‘অরেঞ্জদের’ তেতো বিশ্বকাপ
সাখাওয়াত হোসেন জয়
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ১০:৫৭
গ্যালারিতে জনপ্রিয় ডাচ স্লোগান ‘লিংকস রেখটস’। আইকনিক স্লোগানের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী কমলা জার্সিতে সেজে আসা সমর্থকরা নেচেগেয়ে দলকে উৎসাহ দিতে থাকেন। সবুজগালিচায় মরক্কোর বিপক্ষে নেদারল্যান্ডসের ফুটবলাররা হয়ে ওঠেন শিল্পী। অনাগত সন্তানকে হারানোর বেদনা বুকে চাপা দিয়ে খেলতে নামা কোডি গাকপোর গোলে জয়ের খুব কাছে চলে যায় ডাচরা। কিন্তু ম্যাচের যোগ করা সময়ে ইসা জিওপের গোলে খেলায় ফিরে আসে মরক্কো। মহানাটকের জন্ম দেওয়া টাইব্রেকারে মরক্কোর কাছে ৩-২ গোলে হেরে কান্নার বিদায় ডাচদের। গাকপোর আবেগময় গোলে নেদারল্যান্ডস জয়ের যে স্বপ্ন দেখছিল, তা ভেঙে যায় পেনাল্টি শুট আউটে মরক্কো গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনোর দৃঢ়তায়। শেষ বত্রিশ থেকে বিদায়ে বিশ্বকাপটাই তেতো কমলা জার্সিধারীদের জন্য। অপ্রত্যাশিত বিদায়ে বেদনার নীল হয় ডাচশিবির।
‘টোটাল ফুটবলের’ দেশ নেদারল্যান্ডসকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অন্যতম সেরা দল হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বিশ্বকাপে শিরোপা জিততে না পারা তাদের এক চিরন্তন আক্ষেপ। ১৯৭৪, ১৯৭৮ এবং ২০১০ বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠেই চ্যাম্পিয়ন ট্রফিটা ছোঁয়া হয়নি তাদের। উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে এবার অন্যতম ফেভারিট ছিলেন ভার্জিন ফন ডাইক-ফ্র্যাংক ডি ইয়ংরা। কিন্তু মেক্সিকোর মন্তেরেই স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার সকালে নিজেদের ফুটবলে আরেকটি ব্যর্থতার গল্প লিখেছে ডাচরা। রোনাল্ড কোম্যানের হাত ধরে নেদারল্যান্ডস নাম লিখিয়েছে লজ্জার রেকর্ডে। বিশ্বকাপে স্পেনের সমান চারবার টাইব্রেকার নামক পরীক্ষায় স্নায়ুর চাপ ধরে রাখতে পারেননি দেশটির ফুটবলাররা।
সবচেয়ে হতাশার বিষয় টানা তিনটি বিশ্বকাপে টাইব্রেকারে থেমেছে নেদারল্যান্ডসের শিরোপার স্বপ্ন। ২০১৪ সালে সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা, ২০২২ আসরে কোয়ার্টার ফাইনালে একই প্রতিপক্ষের কাছে পেনাল্টি শুট আউটে হেরেছে তারা। মাঝে ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জনই করতে পারেনি কমলা জার্সিধারীরা। এর আগে ১৯৯৮ বিশ্বকাপেও ব্রাজিলের কাছে একই পরিণতি হয়েছিল ডাচদের। বারবার টাইব্রেকারে স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার অভিজ্ঞতাটা যে তেতো তা ফুটে ওঠেছে কোচ কোম্যানের কণ্ঠেও, ‘হয়তো ম্যাচের কিছু কিছু সময়ে মরক্কোই ভালো সুযোগ তৈরি করেছে, বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ম্যাচে লিড আমাদেরই ছিল এবং ওরা গোল শোধের পথই খুঁজে পাচ্ছিল না। এরপর একটা সৌভাগ্যসূচক অ্যাসিস্ট (গোল বানানো) থেকে ওরা গোল পেয়ে গেল। ম্যাচ যখন একেবারে ইনজুরি টাইমে, তখন গোল হজম করাটা নিশ্চিতভাবেই চরম তেতো অনুভূতির।’
অথচ মরক্কোর বিপক্ষে শেষ বত্রিশে ওঠার লড়াইটি গাকপোর কারণে আবেগঘন ছিল। দেশ না পরিবার আগে? এমন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়া গাকপো দেশের জন্য খেলতে নামার সিদ্ধান্ত নেন। সঙ্গিনী নোয়া ফন দের বে গর্ভাবস্থার শেষ সপ্তাহে ছিলেন। অনাগত সন্তানের নামও ঠিক করে রেখেছিলেন লিভারপুল ফরোয়ার্ড। নিজের নামের সঙ্গে মিল করে রাখেন এলিয়া রাফায়েল গাকপো। কিন্তু সেই সন্তান আর পৃথিবীর আলোর মুখ দেখেনি। গর্ভকালীন জটিলতার কারণে মারা যায়।
মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচের আগে এমন সংবাদটি বজ্রপাতের মতো হয়ে আসে গাকপোর কাছে। ম্যাচের ৪৮ ঘণ্টা আগের এই দুঃসংবাদটি ডাচ তারকার কোমল হৃদয়ে আহত করে। সবার মধ্যে কৌতূহল ছিল ২৭ বছর বয়সী এ তারকা আদৌ খেলবেন কিনা? শোককে শক্তিতে রূপ দিয়ে মাঠে নামেন তিনি। ৭২ মিনিটে গোল করে হাঁটু গেড়ে মাথা মাটিয়ে নুইয়ে রাখেন। মাঠে থাকা সতীর্থদের সঙ্গে ডাগ আউট থেকেও সবাই ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়েন গাকপোর ওপরে। মাঠে ভেঙে পড়লে অধিনায়ক ভার্জিল ফন ডাইকসহ পুরো দল তাঁকে ঘিরে ধরে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করে। ফন ডাইক দীর্ঘক্ষণ গাকপোকে বুকে জড়িয়ে রেখে সান্ত্বনা দেন। ধারাভাষ্যকার তখন বলেছিলেন, ‘কিছু গোল স্রেফ গোলের চেয়েও বেশি কিছু।’
গাকপোর এমন উদযাপনে ফুটবল তখন আবেগ, দেশ আর জীবন মিলেমিশে একাকার। যদি ডাচরা মরক্কোকে হারাতো তাহলে গাকপোর এমন ত্যাগ নিয়ে নতুন গল্প লেখা হতো ফুটবলবিশ্বে।
- বিষয় :
- নেদারল্যান্ডস
- মরক্কো
- ফুটবল বিশ্বকাপ-২০২৬
