ঢাকা রোববার, ২৮ জুন ২০২৬

দেম্বেলের পায়ে মোজার্টের সুর

দেম্বেলের পায়ে মোজার্টের সুর
×

ছবি- এএফপি

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, ডালাস থেকে

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ | ১৩:৫৪

যে শহরটা নিউ অরলিন্সের জ্যাজ কিংবা হার্লেমের হিপ-হপের উদ্দাম ব্যাকবিট শুনে বড় হয়েছে, সেই বোস্টনের ফক্সবোরো স্টেডিয়াম শুক্রবার রাতে সাক্ষী থাকল এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘরানার ইউরোপীয় অপেরার। আমেরিকান পপ-কালচারের চেনা জ্যামিতিক রিদমকে এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে মাঠের সবুজগালিচায় তখন সুর তুললেন কিনা ফরাসি উইঙ্গার উসমান দেম্বেলে। ম্যাচের বয়স তখন মাত্র ৩২ মিনিট। নরওয়ের ডিফেন্ডাররা যখন বোস্টনের মাঠে স্রেফ খাবি খাচ্ছেন, উসমান তখন পায়ের জাদুতে পিয়ানোর রিফ বানিয়ে ম্যাচের ভাগ্য লিখে ফেলেছেন ৩-১ (ম্যাচ শেষে ৪-১)! এটি শুধুই একটি হ্যাটট্রিকের গোলবন্যা ছিল না; ছিল মোজার্টের কোনো অমর সিম্ফনি, যার প্রতিটি নোটে মিশে ছিল ফরাসি আভিজাত্য।

যে ছেলেটিকে এতদিন ‘ননীর পুতুল’ বলে সমাজমাধ্যমে পরম তাচ্ছিল্যে ‘দেম্বুলেন্স’ তকমা সেঁটে দেওয়া হয়েছিল, বার্সেলোনায় থাকার সময় বারবার ইনজুরিতে পড়ায় তাঁকে অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে তুলনা দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ আনা হয়েছিল রাতভর প্লেস্টেশন খেলার বদ অভ্যাসটাকে। সেই তিনিই যেন নিন্দুকের মুখে ছাই দিয়ে এক জ্যোতির্ময় ফিনিক্সের মতো ডানা ঝাপটালেন। কিলিয়ান এমবাপ্পের রাজকীয় ছায়াকে অনায়াসে মাড়িয়ে ওড়ালেন ফরাসি আক্রমণের নতুন পতাকা। কেউ কেউ বলতে পারেন, এটি ‘ফরাসি মশা’র তীব্রতা! কেননা পিএসজিতে তাঁর সতীর্থরা হালকা-পাতলা গড়ন আর তাঁর গতি দেখে ‘মসকুইটো’ বা মশা বলেই ডাকেন। সেই মশাকেই দৈত্য বানিয়েছেন পিএসজির কোচ লুইস এনরিকে। এদিন নরওয়ের দীর্ঘকায় ফুটবলাররাও টের পেলেন সেই মশার কামড়।

ম্যাচের সপ্তম মিনিটে ডান পায়ের মাপা শটে যে তাণ্ডবের শুরু, ২০ মিনিটে দূরপাল্লার রকেট শটে তা দ্বিগুণ হয়। আর ৩২তম মিনিটে ফরাসি দলের প্রত্যেক সদস্যের ছোঁয়ায় গড়া এক রূপকথার ১৭ পাসের বিল্ডআপ থেকে বাঁ পায়ের বাঁকানো ফিনিশিংয়ে দেম্বেলে যখন হ্যাটট্রিক পূর্ণ করলেন, তখন রেকর্ড বুক ওলটপালট হয়ে গেছে! ১৯৫৪ বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়ার এরিখ প্রোবস্টের ২৪ মিনিটের হ্যাটট্রিকের পর এটিই বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্বিতীয় দ্রুততম সময়ে (৩২ মিনিট) ম্যাচ শুরু থেকে করা হ্যাটট্রিক। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে রাশিয়ার ওলেগ সালেঙ্কোর পর দেম্বেলে প্রথম ফুটবলার, যিনি বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচের প্রথমার্ধেই হ্যাটট্রিক করার অবিশ্বাস্য কীর্তি গড়লেন।

ম্যাচের আগে বিশ্বজুড়ে প্রবল হাইপ তৈরি হয়েছিল–কিলিয়ান এমবাপ্পে বনাম আর্লিং হালান্ডের এক ব্লকবাস্টার দ্বৈরথ দেখার জন্য। এমবাপ্পে নিজেকে সুপারম্যানের খোলস থেকে বের করে একজন নিঃস্বার্থ ‘প্রোভাইডার’ বা সুরকারের ভূমিকায় নিয়ে যাওয়ায় লাইমলাইট কেড়ে নেন উসমান। এমবাপ্পে এদিন গোল করার চেয়ে বেশি মজেছিলেন দেম্বেলেকে দিয়ে গোল করাতে। উসমানের প্রথম দুটি গোল এসেছে এমবাপ্পের জাদুকরি অ্যাসিস্ট থেকে। কিলিয়ানের এই রাজকীয় আত্মত্যাগই প্রমাণ করে, ফরাসি ড্রেসিংরুমে এখন এমবাপ্পের ছায়া মাড়িয়ে দেম্বেলে কতটা জ্যোতির্ময় হয়ে উঠেছেন। 

ফুটবল বড় অদ্ভুত ট্র্যাজিক থিয়েটার। চার বছর আগের কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালের কথা মনে আছে? প্রথমার্ধের ৪১ মিনিটে খামখেয়ালিপনা আর পেনাল্টি উপহার দেওয়ার অপরাধে দিদিয়ের দেশম দেম্বেলেকে মাঠ থেকে তুলে নিয়েছিলেন। কিন্তু বোস্টনের মাঠের সেই চিরচেনা দেম্বেলে যেন এক অন্য মানুষ। তাঁর দ্বিতীয় গোলটি ছিল দেখার মতো। নরওয়ের গোলকিপার সেলভিক ডানদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ার চোখের পলক ফেলার আগেই প্রায় ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে বলটি টপ-কর্নার দিয়ে নেট ছিঁড়ে ভেতরে ঢুকে যায়। বলের সেই অতিপ্রাকৃতিক ট্র্যাজেক্টরি আর বাতাসের বুক চিরে যাওয়ার তীব্র শোঁ শোঁ শব্দ মনে করিয়ে দিচ্ছিল, দেম্বেলে কেবল আলতো ছোঁয়ায় মোজার্টের সুরই তোলেন না, প্রয়োজনে তাঁর বুট থেকে আধুনিক হাই-স্পিড মিসাইলের মতো ধ্বংসাত্মক অগ্নিগোলকও ছুটে যেতে পারে। মাঠে দেম্বেলের পজিশন ডানপ্রান্তে মনে হলেও তিনি প্রথাগত লাইনের ধার ঘেঁষে দৌড়াননি। নরওয়ের ডিফেন্ডাররা যখন উইংয়ে দেম্বেলেকে ব্লক করার জন্য পজিশন নিচ্ছিল, তিনি তখন বল পায়ে চিতার গতিতে কাট-ইন করে ভেতরে ঢুকে আসছিলেন। দেম্বেলে হাফ-স্পেস, অর্থাৎ উইং ও সেন্ট্রাল মিডফিল্ডের মাঝখানের করিডোরটি নিখুঁতভাবে ব্যবহার করছিলেন। নরওয়ের ডিফেন্ডাররা বুঝতেই পারেনি দেম্বেলে উইঙ্গার নাকি সেকেন্ড স্ট্রাইকার!

ম্যাচ শেষে শান্ত দেখাল ফরাসি জাদুকরকে। মিক্সড জোনে এসে হালকা হেসে দেম্বেলে বললেন, ‘রেকর্ড নিয়ে আমি ভাবি না। কাতার আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। আজ কিলিয়ান (এমবাপ্পে) যেভাবে আমাকে বল বাড়াচ্ছিল, আমাদের বোঝাপড়াটাই নরওয়ে রক্ষণকে শেষ করে দিয়েছে। এই হ্যাটট্রিক সেই মানুষদের জন্য, যারা কঠিন সময়েও আমার পায়ে বিশ্বাস রেখেছিল।’ মেসির পাঁচ গোলের পর চার গোল করে এখন গোল্ডেন বুটের রেসে আছেন এমবাপ্পে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, আর্লিং হালান্ড, সবশেষ তাদের সঙ্গে যোগ দিলেন আরেক ফরাসি শিল্পী উসমান দেম্বেলে। বোস্টনের রাত শেষ হয়েছে। ফরাসি দল এখন তাদের চার্টার্ড ফ্লাইট নিয়ে নিউ জার্সির উদ্দেশে। সেখানেই ৩০ জুন রাউন্ড অব থার্টিটুতে তারা মুখোমুখি হবে সুইডেনের। কিন্তু বোস্টনে ফুটবল রোমান্টিকদের মনে রয়ে গেল একুশ শতকের এক অনন্য ফরাসি বিপ্লব, যেখানে আইফেল টাওয়ারের চেয়েও দীর্ঘ ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে আছেন এক জ্যোতির্ময় উসমান দেম্বেলে, যাঁর পায়ের রাজকীয় সিম্ফনির মায়ায় পড়েছে ২০২৬ বিশ্বকাপ!

আরও পড়ুন

×