ঢাকা সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

মেসির ফ্রিকিক ছোঁয়ায় পূর্ণ হলো কবিতা

মেসির ফ্রিকিক ছোঁয়ায় পূর্ণ হলো কবিতা
×

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, ডালাস থেকে

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ | ০৮:২২

ডালাসের গ্যালারিতে তখন নীল-সাদার প্লাবন, উৎসবের চেনা আর্জেন্টাইন ট্যাঙ্গো। জর্ডানের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা এগিয়ে ২-০ ব্যবধানে। সাদা চোখে কোনো খামতি নেই। কিন্তু টেক্সাসের এই কানায় কানায় পূর্ণ স্টেডিয়ামের হাজার হাজার দর্শকের বুকের ঠিক মাঝখানটায় যেন একটা প্রচ্ছন্ন একাকিত্ব, একটা তীব্র সুরের অভাব লুকিয়ে ছিল। সবাই প্রিয় দলের জয় দেখতে এসেছিলেন ঠিকই, তবে তার চেয়েও বেশি এসেছিলেন এক অলৌকিক জাদুর স্পর্শ পেতে। সেই না বলা শূন্যতা পূর্ণ হলো ম্যাচের ঠিক ৬০ মিনিট পর। সাইডলাইনের ধারে যখন ৩৯ ছোঁয়া সেই চিরন্তন ১০ নম্বর জার্সিধারী মানুষটা ট্রাউজার খুলে সবুজ ঘাসের দিকে পা বাড়ালেন, অমনি ডালাসের আকাশ ভেঙে যেন এক মহাজাগতিক গর্জন আছড়ে পড়ল! লিওনেল মেসি মাঠে নামলেন।

ব্যস, ওইটুকুই। ৩-১ গোলে জর্ডানকে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে শেষ বত্রিশে আর্জেন্টিনা। ম্যাচের বাকি গল্পটা তো স্রেফ মেসির চেনা ক্যানভাসে তুলির শেষ টান দেওয়া। মাত্র কয়েক মিনিটের উপস্থিতি, আর তাতেই সেই চেনা আবেশ। বক্সের ঠিক বাইরে যখন ফ্রিকিকটা পেল আর্জেন্টিনা, জর্ডানের রক্ষণভাগের খেলোয়াড়রা তখন ব্যতিব্যস্ত এক দুর্ভেদ্য মানবদেয়াল খাড়া করতে। গ্যালারির হাজার হাজার ক্যামেরা জুম ইন করেছে মেসি নামের ওই একটি মাত্র বিন্দুর ওপর। সবাই ভাবছিল, বল বুঝি রক্ষণ প্রাচীরের ওপর দিয়ে চেনা বাঁক খেয়ে জালে জড়াবে। কিন্তু ফুটবল জাদুকর খেললেন অন্য চাল। কোনো আকাশচুম্বী শট নয়, নিজের অসাধারণ ফুটবল মস্তিষ্ক খাটালেন তিনি। জর্ডানের মানবদেয়ালটি লাফিয়ে ওঠার মোক্ষম মুহূর্তটিতে মেসি মাটিঘেঁষা এক নিপুণ চতুর শট নিলেন। বলটি রক্ষণ প্রাচীরের নিচে তৈরি হওয়া সামান্য ফাঁক গলে সাপোর্টিং দেয়ালের আড়াল দিয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলে গেল। জর্ডানের গোলকিপার ইয়াজিদ আবুলাইলা মেসির চাউনি আর বডি ল্যাঙ্গুয়েজে এতটাই বিভ্রান্ত হয়েছিলেন যে বলের লাইন বোঝার আগেই নিজেকে পুরোপুরি ‘রং-ফুটে’ আবিষ্কার করলেন। তিনি স্রেফ পাথরের এক নিশ্চল মূর্তি বনে গেলেন আর বল আলতো করে জড়িয়ে গেল জর্ডানের জালে! একেই বলে চরম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে প্রতিপক্ষকে বোকা বানানোর জাদুকরি কৌশল।

স্টেডিয়ামে তখন উন্মাদনার সুনামি। আর ফুটবল ইতিহাসের সব পাতা ওলটপালট করে কাতার বিশ্বকাপের পর থেকে টানা সাত ম্যাচে গোল করার এক অবিশ্বাস্য-অতিমানবীয় বিশ্বরেকর্ড গড়ে ফেললেন মেসি। ঠিক তখনই যেন মনে হলো, ডালাসের ওই একচিলতে শূন্যতা পেরিয়ে মেসির ফ্রিকিক ছোঁয়ায় পূর্ণ হলো এক অমর কবিতা! কাতার বিশ্বকাপের সেই অগ্নিগর্ভ নকআউট পর্ব থেকে শুরু করে আজ টেক্সাসের সবুজ গালিচা– বিশ্বকাপের মঞ্চে টানা সাতটি ম্যাচে গোল করার এক অবিস্মরণীয় বিশ্বরেকর্ড গড়ে ফেললেন লিওনেল মেসি। ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের জুস্ত ফন্তেইন কিংবা ১৯৭০-এ ব্রাজিলের জার্জিনহোর গড়া টানা ছয় ম্যাচের সেই ঐতিহাসিক কীর্তিকে পেছনে ফেলে ফুটবল দেবতা এখন দাঁড়িয়ে আছেন সম্পূর্ণ একা; এক অনন্য সিংহাসনে। এই ফ্রিকিকের জাদুতে একদিকে যেমন জর্ডানের গোলকিপার স্রেফ পাথরের মূর্তি বনে গেলেন, অন্যদিকে বিশ্বকাপে নিজের সর্বমোট গোল সংখ্যাকে রেকর্ড-সম্প্রসারিত ১৯-এ নিয়ে গেলেন ৩৯ বছর বয়সী এই ফুটবল জাদুকর। একই সঙ্গে টুর্নামেন্টে নিজের ষষ্ঠ গোলটি করে গোল্ডেন বুটের দৌড়েও বাকিদের চেয়ে স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে গেলেন তিনি। 

ম্যাচের দুটি খণ্ড করলে একটি স্কলোনির রিজার্ভ বেঞ্চ নিয়ে ৬০ মিনিটে, অন্যটি মেসিকে নিয়ে শেষের ৩০ মিনিট। যেখানে প্রথম খণ্ডের নায়ক অবশ্যই জিওভান্নি লো সেলসো। মাঝমাঠের সুতাটা যেভাবে নিজের পায়ে বেঁধে রেখেছিলেন তিনি, তা এককথায় অনবদ্য। ম্যাচের ১৯ মিনিটে বক্সের ঠিক ওপর থেকে তাঁর নেওয়া সেই বাঁ পায়ের ফ্রিকিকটা যেন ছিল নিখুঁত জ্যামিতির এক শিল্পকর্ম! জর্ডানের গোলকিপারকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করে বল যখন জালে জড়াল, তখন মনে হচ্ছিল লো সেলসো একাই হয়তো ম্যাচটার চিত্রনাট্য লিখে দেবেন। এরপর লাউতারো মার্তিনেজ পেনাল্টি থেকে ব্যবধান দ্বিগুণ করায় ম্যাচের ওপর আর্জেন্টিনার নিয়ন্ত্রণ চলে আসে পুরোপুরি। তবে এই ম্যাচের খতিয়ান স্রেফ লো সেলসো বা মেসির জাদুতে আটকে রাখলে ডালাসের রাতের আসল গল্পটাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। 

লিওনেল মেসিকে শুরুতে বেঞ্চে রেখে কোচের যখন এক সাহসী ফাটকা, তখন বিশ্বমঞ্চে নিজের প্রথম ‘ওয়ার্ল্ড কাপ স্টার্ট’-এ ১০ নম্বর পজিশনে যিনি বুক চিতিয়ে দাঁড়ালেন, তিনি বছর একুশের তরুণ নিকো পাজ! ম্যাচের প্রথম ঘণ্টায় যেভাবে তিনি বডি মুভমেন্টে জর্ডানের রক্ষণকে ব্যস্ত রাখলেন, উইং থেকে ভেতরে ঢুকে প্লেমেকিং করলেন, তাতে প্রবীণদের ছায়া স্পষ্ট। স্পেনের জন্মভূমিকে ছেড়ে বাবার রক্তের টানে আলবিসেলেস্তে জার্সি গায়ে জড়ানো এই কিশোর যেন ডালাসের মাঠে একটুকরো তাজা বাতাস বয়ে আনলেন। যেভাবে তিনি মাঝমাঠের গতি আর টেম্পো নিয়ন্ত্রণ করলেন, তাতে মেসি-পরবর্তী যুগের এক দীপ্তিময় ভবিষ্যতের আভাস খোদ ফুটবল দেবতাই হয়তো ওপর থেকে দেখে মুচকি হাসলেন। মেসির কবিতাখানি সারা হলে বোধ হয় শুরু হবে এই নিকো পাজেরটা।

আরও পড়ুন

×