ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

২৫ মার্চ স্মরণে লালযাত্রার দীর্ঘ প্রতিধ্বনি

২৫ মার্চ স্মরণে লালযাত্রার দীর্ঘ প্রতিধ্বনি
×

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে শহীদদের স্মরণে প্রতিবছরের মতো এবারও ‘লালযাত্রা’ কর্মসূচির আয়োজন করে সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রাচ্যনাট। গতকাল বুধবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকা থেকে যাত্রা শুরু হয় সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬ | ০৭:২১

| প্রিন্ট সংস্করণ

অন্ধকারেরও একটি ইতিহাস থাকে। যে ইতিহাস রক্তে লেখা, শোকে ভেজা, অথচ আলোর প্রত্যাশায় উজ্জ্বল। ২৫ মার্চ সেই ইতিহাসেরই নাম, যে রাতে নিশ্চুপ পৃথিবী সাক্ষী হয়েছিল বাঙালির ওপর নেমে আসা এক নির্মম গণহত্যার। সেই রাতের স্মৃতি বুকে ধারণ করে, শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে, প্রতিবাদ ও মানবতার পক্ষে এক অনন্য উচ্চারণ হয়ে উঠেছে প্রাচ্যনাটের ‘লালযাত্রা’।
গতকাল বুধবার বিকেলে স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বর থেকে স্মৃতি চিরন্তন পর্যন্ত বিস্তৃত এই যাত্রা ছিল শুধু একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশনা নয়; বরং ইতিহাস, প্রতীক ও প্রতিবাদের এক জীবন্ত মিছিল। যাত্রার অগ্রভাগে লাল শাড়িতে এক নারী– যিনি কিনা মাতৃভূমির প্রতীক। যার বিশাল আঁচলে আশ্রয় নেয় সব মানুষ। এই দৃশ্য যেন একদিকে শোকের, অন্যদিকে আশ্রয়ের; একদিকে হারানোর, অন্যদিকে ঐক্যের।
এবার ‘মা’ এর ভূমিকায় ছিলেন সিলভিয়া চৌধুরী (চিত্রা)। তাঁর আঁচল হয়ে ওঠে শহীদদের স্মৃতির প্রতীক, আর সেই আঁচলে আশ্রয় নেওয়া মানুষ যেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করে চলা রক্তঋণের উত্তরাধিকার। কালোর মাঝে বিস্তৃত লাল কাপড় যেন জানান দেয়– অন্ধকারের বুক চিরেই জন্ম নেয় আলোর সম্ভাবনা।

মিছিলজুড়ে উচ্চারিত হয় ‘ধনধান্য পুষ্পভরা’। কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে এই গান একসময় আর শুধু শিল্পীর থাকে না। রাজপথের সাধারণ মানুষও হয়ে ওঠে এই সম্মিলিত স্মরণের অংশীদার। ফুলার রোডে গিয়ে মায়ের আঁচল প্রতীকী বিছিয়ে মোমবাতি প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এই আয়োজন। একটি নীরব শপথ, একটি অঙ্গীকারের পুনরুচ্চারণ। লালযাত্রায় উপস্থিত ছিলেন আজাদ আবুল কালাম, শতাব্দী ওয়াদুদ, শাহানা রহমান সুমি, জগন্ময় পালসহ আরও অনেকে।

সংগীতশিল্পী রাহুল আনন্দের ভাবনায় ২০১১ সাল থেকে শুরু হওয়া লালযাত্রা আজ শুধু একটি বার্ষিক আয়োজন নয়; বরং একটি চলমান চেতনা। এই যাত্রা যেন ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের এক সংলাপ।
এই স্মরণের আবহ ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য সাংস্কৃতিক আয়োজনেও। রাত ৮টায় ছায়ানট ভবনে সব আলো নিভিয়ে মোমবাতির আলোয় শহীদদের স্মরণ করে ছায়ানট। তাদের কণ্ঠে ‘ও আলোর পথযাত্রী’, ‘আহ্বান, শোন আহ্বান’, ‘আগুনের পরশমণি’– এসব গান যেন হয়ে ওঠে শোকের ভাষা, আবার শক্তিরও উৎস।
একই সময়ে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর একাংশ আয়োজন করে ‘আলোর মিছিল’। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন ফটক থেকে শিখা চিরন্তন পর্যন্ত এই পদযাত্রা অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর প্রতীকী অবস্থানকে দৃশ্যমান করে। গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যও শিখা চিরন্তনে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে জানায় শ্রদ্ধা। 
এদিকে বেইলি রোডে ভিকারুন্নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে আয়োজিত ২৫ মার্চ উপলক্ষে স্মৃতিচারণ সভায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, স্বাধীনতা কোনো দয়ার দান নয়। এটি রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফসল। দেশপ্রেম, মেধা ও সততার সমন্বয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে তিনি নতুন প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানান।
এ ছাড়া গতকাল ২৫ মার্চ কালরাত্রি স্মরণে ছায়ানটের সংগীত, উদীচী ও গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের আলোর মিছিল এবং পুষ্পার্ঘ্যের নীরবতা– সব মিলিয়ে এই দিনটি হয়ে ওঠে এক গভীর প্রতিজ্ঞার প্রতীক। 

আরও পড়ুন

×