নৌযানেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার কমেছে
সুনামগঞ্জের তেঘরিয়া ঘাটে নোঙর করা হাউসবোট। সম্প্রতি তোলা সমকাল
পঙ্কজ দে, সুনামগঞ্জ
প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২৪ | আপডেট: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ১১:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রথম হাউসবোট ছিল অভিযাত্রী-১। আধুনিক সুযোগ-সুবিধার এই হাউসবোটে ব্যবহার হতো সোলার প্যানেল। দুই বছরেরও বেশি সময় সোলার প্যানেলেই চলেছে। সন্ধ্যা পর্যন্ত সোলার প্যানেল, পরে জেনারেটর দিয়ে আইপিএসের ব্যাটারি চার্জ করেই রাতে বোটে থেকেছেন পর্যটকরা। কিন্তু এখন এই হাউসবোটে সোলার প্যানেল নেই।
হাওরে পর্যটকবাহী বড় হাউসবোটের কোনোটাতেই এখন আর সোলার প্যানেল নেই। হাউসবোটগুলো বিদ্যুতের সংযোগে আইপিএস চার্জ দিয়ে কিছু সময় এবং বাকি সময় জেনারেটর চালিয়ে চলছে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সাহেববাড়ি ঘাট এলাকায় বেঁধে রাখা ২০টির বেশি হাউসবোটে ঘুরে দেখা গেছে, সোলার প্যানেলের সংযোগ খুলে প্যানেলসহ ব্যাটারি অযত্ন-অবহেলায় রাখা। অভিযাত্রিক-১-এর চালক আমিনুল ইসলাম জানালেন, শুরুতে সোলার সিস্টেমেই রাত ৭-৮টা পর্যন্ত চলত। পরে জেনারেটর ঘণ্টাখানেক চালিয়ে আইপিএস চার্জ দিয়ে সারারাত যেত। এখন আর সেভাবে চলছে না। এখন পর্যটকদের চাহিদাও বেড়েছে, আটটা ক্যাবিনে আটটা ফ্যান, চারটা বাথরুমে চার লাইট চলে। ঘুরতে আসা লোকজন মোবাইল ফোনও চার্জ করে। এগুলো সোলার দিয়ে চলে না, সেজন্য খুলে রাখা হয়েছে। এখন সবই চলে জেনারেটরে।
তিনি বলেন, জেনারেটরে শব্দ হয়, তাতে নৌকায় যেসব পর্যটক থাকেন, তারা বিরক্তিবোধ করেন। কিন্তু করার কিছুই নেই। শক্তিশালী সোলার যদি থাকত, ভালো হতো।
গোলাম কিবরিয়া নামের একজন খাদ্যপণ্যের দোকানি পৌর কর্তৃপক্ষের দেওয়া একটি সোলার প্যানেল দেখিয়ে বললেন, এটি ২০২২ সালের আগে লাগানো। তবে বেশিরভাগ প্যানেলই তদারকির অভাবে নষ্ট হয়েছে। একটি কীভাবে যেন রয়ে গেছে। এখনও ঝড়-বৃষ্টির দিনেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলেও, আলো দিচ্ছে।
তাহিরপুর নৌ-পর্যটন শিল্প সমবায় সমিতি সদস্যদের ট্রলারের সংখ্যা ৩৫০। সমিতির সভাপতি তাহিরপুরের রতনশ্রী গ্রামের মোহাম্মদ রব্বানী বলেন, দুই বছর আগেও সমিতির সব নৌকায় সোলার প্যানেল ছিল। ২০ থেকে ৮০ হাজার টাকা খরচ করে এসব সোলার প্যানেল নৌকায় লাগিয়ে ছিলেন সবাই। কিন্তু সোলার নষ্ট হলে, বা কোনো সমস্যা হলে তদারকির বা মেরামতের লোক পাওয়া যায় না। এ ছাড়া আলো দেওয়ার ক্ষমতা কমে যাওয়ায় একেক করে এখন সবাই সোলার খুলে নিয়েছেন। বেশির ভাগেই এখন জেনারেটর ব্যবহার করছেন।
টাঙ্গুয়ার হাওরে চলমান হাউসবোট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মাসুকুর রহমান বলেন, পর্যটকদের চাহিদা মেটানোর মতো হলে বিদ্যুৎ পেতে হলে সোলার প্যানেলে ১৮ থেকে ২০টি ব্যাটারি লাগবে। ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা পুঁজি বিনিয়োগ করতে হবে।
সংগঠনের বর্তমান সভাপতি আরাফাত রহমান জানান, বড় সোলার প্যানেল ব্যবহার করতে হলে পুরো ছাদ-ই লেগে যাবে। পর্যটকদের আকর্ষণই থাকে ছাদে। সে ক্ষেত্রে ছাদ ব্যবহারই করা যাবে না। এ জন্য ছোট প্যানেলের অধিক শক্তিশালী সৌর প্যানেল প্রয়োজন।
মেরামত ও তদারকিতে সংকট
হাউসবোট, সাধারণ ট্রলার থেকে শুরু করে সোলার ব্যবহারকারী হাওরে চলাচলকারী নৌযান শ্রমজীবীরা জানান, সোলার প্যানেল বিক্রয়কারীরা মেরামত বা তদারকে সহায়তা করেন না। এ কারণে সোলার ব্যবহারে আগ্রহ হারাচ্ছেন ট্রলার বা বোটের মালিক-চালকরা।
সমকাল ও গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) যৌথ উদ্যোগে সম্প্রতি দেশব্যাপী পরিচালিত এক জরিপেও সোলার প্যানেলের মেরামত নিয়ে সমস্যার কথা উঠে এসেছে। জরিপে দেখা গেছে, ভোলা, কুমিল্লা, ফেনী, গাজীপুর, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, সুনামগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ঠাকুরগাঁওসহ বেশ কয়েকটি জেলায় সব সৌর সিস্টেমই বিকল হয়ে পড়েছে, যেখানে সামগ্রিক বিকল হওয়ার হার ১০০ শতাংশ। ৪০টি স্থানের কমিউনিটিতে দেখা গেছে, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা হলো ব্যাটারি। স্থানীয় মেরামতকারীরা বারবার উল্লেখ করেন, ব্যাটারি নিয়েই সবচেয়ে বেশি সমস্যা; প্রায়ই প্রতিস্থাপন বা মেরামতের প্রয়োজন হয়। ব্যবহারকারীরা ব্যাটারি বিকলকে সৌরশক্তি ব্যবহার বাদ দেওয়া বা এড়িয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
