ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

জার্মানির অশ্রুসিক্ত বিদায়, নেদারল্যান্ডসও বাদ

জার্মানির অশ্রুসিক্ত বিদায়, নেদারল্যান্ডসও বাদ
×

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, হিউস্টন থেকে

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩১ | আপডেট: ০১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩২

| প্রিন্ট সংস্করণ

বোস্টনের আকাশটা কি ম্যাচ শেষের আগেই একটু ভারী হয়ে উঠেছিল? নাকি ওটা আসলে রাইন নদীর পার থেকে উড়ে আসা এক বুক দীর্ঘশ্বাস ছিল? হিউস্টনে ব্রাজিলের জয়যাত্রা দেখার পর জার্মানদের মনের অবস্থা আন্দাজ করা যায়; সেখানে ঝরে যাওয়া অশ্রুর সঙ্গে মিশেছিল শূন্যতা আর হাহাকার। নাগেলসম্যান যখন ডাগআউটে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে, কাই হাভার্টজ তখন বুট দিয়ে বোস্টনের ঘাস খুবলে ট্র্যাজেডির নতুন খসড়া লিখছেন। যে জার্মানিকে সবাই চেনে যান্ত্রিক-নির্মম, পেনাল্টি শুটআউটে যাদের স্নায়ু বরফের চেয়েও ঠান্ডা– সোমবার তারাই কিনা টাইব্রেকারের নিষ্ঠুর লটারিতে কুপোকাত! প্যারাগুয়ের কাছে টাইব্রেকে হেরে বিদায় নিয়েছে চারবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানি। এবারের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি এটাই। বিশ্বকাপের বিয়োগান্ত ঘটনা ঘটেছে মেক্সিকোতেও। টাইব্রেকারে মরক্কোর কাছে হেরে শেষ ৩২ থেকে বিদায় নিয়েছে নেদারল্যান্ডসও।

ভিএআর বিতর্ক ছাপিয়ে ম্যাচ যখন ১-১ গোলের সমতায়, তখনও বিশ্বাসটা অটুটই ছিল। পেনাল্টি শুটআউট আর জার্মানি– ফুটবল ডিকশনারিতে এই দুটো শব্দ তো চিরকাল সমার্থকই ছিল। স্নায়ুর চাপ কীভাবে চিবিয়ে খেতে হয়, সেটি জার্মানদের চেয়ে ভালো আর কে জানত! কিন্তু বোস্টন দেখাল, সেই লৌহ কঠিন স্নায়ু আসলে এখন শুধুই অতীত। কাই হাভার্টজ যখন পেনাল্টিটা মিস করলেন, মাঠে তখন প্যারাগুয়ের লাতিন উৎসবের গর্জন। আর জার্মানি? তারা তখন নিজেদের হারিয়ে যাওয়া ছায়ার মুখোমুখি। এদিন তারা মাঠে কোনো ফুটবল খেলেনি; খেলেছে এক অদ্ভুত আত্মহননের খেলা। আসলে রাজপ্রাসাদটা অনেক আগেই ভাঙছিল, আজ শুধু শেষ দেয়ালটা ধসে পড়ল। ২০১৮ রাশিয়ায়, ২০২২-এ কাতারে তো গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল। এবার শেষ বত্রিশ থেকেই ব্যাগ গুছিয়ে বাড়ি যাওয়া। ব্যস, রোবটদের রূপকথা এখানেই ইতি। যারা গ্যারি লিনেকারের সেই বিখ্যাত উক্তি, ‘ফুটবল একটা সহজ খেলা, যেখানে ২২ জন মানুষ ৯০ মিনিট একটা বলের পেছনে দৌড়ায় এবং শেষে জার্মানি জেতে’ শুনে বড় হয়েছে, তাদের বিশ্বাস ভঙ্গের দিন। এই জার্মানি সেই অপরাজেয় রোবটদের দল নয়। এদের স্নায়ু বরফের নয়, কাচের; যা প্যারাগুয়ের লাতিন ফুটবলের সামান্য আঘাতেই ভেঙে খানখান হয়ে গেল। 

প্রথমার্ধে জার্মানিকে মনে হচ্ছিল এক মন্থর, লক্ষ্যহীন প্রকাণ্ড যন্ত্র; যার মাঝমাঠে ক্রিয়েটিভিটির ছিটেফোঁটাও নেই। ৪২ মিনিটে হুলিও এনসিসোর সেই দুর্দান্ত গোলটি মূলত জার্মান ডিফেন্সের স্কুলপড়ুয়া পজিশনিং ও হাইলাইন রক্ষণভাগের কঙ্কালটা বের করে দেয়। দ্বিতীয়ার্ধে কাই হাভার্টজের চমৎকার হেডে সমতা ফিরিয়ে জার্মানি ম্যাচে ফেরার ইঙ্গিত দিলেও গোলের সামনে তাদের চিরাচরিত ‘কিলার ইনস্টিনক্ট’ নিখোঁজ ছিল। উইর্টজ-মুসিয়ালারা বল পায়ে বড্ড বেশি সময় নষ্ট করছিলেন, যার সুবিধা নিয়ে প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগ নিজেদের বক্সের সামনে এক অভেদ্য লাতিন দেয়াল তুলে দাঁড়ায়। অতিরিক্ত সময়ে জোনাথান তাহর সেই নাটকীয় গোলটি যখন ভিএআর ফাউলের অপরাধে বাতিল করে দেয়, ঠিক তখনই জার্মানির স্নায়ু ভাঙার শব্দ পাওয়া যায়! পুরো ১২০ মিনিটে জার্মানি বল পজিশনে আধিপত্য দেখালেও প্যারাগুয়ের ধারালো কাউন্টার অ্যাটাক আর অদম্য লড়াকু মানসিকতার সামনে তাদের যান্ত্রিক ফুটবল বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে।

টাইব্রেকে শট নিতে যাওয়ার সময়ও কাই হাভার্টজ কিংবা নিক ভোল্টেমাদেদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজই বলে দিচ্ছিল, তারা জয়ের জন্য নন; বরং পরাজয়ের ভয়ে কাঁপছেন। হাভার্টজ যখন শটটা মিস করলেন, তখন প্যারাগুয়ের গোলকিপার ওলান্দো জিলের আত্মবিশ্বাসী ডাইভের বিপরীতে জার্মান ফরোয়ার্ডের অসহায়ত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শেষ মুহূর্তে জোনাথান তাহর শটটি যখন লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো, তখন ব্যালান্সশিটের সব হিসাবনিকাশ চূর্ণ করে ৪-৩ ব্যবধানে রূপকথা লিখে ফেলে প্যারাগুয়ে।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে যে জার্মানি পাঁচবার পেনাল্টি শুটআউটে মুখোমুখি হয়ে সবকটিই জিতেছে, যার প্রতিটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাদের সোনালি সব অধ্যায়– সেই জার্মানির এই প্রজন্ম কিনা এবারে হেরে গেল প্যারাগুয়ের কাছে! ১৯৮২-এর সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে, ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টারে মেক্সিকোকে, ১৯৯০-এর সেমিতে ইংল্যান্ডকে, ২০০৬ সালের কোয়ার্টারে আর্জেন্টিনাকে কাঁদিয়েছিল। এবার তাদেরই কিনা কাঁদতে হলো প্যারাগুয়ের কাছে।

পরাজয়ের গ্লানি চেপে রেখেই ম্যাচ শেষে জার্মান কোচ সহানুভূতি খুঁজেছেন। ‘১২০ মিনিটের লড়াইয়ে আমরাই আধিপত্য বিস্তার করেছিলাম; কিন্তু ফুটবলে শুধু বল দখলে রাখলে চলে না, সুযোগগুলো কাজে লাগাতে হয়। পেনাল্টি শুটআউট সব সময়ই মনস্তাত্ত্বিক চাপের খেলা। আর আজ রাতে আমাদের সেই স্নায়ুর জোরটাই ছিল না।’ তবে নিশ্চিতভাবেই তাঁর এসব অজুহাত মেনে নিতে পারছেন না জার্মানির সাবেকরা। 

‘প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচটি আপনি কোনোভাবেই অতিরিক্ত সময়ে টেনে নিয়ে যেতে পারেন না। আমরা ওদের নিজেদের মতো করে খেলার সুযোগ করে দিয়েছি এবং ম্যাচের শেষ মুহূর্তে রেফারির একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে কান্নাকাটি করছি। এমনটা কখনোই হওয়া উচিত না।’ 

ক্ষোভ ঝরে পড়ছিল ২০১৪ বিশ্বকাপজয়ী জার্মান ফুটবলার ক্রিস্টোফার ক্রেমার। মাগেন্তা টিভিতে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় ম্যাটস হামেলসের মতো সাবেক ডিফেন্ডারকেও প্রচণ্ড ভেঙে পড়তে দেখা যায়। ‘দলের মানসিকতা আজ কাচের মতো ভেঙে গেছে। যখনই চাপ এসেছে, দলটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। টানা তিনটি বিশ্বকাপে এই একই চিত্রনাট্য প্রমাণ করে, আমাদের ফুটবল সিস্টেমে বড় রকমের গলদ রয়েছে। এই লজ্জাজনক পরাজয়ের পর দলে ব্যাপক রদবদল প্রয়োজন।’ আসলে কাই হাভার্টজ আর জোনাথান তাহদের ঝরে যাওয়া অশ্রুর ওপর দাঁড়িয়ে জার্মানির ফুটবলের আকাশে যে ঘোর অন্ধকার নামল, তা কাটার জন্য হয়তো আরও একটা নতুন প্রজন্মের অপেক্ষা লাগবে।

শেষ ৩২–এ শেষ নেদারল্যান্ডস

বিশ্বকাপে সব সময় বড় দল নেদারল্যান্ডস। এবারও ফেভারিটের তকমা নিয়ে খেলছিল তারা। দারুণ ছন্দে ছিল গ্রুপ পর্বে। শেষ ৩২-এ মরক্কোর বিপক্ষে ফেভারিট ভাবা হচ্ছিল ডাচদের। সে ধারণা ভুল প্রমাণ করেন আশরাফ হাকিমিরা। ১২০ মিনিটের ম্যাচে ৭০ ভাগ সময় বলের দখল রেখে লড়ে গেছেন বুক চিতিয়ে। ৭২ মিনিটে গ্যাকপোর গোলে এগিয়ে গিয়েছিল নেদারল্যান্ডস। ৯০ মিনিট পর্যন্ত লিডে ছিল তারা। বিপত্তি ঘটে যোগ করা সময়ে। ৯১ মিনিটে মরক্কোর সেন্টার ব্যাক ইসা দিপোর গোলে সমতায় ফেরে মরক্কো। মূল ম্যাচ ১-১ সমতায় শেষ হলে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট খেলা হয়। এই সময়েও ফল না আসায় টাইব্রেকারে গড়ায় ম্যাচ। পেনাল্টি শুটআউটে ৩-২ গোলে জয়ী হয় মরক্কো। পাঁচ শটের তিনটিতে গোল করেছে নেদারল্যান্ডস।

আরও পড়ুন

×