ঢাকা সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ

ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র ফুটবলের ক্ষতিই করল বেশি

ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র ফুটবলের ক্ষতিই করল বেশি
×

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প (বামে) ও ফিফা প্রেসিডেন্ট ইনফান্তিনো। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

পাবলো ইগলেসিয়াস মাউরের

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ২১:০৩ | আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ২২:২৬

১৯৬২ সালের বিশ্বকাপে গারিঞ্চা লাল কার্ড পাওয়ার ঘটনাটি ফুটবল ইতিহাসে একটি দৃষ্টান্ত। ব্রাজিলের এই তারকা খেলোয়াড় সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে আঘাত করায় মাঠ থেকে বহিষ্কার হন। ফিফায় তখন সরাসরি এক ম্যাচ নিষেধাজ্ঞার কোনো নিয়ম ছিল না। তাই ফাইনালের ভাগ্য নির্ধারণে ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি এ বিষয়ে বৈঠকে বসে।

প্রচলিত একটি কথা হলো— যে সহকারি রেফারি গারিঞ্চার ফাউল স্পষ্টভাবে দেখেন, তাকে গোপনে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে ‘চুপ’ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ চিলির প্রেসিডেন্ট নিজে ফিফা প্রধানকে ফোন করে অনুরোধ করেন, যেন গারিঞ্চার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা দেওয়া না হয়। টুর্নামেন্টের অন্যতম ‘বিনোদন তারকা’ গারিঞ্চাকে ফাইনালে মাঠে রাখতেই তদবির করেন চিলির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট। ফলে গারিঞ্চা পার পেয়ে যান এবং কয়েকদিন পর ব্রাজিল তাদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয় করে।

আজকের দিনে এমন ঘটনাকে আজগুবি ও বেশ প্রাচীন মনে হতে পারে; তবে বাস্তবতা হলো, আমরা সেই পুরোনো দিনগুলো থেকে খুব বেশিদূর সরে আসিনি। বেলজিয়ামের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের শেষ ষোলোর ম্যাচের আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে কয়েক দফা ফোন করেছেন! যার উদ্দেশ্য ছিল, মার্কিন স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানের ওপর দেওয়া এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের উপায় খুঁজে বের করা।

গত বুধবার বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের ২-০ গোলে জয়ের ম্যাচে বল দখলের লড়াইয়ের সময় প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের গোড়ালিতে পা দিয়ে আঘাত করে মাঠ থেকে বহিষ্কার হন বালোগান। সেই লাল কার্ড নিয়ে অনেক বিতর্ক এবং ভিডিও রিভিউয়ের পর দেওয়া সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা হয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র অবিচারের শিকার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল দলের প্রধান কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনোসহ অনেকে ওই লাল কার্ড নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন। তবে সমর্থকরা ক্ষুব্ধ হলেও বেলজিয়ামের বিপক্ষে স্ট্রাইকার বালোগানকে ছাড়াই মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্র। 

ঠিক এমন পরিস্থিতিতে ঘটনার সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেললেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অথচ তখনও ‘ইউএস সকার ফেডারেশন’ লবিং চালিয়ে যাচ্ছিল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জড়িত হওয়ার পর খুব দ্রুতই বালোগানের ওপর এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা টুর্নামেন্ট শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত হয়ে যায়। ফিফা অবশ্য টুর্নামেন্ট শুরুর আগে নিষেধাজ্ঞা পাওয়া বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়ের (যাদের মধ্যে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও ছিলেন) ক্ষেত্রে এমনটি করেছিল; কিন্তু বিশ্বকাপ চলাকালে নিষেধাজ্ঞা স্থগিত হওয়ার ঘটনা একেবারে নজিরবিহীন।

এর পরের প্রতিক্রিয়া উল্লাস ও তীব্র ক্ষোভের মিশ্রণ। অনেক মার্কিন সমর্থক ও কোচ পচেত্তিনো স্বাভাবিকভাবেই ফিফার সিদ্ধান্তে খুশি। কিন্তু বেলজিয়ামের প্রধান কোচ রুডি গার্সিয়া ক্ষোভে ফেটে পড়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি তো জানতাম না যে এপ্রিল ফুল (১লা এপ্রিলে বোকা বানানোর দিন) এখন জুলাই মাসে উদযাপন হয়!’ বেলজিয়ান ফুটবল ফেডারেশন এরইমধ্যে জানিয়েছে, তারা ফিফার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি বিকল্প খতিয়ে দেখছে।

ফিফার কাছে অবশ্য ব্যাখ্যা রয়েছে, যদিও তা খুব একটা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। তারা এ ব্যাপারে তাদের আইনের একটি ধারার কথা বলছে, যেখানে লাল কার্ড স্থগিতের কথা বলা রয়েছে। যাহোক, ট্রাম্পের ফোন কল নিয়ে সংবাদমাধ্যম যখন প্রশ্ন তুলছে, তখন ফিফা কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলার চেষ্টা করছেন, কোনো ধরণের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

তবে ফিফা যে ট্রাম্পের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়নি— এমন কথা বিশ্বাস করতে বলাটা স্পষ্টতই হাস্যকর। এটি বিশ্বাস করতে বলার মধ্যদিয়ে বুঝানো হচ্ছে যে, ট্রাম্প কেবল তার যোগ্যতাবলে ফিফার ‘শান্তি পুরস্কার’ পেয়েছেন!

তাছাড়া, ইনফান্তিনোর সঙ্গে ট্রাম্পের মধুর সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এটি এমন এক পারস্পরিক স্বার্থের মেলবন্ধন, যেখানে ট্রাম্প তার পছন্দের প্রতি মনোযোগ পান; আর ইনফান্তিনো পান ফিফার উপার্জনের চাবিকাঠি।

কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট যা বুঝতে পারছেন না অথবা পরোয়াই করেন না— তা হলো, ক্ষমতার জোরে এই তুলাদণ্ড নিজের দিকে ঝুঁকিয়ে তিনি মার্কিন ফুটবলের কোনো উপকার করেননি। যুক্তরাষ্ট্রের দলটি নিজের যোগ্যতায় টুর্নামেন্টের এই পর্যায়ে এসেছে। তিনটি অসাধারণ ও একটি গড়পড়তা পারফরম্যান্সের ওপর ভর করে শেষ ষোলোতে পা রেখেছে। আর এই পুরো যাত্রায় বালোগান ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সেরা খেলোয়াড়।

মোনাকোর এই স্ট্রাইকারকে ছাড়াই বহু ফুটবল বিশেষজ্ঞ বেলজিয়ামের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রকে ফেভারিট মানছিলেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র একটি অন্যায্য সুবিধা পেল— এমন ধারণা এখন প্রতিষ্ঠিত। আর এই ধারণা তাদের পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়ার গৌরবকে কলঙ্কিত করবে। এটি কেবল আমেরিকার অভ্যন্তরে নয়, বৈশ্বিকভাবেও সত্য। বিশ্বের চোখে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন এমন এক প্রতীক, যাদের সম্পর্কে ধারণা হলো, তারা সবসময় সবখানে বিশেষ সুবিধা প্রত্যাশা করে। মার্কিন জনগণের জন্যও এটি দুর্ভাগ্যজনক। কারণ তাদের অনেকেই এতদিন যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল অনগ্রসর ও মর্যাদায় পিছিয়ে— এমন একটি ধারণার বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছিলেন। পাশাপাশি এই বিশ্বকাপে দুর্দান্ত খেলে মার্কিন ফুটবলাররা সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করছিলেন। কিন্তু আগামী ম্যাচে তারা জিতলে বিশ্ববাসী হয়তো ভাববে, ‘এই জয় ফিফার তৈরি করে দেওয়া।’

নরওয়ের প্রধান কোচ স্টেল সলবাকেনও একমত যে, ওই জয়ের গায়ে একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন লেগে থাকবে। ব্রাজিলের বিপক্ষে তার দলের চমকপ্রদ ২-১ গোলের জয়ের পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি এটি ফিফার মস্ত বড় ভুল, অত্যন্ত বাজে একটি সিদ্ধান্ত। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আমার দুঃখ হচ্ছে, কারণ তারা জিতলেও ম্যাচটির গায়ে কালো দাগ রয়ে যাবে। এটি ফুটবলের জন্য ভালো নয়।’

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই হস্তক্ষেপ এখন পর্যন্ত সফলভাবে চলতে থাকা এবারের বিশ্বকাপের সৌন্দর্যকেও নষ্ট করল। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে টিকিটের দাম, ভিসা সমস্যা, অবকাঠামো নিয়ে উদ্বেগ এবং ম্যাচে অভিবাসন কর্মকর্তাদের উপস্থিতির মতো নানা বিষয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। কেউ কেউ টুর্নামেন্ট অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়ার দাবিও তুলেছিলেন। অবশেষ কিছু কথা সত্য প্রমাণিত হলো, যার একটি হলো- ইরানের ফুটবল দলের সঙ্গে বাজে আচরণ। তবুও সামগ্রিকভাবে টুর্নামেন্ট নিয়ে ইতিবাচক ধারণাই তৈরি হয়েছিল।

এরমধ্যেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজের ইচ্ছা পূরণে অন্যায্য, অনাকাঙ্খিত, অযাচিত একটি কাজ করলেন, ক্ষমতার প্রভাব খাটালেন। হয়তো বুঝতে পারছেন না, কত বড় অবিচার তিনি করে বসেছেন, যা সংশোধন করা অনেক কঠিন হবে।

লেখক: দ্য গার্ডিয়ানের ফুটবল বিষয়ক প্রতিনিধি

আরও পড়ুন

×