ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬

পৃথিবীর তিনভাগ জল, একভাগ জুড

পৃথিবীর তিনভাগ জল, একভাগ জুড
×

মেক্সিকোর বিপক্ষে গোল করে ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডার জুড বেলিংহামের বুনো উদ্‌যাপন। ছবি- এএফপি

আহমেদ শারজিন শরীফ

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ১১:৫২ | আপডেট: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ১১:৫৯

সাল ১৯৭০, আজ্জুরিদের পরাস্ত করে ফুটবলের এক তীর্থভূমিতে পেলে উঁচিয়ে ধরেছিলেন সবশেষ জুলেরিমে ট্রফি। ১৬ বছর পর সেখানেই ম্যারাডোনার জাদুতে শেষ পর্যন্ত রণে ভঙ্গ দিয়েছিল জার্মান ইঞ্জিন। বিশ্বকাপ যদি যজ্ঞ হয়, মেক্সিকোর দ্য এস্তাদিও আজতেকা তবে ফুটবলের পবিত্র মন্দির। এখানে বিশ্বকাপের ম্যাচ যেন নিবেদন। একেকটি গোল মানে আহুতি।

১৯৮৬ সালের পর বিশ্বকাপ ফিরেছে সেই মহাতীর্থে। এমন মহালগ্নই তো মহাতারকার উত্থানের মোক্ষম সময়। রাউন্ড অব সিক্সটিনের ম্যাচে পৃথিবী কি শুনল তেমনই কারও পদধ্বনি? ঘরের দর্শকদের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে দু' মিনিটে মেক্সিকোর জালে দু'বার বল জড়িয়ে জুড ভিক্টর বেলিংহাম কি জানান দিলেন সদর্প আগমনী বার্তার?

এমনিতেই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উঁচু আজতেকায় খেলা কষ্টসাধ্য। সঙ্গে ৮০ হাজারেরও বেশি দর্শকের চাপ। ৯০ মিনিটের ঝড়ঝঞ্ঝায় তরী ডোবার শঙ্কা কি একবারও জাগেনি কোচ টুখেলের মনে? বৃষ্টির বৈরিতা, গ্যালারির চিৎকারে হার মানে বজ্রনিনাদ। এমন ম্যাচে থ্রি লায়ন্সদের কাণ্ডারি হয়ে উঠলেন ২৩ বছর বয়সী এক তরুণ। যার নামডাক এখনও খুব একটা ছড়ায়নি লোকের মুখে মুখে।

ছবি - এএফপি

উড়ন্ত হেডে প্রথম লক্ষ্যভেদ, ৯৮ সেকেন্ড পর হ্যারি কেইনের ক্রস থেকে ২-০ গোলে এগিয়ে যাওয়া। মেক্সিকান গ্যালারিতে নেমে এল শ্মশানের নীরবতা। এরপর প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে দলের লিড ধরে রাখা। সবখানে বেলিংহাম। শেষবার আজতেকাকে এমন মোহাচ্ছন্ন করতে পেরেছিলেন দিয়েগো ম্যারাডোনা।

গোল আর ক্লিয়ারেন্সই এই ম্যাচে তার নৈপুণ্যের সাক্ষী। তবে দ্বিতীয়ার্ধে রাইটব্যাক জারেল কোয়ানশা লাল কার্ডে মাঠ ছাড়লে জুড যা করেছেন তা নিঃসন্দেহে অতিমানবীয়। পুরো মাঠ দৌড়ে, ট্যাকল আর প্রেস করে, ক্লান্ত সতীর্থদের মনোবল যুগিয়ে গেছেন সমানতালে। বড় খেলোয়াড়রা ম্যাচ জেতান। আর যোগ্য নেতা জয়ের পরিবেশ তৈরি করেন। মেক্সিকোর বিপক্ষে ১০ নম্বর জার্সির খেলোয়াড়টিকে দুই ভূমিকাতেই পেয়েছে ইংল্যান্ড।

জুড বেলিংহাম কোন ভূমিকায় খেলেন? উত্তরে বলতে হয়, মাঝমাঠে শুরু করে তিনি কোথায় খেলেন না? সে কারণেই ধারাভাষ্যকারের ভাষায়, ‘পৃথিবীর তিনভাগ জল, একভাগ জুড’।

আধুনিক ফুটবলে রোলের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের অবস্থা বুঝে বহুমুখী ভূমিকায় নিজেকে মানিয়ে নিতে পারার কৌশলী খেলোয়াড়। বেলিংহাম তেমনই একজন। তিনি প্রতি মুহূর্তে ম্যাচের গতিপ্রকৃতি নজরে রাখেন, প্রতিপক্ষের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পদক্ষেপও তার নজর এড়ায় না। অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় উপস্থিত হন সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায়।

ছবি - এএফপি

রক্ষণের প্রয়োজনে পাকা বক্স টু বক্স মিডফিল্ডারের মতো প্রেস করে বল কেড়ে নেন জুড, প্রতিপক্ষের ভুল পাসগুলো খুঁজে পায় তার পা, আর বল নিয়ে যেই ছুটুক পড়তে হয় জুডের বাধায়। অন্যদিকে, বলের দখল নিজেদের পায়ে থাকলে বদলে যায় তার ভূমিকা। তখন ফলস নাইন হয়ে ফাঁকা জায়গা ধরে সাজান আক্রমণ। কখনো আবার প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে বোকা বানিয়ে চতুর শেয়ালের মতো ঢুকে পড়েন ডিবক্সে।

এই বিশ্বকাপে কেইন-জুড জুটি যেকোনো প্রতিপক্ষের বড় দুশ্চিন্তার নাম। আর দশজন স্ট্রাইকারের মতো কেইন কেবল গোল করেই ক্ষান্ত হন না, মাঝমাঠে নেমে আক্রমণ সাজাতে এমনকি আরও নিচে এসে রক্ষণে সহায়তা করেন। সে কারণে তাকে নজরবন্দি করাও প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের জন্য দুরূহ। কেইনের সুপরিকল্পিত ওঠানামায় সৃষ্ট ভার্টিক্যাল স্পেসে তাণ্ডবলীলার প্রস্তুতি নেন বেলিংহাম। মূল স্ট্রাইকার কেইনকে মার্ক করতে গিয়ে প্রতিপক্ষ প্রায়ই ফাঁকা হয়ে যায় বিপক্ষ দলের রক্ষণভাগ। বেলিংহাম এই সুযোগের পুরো সদ্ব্যবহার করতে জানেন।

কাকতালীয়ভাবে নয় বরং এই জুটি গড়ে উঠেছে পারস্পারিক বোঝাপড়া থেকে। মেক্সিকোর বিপক্ষে যা পুরোপুরি প্রস্ফূটিত হয়ে এসেছে একটি গোল। ফুটবলে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ঝলক প্রায়ই দেখা যায়। কিন্তু ইংল্যান্ডের অস্ত্র পুরো স্কোয়াডের ভেতরকার বোঝাপড়া।

ফুটবলের সঙ্গে বেলিংহামের সম্পর্ক আশৈশব। বয়স পাঁচ হওয়ার আগেই শেখেন বলে লাথি মারতে। ছয় বছর বয়স থেকে তাকে পুরোপুরি পেয়ে বসে ফুটবল। মায়ের কথায় জুড তখন থেকেই ‘ফুটবলের পোকা’!

ছবি - এএফপি

জুডের প্রথম ক্লাব স্টুরব্রিজ জুনিয়র্স। বাবা মার্ক বেলিংহাম ছিলেন সেখানকার কোচ। ইংল্যান্ডের ননলিগ ফুটবলে বেশ নামডাক তার। পেশায় পুলিশ সার্জেন্ট মার্কের শখের ক্যারিয়ারে শত শত গোল। এমন বাবার ছেলে বড় ফুটবলার হওয়ার প্রেরণা পেতেই পারেন। জুডের ছোট ভাই জোবও প্রতিভাবান ফুটবলার। দুই ভাইয়ের খুনসুঁটি কিংবা দ্বৈরথও হয়ত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে উভয়কে। আর মা ডেনিস বেলিংহামের প্রেরণা তো নিত্যসঙ্গী।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন প্রভাবশালী বাস্তবতা। বিচারের হাট। এখানে খেলোয়াড়দের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা নির্ধারণ করে দেয় জনস্রোত। জুড অবশ্য এই ডামাডোলে গা ভাসান না। কম বয়সে এই পরিপক্বতার ভিত গড়ে দিয়েছে পরিবার। তার আচরণে অহমিকা নয়, ঠিকরে বেরোয় আত্মবিশ্বাস।

ইংলিশ চ্যাম্পিয়নশিপ ক্লাব বার্মিংহাম সিটির ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় ছিলেন জুড ভিক্টর বেলিংহাম। এক মৌসুম না খেলতেই নজরে আসেন জার্মান ক্লাব বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের। বার্মিংহাম জুডকে ছেড়ে দেয় ঠিকই, কিন্তু তার পরা ২২ নম্বর জার্সিটিকে তুলে রাখে চিরতরে। তরুণ একজন খেলোয়াড়ের জন্য এরচেয়ে বড় সম্মান আর কী-ই বা হতে পারে! জার্মানিতে গিয়ে জুড রপ্ত করেন নানামাত্রিক কৌশল। বুন্দেসলিগার অভিজ্ঞতা তাকে মাঠের দায়িত্ব বুঝতে শেখায়।

ছবি- এপি

ডর্টমুন্ডে আলো ছড়াতে থাকা বেলিংহামকে নিয়ে আসে ইউরোপীয় জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে এসে পান ৫ নম্বর জার্সি। একসময় যা শোভা পেত মহারথী জিনেদিন জিদানের গায়ে। নির্ভারচিত্তে মাদ্রিদের সেই জার্সির দায়িত্ব সামলানোর প্রস্তুতি নেন ইংলিশ তরুণটি। চাপ টলাতে পারে না তাকে। ভেঙে পড়েন না প্রত্যাশার ভারেও।

ডর্টমুন্ডের বিদ্যাধন্য ২৩ বছর বয়সী মিডফিল্ডারটি এখন রিয়াল মাদ্রিদ তথা ইংল্যান্ড দলেরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। মায়ের সেই ‘ফুটবলের পোকাটি’ নিজের সবটুকু উজাড় করে দিচ্ছেন দেশের জার্সিতে। প্রতিভা থেকে হয়ে উঠেছেন মায়েস্ত্রো। জুড ভিক্টর বেলিংহামকে তাই ফুটবলের উদীয়মান তরুণ না বলে তারকা খেলোয়াড় বলাই শ্রেয়।

চলতি বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্লিং হাল্যান্ডের নরওয়ের মোকাবিলা করবে ইংল্যান্ড। এ এক বহুমুখি লড়াইয়ের পূর্বাভাস। দলকে এতদূর নিয়ে আসতে জুডের ভূমিকা অপরিমেয়। পরের ম্যাচেও অনবদ্য থেকে দলের অগ্রযাত্রায় জুডকে দেখার আশা নিশ্চয়ই দুরাশা নয়!

লেখক: আহমেদ শারজিন শরীফ

আরও পড়ুন

×