ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কেন তেতে থাকে আর্জেন্টিনা?
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৫৪ | আপডেট: ১৩ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৫৪
আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের লড়াই শুধু একটি ম্যাচ নয়। এটি দুই দলের ফুটবল দক্ষতার পাশাপাশি ইতিহাস, রাজনীতি, জাতীয়তাবাদ এবং বহু বছরের তিক্ততারও প্রতিচ্ছবি। প্রায় ২১ বছর পর আবার মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল। ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের এই লড়াই ঘিরে তাই মাঠের বাইরেও উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে।
কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করার পরই আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় ও সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে ফুটে ওঠে সেই পুরোনো আবেগ। গ্যালারিতে ধ্বনিত হয় পরিচিত স্লোগান, ‘কো এল কে নো সালতা, এস উন ইংলেস’ (যে লাফাবে না, সেই ইংরেজ)। ম্যাচ শুরুর আগেই এমন দৃশ্য বলে দেয়, এই দ্বৈরথ আর্জেন্টাইনদের কাছে কতটা আবেগের।
ফুটবল মাঠে ইংল্যান্ডকে পেলেই যেন তেতে ওঠেন আলবিসেলেস্তেরা। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুমেও নাচ-গানের সঙ্গে ওঠে আরেকটি স্লোগান, ‘ফর দ্য মালভিনাস, ফর দিয়েগো, ফর লিওস লাস্ট ওয়ান।’ যার অর্থ, মালভিনাস দ্বীপ, দিয়েগো ম্যারাডোনা এবং মেসির শেষ বিশ্বকাপের সম্মানে ইংল্যান্ডকে হারাতেই হবে।
এই বৈরিতার সবচেয়ে বড় কারণ ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড (আর্জেন্টিনার ভাষায় মালভিনাস) যুদ্ধ। দক্ষিণ আটলান্টিকের ওই দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ৭৪ দিনের যুদ্ধে আর্জেন্টিনার ৬৪৯ এবং ব্রিটেনের ২৫৫ সেনা নিহত হন। যুদ্ধে পরাজয়ের ক্ষত আজও আর্জেন্টিনার জাতীয় স্মৃতির অংশ। অনেকের কাছেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ফুটবল ম্যাচ সেই অপমানের প্রতীকী জবাব দেওয়ার মঞ্চ।
ফকল্যান্ড যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর, ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আবার মুখোমুখি হয় দুই দল। সেই ম্যাচেই জন্ম নেয় ফুটবল ইতিহাসের দুটি সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত। প্রথমটি ডিয়েগো ম্যারাডোনার বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল। কয়েক মিনিট পর মাঝমাঠ থেকে একাই পাঁচজনকে কাটিয়ে করেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল, যা পরে ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ নামে পরিচিতি পায়।
ম্যাচ শেষে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, এটি ছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধে নিহত আর্জেন্টাইনদের জন্য এক ধরনের প্রতিশোধ। নিজের আত্মজীবনীতেও তিনি লিখেছিলেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলতে নেমে বারবার তার মনে ফিরে আসছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি।
দুই দেশের বৈরিতা অবশ্য যুদ্ধ দিয়েই শুরু হয়নি। ১৯৬৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাতিনকে বিতর্কিতভাবে লাল কার্ড দেখানো হয়। মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের কোচ আলফ রামসে নিজের খেলোয়াড়দের আর্জেন্টাইনদের সঙ্গে জার্সি বদল করতে নিষেধ করেন এবং তাদের ‘পশু’ বলে মন্তব্য করেন। আর্জেন্টিনায় এই মন্তব্যকে অপমানজনক ও বর্ণবাদী হিসেবে দেখা হয়। সেই ঘটনার পর থেকেই দুই দেশের ফুটবলীয় সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে ওঠে।
দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে লিওনেল মেসি কখনোই ইংল্যান্ড জাতীয় দলের বিপক্ষে খেলেননি। ২০০৫ সালে অভিষেকের পর একই বছরের ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে নিষেধাজ্ঞার কারণে মাঠে নামতে পারেননি তিনি। এরপর আর দুই দলের দেখা হয়নি। ফলে আটলান্টার এই সেমিফাইনাল শুধু ফাইনালে ওঠার লড়াই নয়, আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির প্রথম ইংল্যান্ড-অধ্যায়ও। অনেক আর্জেন্টাইন সমর্থকের চোখে এটি ম্যারাডোনার উত্তরাধিকার ধরে রাখার আরেকটি সুযোগ।
এই ম্যাচের সংবেদনশীলতার কারণেই রেফারি নিয়োগেও বাড়তি সতর্ক থাকে ফিফা। অলিখিত নিয়ম অনুযায়ী, আর্জেন্টিনার ম্যাচে ইংলিশ রেফারি এবং ইংল্যান্ডের ম্যাচে আর্জেন্টাইন রেফারি দায়িত্ব পান না।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত পাঁচবার মুখোমুখি হয়েছে দুই দল। ১৯৬২ বিশ্বকাপে প্রথম দেখায় ৩-১ ব্যবধানে জয় পায় ইংল্যান্ড। ১৯৬৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালেও ১-০ গোলে জেতে তারা। ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার জাদুতে জয় পায় আর্জেন্টিনা। ১৯৯৮ সালে টাইব্রেকারে ইংল্যান্ডকে বিদায় করে আলবিসেলেস্তেরা। আর ২০০২ বিশ্বকাপে ডেভিড বেকহ্যামের পেনাল্টি গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতে প্রতিশোধ নেয় ইংল্যান্ড।
২০০৫ সালের পর আর মুখোমুখি হয়নি আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। প্রায় দুই দশকের অপেক্ষা শেষে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আবারও মুখোমুখি হচ্ছে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম তীব্র এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী। মাঠের লড়াইয়ের বাইরে, ইতিহাসেরও যেন আরেকটি নতুন অধ্যায় লেখা হতে যাচ্ছে আটলান্টায়।
- বিষয় :
- আর্জেন্টিনা
- ইংল্যান্ড
- বিশ্বকাপ ফুটবল