ঢাকা শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

কেপ ভার্দের রূপকথার নেপথ্য কারিগর ‘বুবিস্তা’

কেপ ভার্দের রূপকথার নেপথ্য কারিগর ‘বুবিস্তা’
×

কেপ ভার্দের কোচ পেদ্রো লেইতাও ব্রিতো

তরিকুল ইসলাম রাজন

প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৬ | ১৫:৪৩ | আপডেট: ২৭ জুন ২০২৬ | ১৫:৫৮

বোয়া ভিস্তা দ্বীপের পোভোয়াসাও ভেলহা গ্রাম। পুরো গ্রামে ছিল মাত্র একটি টেলিভিশন। বিশ্বকাপের রাতে সেই টিভির সামনে ভিড় করতেন গ্রামের মানুষ। সবার পেছনে দাঁড়িয়ে এক ছোট্ট ছেলে মুগ্ধ চোখে দেখত ডিয়েগো ম্যারাডোনা আর লোথার ম্যাথাউসের ফুটবল জাদু। ঘরে ফিরে মা তার জন্য মোজা দিয়ে বানিয়ে দিতেন একটি বল। সেই মোজার বল নিয়েই শুরু হয়েছিল তার ফুটবল-যাত্রা।

বহু বছর পর সেই ছেলেটিই টানা ১১ বছর কেপ ভার্দে জাতীয় দলের অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরেছেন। ফুটবল বিশ্ব এখন তাকে চেনে ‘বুবিস্তা’ নামে। যদিও তার আসল নাম পেদ্রো লেইতাও ব্রিতো। জন্ম বোয়া ভিস্তা দ্বীপে বলেই শৈশবের ডাকনাম ‘বুবিস্তা’ আজ তার পরিচয় হয়ে গেছে। আর শনিবার সকালে হিউস্টনের ডাগআউটে দাঁড়িয়ে ৫৬ বছর বয়সী সেই মানুষটিই লিখলেন দেশের ফুটবলের সবচেয়ে বড় ইতিহাস। তার হাত ধরেই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে উঠেছে আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে।

বিশ্বকাপে জায়গা পেতে নানা বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে হয়েছে কেপ ভার্দেকে। টানা সাতবার ব্যর্থ হওয়ার পর এবারই প্রথম বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে আফ্রিকান ব্লু শার্কসরা। আর প্রথমবার সুযোগ পেয়েই চমকে দিয়েছে তারা। স্পেন ও উরুগুয়ের মতো দুই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নের গ্রুপ থেকে অপরাজিত রানার্সআপ হয়ে শেষ বত্রিশে জায়গা করে নিয়েছে দলটি। বাইরে থেকে এটি রূপকথা মনে হলেও, এর পেছনে রয়েছে প্রায় দুই দশকের পরিকল্পনা, ধৈর্য আর কঠোর পরিশ্রম।

কেপ ভার্দের এই সাফল্যের অন্যতম বড় ভিত্তি সেন্টার-ব্যাক লোগান কস্তা। ভিয়ারিয়ালের এই ডিফেন্ডার গত বছরের জুলাইয়ে এসিএল ইনজুরিতে পড়ে প্রায় ১০ মাস মাঠের বাইরে ছিলেন। বিশ্বকাপের আগে গত ১৭ মে লা লিগায় মাত্র ১৩ মিনিট খেলেছিলেন। এমন একজন ফুটবলারকে দলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু বুবিস্তা বিশ্বাস হারাননি। সেটার ফলও মিলেছে হাতেনাতে। স্পেন, উরুগুয়ে কিংবা সৌদি আরব- কেউই সহজে ভাঙতে পারেনি কস্তাদের রক্ষণপ্রাচীর। পুরো গ্রুপ পর্বে কেপ ভার্দের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাদের সংগঠিত রক্ষণভাগ।

কেপ ভার্দের জনসংখ্যা মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ। কিন্তু দেশের মানুষের চেয়ে প্রবাসী কেপ ভার্দিয়ানের সংখ্যা আরও বেশি। সেই ছড়িয়ে থাকা মানুষদেরই এক সুতোয় গেঁথেছেন বুবিস্তা। এই যেমন মিডফিল্ডার জামিরো মন্তেইরোর জন্ম নেদারল্যান্ডসের রটারডামে। অভিবাসী পরিবারে বেড়ে ওঠা এই ছেলেটি পাড়ার রাস্তায় ফুটবল শেখা শিখেছেন। পরে নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকার ঘুরে জাতীয় দলে জায়গা করে নেন। বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে এসওয়াতিনির বিপক্ষে নিজের ৫০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেই নিশ্চিত করেছিলেন কেপ ভার্দের বিশ্বকাপের টিকিট।

কেভিন পিনার গল্পও কম অবাক করার মতো নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের ব্রকটনের রাস্তায় খেলতে খেলতেই সাবেক অধিনায়ক কার্লোস মোরাইসের চোখে পড়েছিলেন তিনি। সেখান থেকেই পেশাদার ফুটবলে যাত্রা। এখন রাশিয়ার ক্রাসনোদারে খেলেন। বিশ্বকাপে উরুগুয়ের বিপক্ষে তার ফ্রিকিক গোল এখনও টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা মুহূর্ত।

আবার উরুগুয়ের বিপক্ষে বদলি নেমে সমতাসূচক গোল করা হেলিও ভারেলা খেলেন ইসরায়েলের ক্লাবে। ম্যাচের আগে হয়তো খুব কম মানুষই তার নাম জানত, কিন্তু একটি গোলই তাকে কেপ ভার্দের ফুটবল ইতিহাসে জায়গা করে দিয়েছে।

ডিফেন্ডার পিকো লোপেসের গল্প আরও মজার। আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে জন্ম নেওয়া এই ফুটবলার প্রথমে ভেবেছিলেন, লিংকডইনে পর্তুগিজ ভাষায় আসা কেপ ভার্দে কোচের বার্তাটি বুঝি স্প্যাম! পরে বুঝতে পারেন, সেটিই ছিল জাতীয় দলের ডাক। সেই বার্তা উপেক্ষা করলে হয়তো ইতিহাসের অংশ হওয়াই হতো না।

আর গোলরক্ষক ভোজিনহা তো এখন পুরো দেশের নায়ক। স্পেনের বিপক্ষে একাই সাতটি সেভ করে ম্যাচসেরা হয়ে ওঠেন তিনি। শেষ বাঁশির পর চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। কারণ সেই মুহূর্তে তার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছিল প্রয়াত দাদা-দাদিকে- যাদের হাত ধরেই ফুটবলে তার প্রথম পথচলা।

৩৬ বছর বয়সী অধিনায়ক রায়ান মেন্ডেস এই দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ মুখ। গত ১৬ বছরে ৯৬টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে তিনি ছিলেন কেপ ভার্দের প্রতিটি উত্থান-পতনের সাক্ষী। আর ২৫ বছর বয়সী ডেইলন লিভ্রামেন্তো বাছাইপর্বে ক্যামেরুন ও এসওয়াতিনির বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ গোল করে বিশ্বকাপের পথটাই খুলে দিয়েছিলেন। বিশ্বকাপ শুরুর আগে সেই গোলগুলোর কথা খুব বেশি মানুষ মনে রাখেনি, কিন্তু ইতিহাসের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল সেখানেই।

কেপ ভার্দের জন্য বিশ্বকাপ শুধু স্বপ্ন নয়, ভবিষ্যতের বিনিয়োগও। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব খেলেই কেপ ভার্দে ফিফার কাছ থেকে পাচ্ছে এক কোটি পাঁচ লাখ মার্কিন ডলার। ফেডারেশনের পরিকল্পনা, এই অর্থের পুরোটা ব্যয় হবে দেশের ফুটবল অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা কেপ ভার্দিয়ান প্রতিভাদের খুঁজে বের করতে। ১৪ বছর বয়সী একাডেমি ফুটবলার ইউরি মার্লে ফার্নান্দেসদের প্রজন্মকে তাই আর কল্পনা করতে হয় না। তারা বড় হয়েছে এমন একটি জাতীয় দলকে দেখে, যারা আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছে, ক্যামেরুনের মতো দলকে পেছনে ফেলে বিশ্বকাপে উঠেছে। তাদের কাছে বিশ্বমঞ্চ আর অসম্ভব কোনো স্বপ্ন নয়।

সৌদি আরব ম্যাচের আগে বুবিস্তা বলেছিলেন, ‘সবারই স্বপ্ন দেখার অধিকার আছে। অসম্ভব বলে কিছু নেই।’ মোজার ফুটবল দিয়ে খেলা শুরু করা এই মানুষটি ভালো করেই জানেন, বিশ্ব ফুটবলের সমীহ আদায় করতে ঠিক কতটা রক্ত-ঘাম ঝরাতে হয়।

আগামী ৪ জুলাই নকআউট পর্বে তাদের সামনে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। প্রতিপক্ষে থাকবেন লিওনেল মেসি। পোভোয়াসাও ভেলহা গ্রামের সেই ছোট্ট ছেলেটি ধার করা টেলিভিশনে এর চেয়েও বড় বড় ম্যাজিক দেখে বড় হয়েছে। এবার বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজের গল্প লেখার পালা তার।

আরও পড়ুন

×