুর রহমানও ২০১০ সালে গ্রামীণ শক্তির কাছ থেকে সোলার সিস্টেম কেনেন। দুইবার ব্যাটারি বদলাতে হয়েছে তাঁকে। তিনি বলেন, ‘প্রথম ব্যাটারি তিন বছরও টেকেনি। ওয়ারেন্টি ছিল বলে বদল করে নিয়েছি। কিন্তু পরেরটা নিজের টাকায় নিতে হয়। এখন সেটিও নষ্ট হয়ে গেছে।’

শুধু ভোলাতেই নয়, দেশের প্রায় সব উপকূলীয় ও দুর্গম অঞ্চলে একই অবস্থা। সরকারি মালিকানাধীন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) জানিয়েছে, তাদের মাধ্যমে এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ‘টেস্ট রিলিফ (টিআর)’ প্রকল্পের আওতায় বিতরণ করা ৫৩ লাখ ৫৭ হাজার সোলার হোম সিস্টেমের অধিকাংশই এখন ব্যাটারি সমস্যায় ভুগছে।

সমকাল ও গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) পরিচালিত সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, ৪০টি স্থানের কমিউনিটিতে দেখা গেছে, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা ব্যাটারি। স্থানীয় মেরামতকারীরা বারবার উল্লেখ করেন, ব্যাটারি নিয়েই সবচেয়ে বেশি সমস্যা; প্রায়ই প্রতিস্থাপন বা মেরামতের প্রয়োজন হয়। ব্যবহারকারী ও সেবা প্রদানকারীর অভিযোগ মিলিয়ে ব্যাটারি সমস্যাই গ্রামীণ সৌরশক্তি গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হিসেবে উঠে এসেছে।

ব্যাটারি সম্পর্কিত সমস্যা সৌর স্থাপনার ত্রুটির সবচেয়ে সাধারণ কারণ, যা প্রায় ৭৭ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন। ৫ শতাংশ উত্তরদাতা নিম্নমানের পণ্যকে দায়ী করেছেন। তারা বলেছেন, ব্যাটারির মান, টেকসই ও রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তা উন্নত করলে সিস্টেমের ব্যর্থতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব এবং সৌর ইনস্টলেশনের স্থায়ী ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।

২০০৩ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ইডকলের সহায়তায় গ্রামীণ শক্তি, উপকূলীয় বিদ্যুতায়ন ও মহিলা উন্নয়ন সমিতিসহ ৫৬টি বেসরকারি সংস্থা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সোলার হোম সিস্টেম বিতরণ করেছিল। প্রত্যন্ত গ্রাম, চরাঞ্চল আর পাহাড়ি এলাকায় যেখানে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি, সেখানে সূর্যের আলোয় চালিত এই সোলার হোম সিস্টেমই ছিল ভরসা।

ইডকলের ‘টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশনস ফর সোলার হোম সিস্টেম’-এ ব্যাটারির ন্যূনতম আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করা আছে পাঁচ বছর। ওয়ারেন্টি থাকা অবস্থায় ব্যাটারি নষ্ট হলে অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব বদলে দেওয়া। বাস্তবে তা হয়নি। অধিকাংশ গ্রাহক অভিযোগ করেছেন, সংস্থাগুলো ব্যাটারি পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা গুটিয়ে পালিয়েছে।

নোয়াখালীর সুবর্ণচরের চরবাটা ইউনিয়নের বাসিন্দা মুসা মিয়া বলেন, ‘গ্রিডের লাইন গেলে আমরা পুরোপুরি অন্ধকারে থাকি। বাচ্চারা কষ্ট পাই। আমাদের সোলারের ব্যাটারি এখন এক ঘণ্টাও চলে না। স্থানীয় দালালেরা যেসব ব্যাটারি দিয়েছিল, সেগুলো নাকি বাজারে অবৈধভাবে আনা। কেউ কোনো দায় নিচ্ছে না।’

স্থানীয় প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানালেন, কিছু প্রতিষ্ঠান সরকারি অনুমোদন ছাড়া নিম্নমানের ব্যাটারি সরবরাহ করেছে। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকাগুলোতে যেখানে লবণাক্ততা বেশি, সেখানে ব্যাটারি আরও দ্রুত বিকল হয়েছে। অনেকেই নতুন ব্যাটারি কিনতে পারছেন না খরচের কারণে। একটি ভালো মানের ১২ ভোল্ট ব্যাটারির দাম এখন ৭ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর পক্ষে এই ব্যয় বহন করা অসম্ভব।

চরফ্যাসনের আবু তালেব বলেন, ‘আমরা প্রথমে ১৫ হাজার টাকা দিয়ে সোলার সিস্টেম বসিয়েছিলাম। ভাবছিলাম, একবার বিনিয়োগ করলে বহু বছর চালানো যাবে। এখন প্রতি দুই-তিন বছর পর পর ব্যাটারি বদলাতে হচ্ছে। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে যা কষ্টকর।’

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম মনে করেন, সোলার হোম সিস্টেম প্রকল্প শুরুতে একটি চমৎকার উদ্যোগ ছিল। কিন্তু মান নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, বাজারে নিম্নমানের সরঞ্জাম ঢোকা এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রকল্পটি ধীরে ধীরে ভেঙে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘দেশে এখন জ্বালানি সংকট চলছে। গ্যাস, কয়লা, তেল–সব ক্ষেত্রেই ঘাটতি। এই সময়ে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে সৌরশক্তি সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হতে পারত। অথচ আমরা এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে পারিনি।’

ইডকলের নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা মান নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর হয়েছি। পুরোনো ব্যাটারির বেশির ভাগই এখন প্রতিস্থাপনের বাইরে। নতুন করে আপগ্রেডেড সিস্টেম আনার পরিকল্পনা চলছে; যেখানে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।’ তিনি জানান, সরকার এখন ‘সোলার মিনি গ্রিড’ ও ‘রুফটপ সোলার’ প্রকল্পের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। তবে পুরোনো সোলার হোম সিস্টেমগুলো পুনরায় সচল করার জন্যও বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব রয়েছে।

ব্যাটারি পোড়ানোয় বিষাক্ত বাতাস
দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে পুরোনো ব্যাটারি পোড়ানোর ভয়াবহ দুষ্টচক্র। হোম সোলারসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত ব্যাটারির অচল অংশ এখন পুনঃব্যবহারের নামে গলানো হচ্ছে স্থানীয়ভাবে স্থাপিত অদক্ষ ও অনুমতিহীন সিসা কারখানায়। এসব কারখানা চলছে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই, আর এর ধোঁয়া, এসিড ও ছাই মানুষের অজান্তে ধ্বংস করছে পরিবেশ, কৃষি ও জনস্বাস্থ্যকে।

ব্যাটারিতে ব্যবহৃত সিসা প্রকৃতিতে থেকে যায় শত শত বছর। কারখানার শ্রমিকরা এসব ব্যাটারি ভেঙে সিসা আলাদা করেন, পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলেন। সেই দূষিত পানি মিশে যাচ্ছে নদী-নালা, খালবিল, কৃষিজমিতে। এতে শুধু মাটি ও পানি নয়, খাদ্যশৃঙ্খলেও প্রবেশ করছে সিসার বিষ। মাছ ও সবজির শরীরে জমে থাকা সিসা পরে মানুষের শরীরে ঢুকছে খাদ্যের মাধ্যমে।

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার পাটুরিয়া ঘাট এলাকার পদ্মা নদীর পাড়ে ব্যাটারি পোড়ানোর একটি কারখানা চলছে প্রকাশ্যেই। দিনভর ট্রাকে করে পুরোনো ব্যাটারি আসে, রাতে সেই ব্যাটারি চুল্লিতে পোড়ানো হয়। ভয়াবহ কালো ধোঁয়া ও এসিডের গন্ধে পুরো এলাকা নাকাল।

পাটুরিয়া লঞ্চঘাট ও ফেরিঘাটের কাছেই কারখানাটি। প্রতিদিন হাজারো মানুষ যাতায়াত করেন এই পথে। দাসকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও ধোঁয়া ও এসিডের ঝাঁজে পড়ছেন। সরেজমিনে দেখা যায়, শ্রমিকরা দিনের বেলায় ব্যাটারি খুলে প্লেট আলাদা করেন, রাতে প্লেট গলিয়ে সিসা তৈরি করেন। কারখানার সংশ্লিষ্টরা বলেন, ‘ঢাকা ও সাভার থেকে পুরোনো ব্যাটারি কিনে এনে এখানে সিসা তৈরি করি। এক টন ব্যাটারি থেকে প্রায় ৬০০ কেজি সিসা পাওয়া যায়।’

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার রাতইল ইউনিয়নের রাতইল গ্রামে পাবনার ইয়াকুব আলীর একটি কারখানার তিনটি চুলায় রাতভর ব্যাটারি পোড়ায়। রাত ১০টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত আগুন জ্বলে। ভোরে ট্রাকে করে সিসা পাঠানো হয় বিভিন্ন ফ্যাক্টরিতে। এলাকাজুড়ে কালো ছাইয়ে ঢেকে গেছে গাছপালা, জমির ফসল। আখের পাতা, ঘাস, লতা কালচে হয়ে গেছে। কয়েকটি গরু এসব ঘাস খেয়ে মারা গেছে বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার দত্তপাড়া ইউনিয়নের বাবলাতলা বাজারে ইটভাটার পাশে চলছে মোতাহার হোসেন মেম্বারের জায়গায় গড়ে ওঠা সিসা কারখানা। এটির মালিক গাইবান্ধার জাহাঙ্গীর আলম। রাতে ৮টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত চুল্লিতে কাঠ-কয়লার আগুনে পুরোনো ব্যাটারি জ্বালিয়ে সিসা বের করা হয়। স্থানীয়রা জানান, ধোঁয়ার কারণে দুই-তিন কিলোমিটার দূর পর্যন্ত নাক-মুখ-চোখ জ্বালা করে। শিশু ও বৃদ্ধরা নিয়মিত শ্বাসকষ্টে ভুগছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. কামরুজ্জামান বলেন, ব্যাটারি পোড়ানোর ধোঁয়া ও এসিড মানবদেহ, প্রাণী ও উদ্ভিদের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর। বাতাসে মিশে থাকা সিসা শ্বাসের মাধ্যমে শরীরে ঢুকে রক্ত, লিভার, কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করে। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি বুদ্ধিবিকাশ ব্যাহত করে, অন্তঃসত্ত্বা নারীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

আরও পড়ুন

×