যুদ্ধ দমাতে পারেনি ইরাকি ফুটবলারদের
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ | ১৩:৩০
১ এপ্রিল মিষ্টি রোদের সোনালি সকালটা ইরাকিদের জীবনে আনন্দের বার্তা নিয়ে এসেছিল। মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধবিগ্রহের মধ্যেও সেই সকালে বাগদাদ, বশরা, মসুল, ইব্রিল উদ্দাম উদযাপনে মেতেছিল। দীর্ঘ ৪০ বছর পর বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জনের আনন্দে সব ভুলে গিয়েছিলেন তারা। বিশ্বকাপ বাছাইয়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে বাকি ছিল কেবল একটি জায়গা। বাকি ছয়টি জায়গার মধ্যে মঙ্গলবার রাতে পাঁচটি নির্ধারিত হয়ে যায়। তাই ফুটবল দুনিয়ার নজর ছিল এই আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফে। বুধবার ভোরের সেই লড়াইয়ে বলিভিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ দল হিসেবে বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয় ইরাক।
এর আগে ইরাক একবারই বিশ্বকাপ খেলেছিল, সেটি ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোতে। এবার সেই মেক্সিকোতেই বাছাইয়ের শেষ ধাপটা পেরিয়ে ৪০ বছর পর বিশ্বমঞ্চে ফিরেছে ‘লায়ন্স অব মেসোপটেমিয়া’ নামে খ্যাত দলটি। মেক্সিকোর মন্তেরেইতে বাংলাদেশ সময় বুধবার সকালে শেষ বাঁশি বাজতেই আবেগ বাঁধ ভাঙে। বিশ্বকাপে ফেরার আনন্দে একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন। জাতীয় পতাকা জড়িয়ে নেচে-গেয়ে উদযাপন করেন তারা।
ইরাকের জন্য ফুটবলে এই প্রত্যাবর্তন সত্যিই বিশেষ কিছু। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী তৎকালীন ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের বিপক্ষে যুদ্ধ ঘোষণা করে দেশটিতে আক্রমণ করে। ২০ মার্চ মার্কিন জোট আক্রমণ শুরু করে মে মাসে ইরাকের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তাদের আক্রমণে ইরাক রীতিমতো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ২০০৬ সালে সাদ্দাম হোসেনকে ফাঁসি দিয়ে দেশটিতে পুতুল সরকার বসায় মার্কিনিরা। তাতে অবশ্য ইরাকে শান্তি ফিরে আসেনি। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ভঙ্গুর অর্থনীতিসহ দেশের অভ্যন্তরীণ নানা সংকটে বিপর্যস্ত ছিল ইরাকের ফুটবলও।
সেই কঠিন সময় পেরিয়ে আবার মেগা টুর্নামেন্ট খেলতে পারাটা ইরাকের জন্য সত্যিকার অর্থেই বিরাট কিছু। সেসব বাধা পেরিয়ে আসার পর আচমকা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যায় তারা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পাশের দেশ ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আক্রমণ করে বসলে তাদের বিশ্বকাপযাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। যুদ্ধের কারণে তাদের অনুশীলনে ব্যাঘাত ঘটে; ভিসা জটিলতাসহ কঠিন সব বাধা পার হতে হয়েছে তাদের।
চলমান যুদ্ধের কারণে একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হলে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটি খেলতে ইরাক আদৌ ভেন্যুতে পৌঁছাতে পারবে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় তৈরি হয়েছিল। এ শঙ্কা থেকে ইরাকের ফুটবল কর্তারা ফিফার কাছে প্লে-অফ ফাইনাল পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু তা প্রত্যাখ্যাত হয়। মেক্সিকোগামী বিমানে ওঠাই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ইরান যুদ্ধের কারণে ইরাকও তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়।
ইরাক ফুটবল দলকে তখন সড়কপথে প্রায় ২০ ঘণ্টা ভ্রমণ করে জর্ডান যেতে হয়। কোচ গ্রাহাম আরনল্ডের চাপে শেষ পর্যন্ত ফিফা একটি চার্টার্ড ফ্লাইটের ব্যবস্থা করে। সেই বিমানে জর্ডান থেকে পর্তুগাল হয়ে মেক্সিকোর মন্তেরেইতে পৌঁছায় ইরাকি ফুটবল দল। দলটির অস্ট্রেলিয়ান কোচ গ্রাহাম আরনল্ড নিজেও ভোগান্তিতে পড়েছিলেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ শহরে আটকা পড়েছিলেন তিনি। দুবাই ও আবুধাবি বিমানবন্দরে ইরান আক্রমণ করলে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল তাঁর দলের সঙ্গে যোগ দেওয়ার বিষয়টি। শেষ পর্যন্ত দুবাই হয়ে মেক্সিকোতে গিয়ে দলের সঙ্গে যোগ দেন তিনি। কোচের বিলম্বের কারণে হিউস্টনে নির্ধারিত অনুশীলন ক্যাম্পও বাতিল করতে হয় তাদের।
ইরাকে মেক্সিকোর দূতাবাস না থাকায় দেশটির ভিসা পাওয়াও কঠিন ছিল ফুটবলারদের জন্য। সৌদি আরব ও কাতারে অবস্থিত মেক্সিকান দূতাবাসের মাধ্যমে ভ্রমণ ডকুমেন্ট সংগ্রহ করে যাত্রা শুরু করেন তারা। জয়ের পর এসব ভোগান্তি অবশ্য মনে করতে চাইলেন না কোচ আরনল্ড, ‘পরিস্থিতি খুবই কঠিন ছিল। তবে আমি এসব নিয়ে বেশি কথা বলতে চাই না।’
- বিষয় :
- বিশ্বকাপ ফুটবল
- ইরাক
