অফ-গ্রিড সিস্টেমে এখন দাতাদের আগ্রহ কম
ছবি-সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৬:১১
বাংলাদেশে বিদ্যুতায়নের ইতিহাসে সোলার হোম সিস্টেম (এসএইচএস) কর্মসূচি একটি অনন্য উদাহরণ। গ্রিড বিদ্যুতের বাইরে থাকা (অফ-গ্রিড সিস্টেম) লাখো পরিবারে আলো জ্বালাতে ২০০৩ সাল থেকে এসএইচএস কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আসছে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)। দাতাদের অর্থায়ন, এনজিওর সহযোগিতা এবং সরকারের নীতিগত সহায়তায় প্রায় দুই দশক ধরে চলছে এই উদ্যোগ।
বাংলাদেশে সোলার হোম সিস্টেম বিতরণকে একসময় সফলতার গল্প বলা হলেও দাতাগোষ্ঠীর সাম্প্রতিক মূল্যায়ন বলছে, বিনিয়োগের স্থায়িত্ব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়ে গেছে। সঠিক পরিকল্পনা, গ্রিড সম্প্রসারণের সঙ্গে সমন্বয় এবং প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া এত বড় বিনিয়োগের দীর্ঘমেয়াদি সুফল আদায় সম্ভব হয়নি।
এই কর্মসূচিতে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জার্মান উন্নয়ন সংস্থা (জিআইজেড), কেএফডব্লিউ, গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (জিইএফ), জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা), আইডিএ, নরওয়ের নরাড ও যুক্তরাজ্যের ডিএফআইডি (বর্তমানে এফসিডিও) অর্থায়ন করে। বিশ্বব্যাংক প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৭০ কোটি ডলারের বেশি অর্থায়ন করেছে। এডিবি কয়েকটি প্রকল্পে ২০ কোটি ডলারের মতো সহায়তা দেয়। জার্মানি (জিআইজেড ও কেএফডব্লিউ) প্রায় ১০ কোটি ইউরো অনুদান ও ঋণ দেয়। জাইকা প্রযুক্তিগত সহায়তা ও সীমিত অর্থায়ন করে। সব মিলিয়ে ২০০৩ থেকে ২০২০ সাল–এই সময়ে দাতাদের অনুদান ও ঋণ মিলে বাংলাদেশে সৌর হোম সিস্টেম খাতে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়।
গ্রামীণ বিদ্যুতায়নে অগ্রগতি
প্রায় ৬০ লাখ পরিবার সৌর বিদ্যুতের আওতায় এসেছে। রাতের অন্ধকার দূর হয়েছে, পড়াশোনা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে সুবিধা বেড়েছে। বাংলাদেশের এসএইচএস কর্মসূচিকে বিশ্বব্যাপী ‘সফল নবায়নযোগ্য শক্তি প্রকল্প’ হিসেবে প্রশংসা করেছে বিশ্বব্যাংক ও আইইএ। নারীশিক্ষার হার ও ছোট ব্যবসার কার্যক্রম বেড়েছে। শিশুরা কেরোসিনের বাতির ক্ষতিকর ধোঁয়া থেকে মুক্তি পেয়েছে। কেরোসিন আমদানি কমে বছরে কোটি কোটি ডলার সাশ্রয় হয়েছে। ইডকলের হিসাবে এর ফলে বছরে প্রায় ৩০ লাখ টন কার্বন নির্গমন কমেছে।
সীমাবদ্ধতা
২০১৫ সালের পর থেকে গ্রিড দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় সৌর হোম সিস্টেমের বাজার ভেঙে পড়ে। নতুন স্থাপনা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এনজিওগুলো গ্রাহকের কাছ থেকে কিস্তি আদায় করতে পারেনি। ফলে ইডকলের কাছেও তাদের ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। এতে দাতাদের অর্থ ফেরত নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক গ্রাহকের যন্ত্র নষ্ট হয়ে গেছে। সার্ভিস সেন্টার বন্ধ থাকায় তা আর ব্যবহারযোগ্য নয়। দাতাদের দেওয়া কিছু অর্থ ব্যবহার হয়নি, আবার কিছু অর্থ অনিশ্চিত অবস্থায় আটকে আছে।
জরিপে যা দেখা গেছে
সমকাল ও গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) জরিপে দেখা গেছে, ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে সব ধরনের স্থাপনাতে অফ-গ্রিড সৌর সিস্টেম ব্যবহারের দ্রুত বিস্তার ঘটে। বর্তমানে এর প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত পুরোনো অবকাঠামো এবং সীমিত প্রতিস্থাপন কার্যক্রমের কারণে সক্রিয় সিস্টেমের সংখ্যা কমেছে।
৩০টি জেলায় চালানো এ-সংক্রান্ত জরিপে দেখা গেছে, ৯৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ উত্তরদাতা গ্রিড সংযুক্ত বলে জানিয়েছেন, যেখানে মাত্র একটি ছোট অংশ (১.৪৬%) সম্পূর্ণভাবে অফ-গ্রিড থাকছে। জেলা অনুযায়ী বিশ্লেষণে দেখা যায়, অধিকাংশ জেলায় নির্বাচিত পরিবারের মধ্যে সম্পূর্ণ অন-গ্রিড সংযোগ রয়েছে। কেবল চাঁপাইনবাবগঞ্জ (৬.২৫%), চট্টগ্রাম (২.৭৮%), গাইবান্ধা (৮.৩৩%) এবং নোয়াখালীতে (১৬.৬৭%) কিছু পরিবার এখনও অফ-গ্রিড রয়েছে।
দাতাদের দৃষ্টিভঙ্গি
বিশ্বব্যাংকের এক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সোলার হোম সিস্টেম প্রকল্প এক সময় বিশ্বের সবচেয়ে বড় অফ-গ্রিড নবায়নযোগ্য শক্তি উদ্যোগ ছিল। তবে বাজার পরিবর্তন ও গ্রিড সম্প্রসারণে এর টেকসই ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
জার্মান উন্নয়ন সংস্থা জিআইজেডের এক কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে সৌরশক্তির সম্ভাবনা দেখিয়েছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই করতে সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি।
এ অবস্থায় দাতাগোষ্ঠীগুলো ভবিষ্যতে আর সরাসরি সোলার হোম সিস্টেমে বিনিয়োগ করতে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তারা বরং নবায়নযোগ্য শক্তির বৃহৎ প্রকল্প, যেমন রুফটপ সোলার, গ্রিড-সংযুক্ত সোলার প্লান্ট ও বায়ুশক্তির দিকে ঝুঁকছে। ইডকলও সম্প্রতি জানিয়ে দিয়েছে, পুরোনো এসএইচএস প্রকল্পকে আর বাড়ানো হবে না। তবে দাতাগোষ্ঠীর একাংশ এখনও চাইছে, যে সিস্টেমগুলো সচল আছে সেগুলোকে সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে নতুন অর্থ বরাদ্দ করা হোক, যাতে বিনিয়োগের অন্তত আংশিক সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয়।
- বিষয় :
- সোলার সিস্টেম
