ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

মায়ের বাড়ি ফিরবে কি বিশ্বকাপ

মায়ের বাড়ি ফিরবে কি বিশ্বকাপ
×

সেকান্দার আলী

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ | ১০:৩১

বিশ্বকাপ ফুটবলের উড়ুক্কু মন। সে দেশে দেশে ঘুরে বেড়ায়। কখনও ইউরোপে কাছের প্রতিবেশীর ঘরে, কখনও পরিব্রাজক হয় লাতিন আমেরিকায়। বাড়ি ফেরায় একটুও মন নেই তার। কেউ জানে না, কবে ফিরবে, নাকি ফিরবে না। ইংলিশদের অপেক্ষাও তাই ফুরায় না। প্রতি বিশ্বকাপের মতো এবারও তাই দেশটির মিডিয়ায় লেখা হয়েছে– ফুটবল ‘কামিং হোম’। এভাবেই ৫৬ বছর অপেক্ষার প্রহর গোনা ফুটবলের মাতৃভূমির। শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়েকে ২-১ গোলে হারিয়ে চতুর্থবারের মতো সেমিফাইনালে ওঠায় সেই স্বপ্ন মাথাচাড়া দিচ্ছে ইংল্যান্ডে। হাসি ফুটেছে ফুটবলের মায়ের দেশের মানুষের মুখে। ইংলিশরাও বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, এবার মায়ের কোলে ফিরবেই বিশ্বকাপের ট্রফি।

ইংলিশদের সেরা চারে জায়গা করে নেওয়ার মূল কারিগর জুড বেলিংহাম। এই রিয়াল মাদ্রিদ মিডফিল্ডার জোড়া গোল করে পরাজয়ের শঙ্কা থেকে টেনে তোলেন দলকে। তবে বিশ্বকাপ মঞ্চে তিন সিংহকে প্রাণে বাঁচিয়ে রাখা সহজ ছিল না। পিছিয়ে পড়ে ম্যাচ জিতে মাঠ ছাড়ার বীরত্বগাথা লিখতে পরিশ্রম করতে হয়েছে কেইনদের। নীল সমুদ্রের পাড়ে ১২০ মিনিটের গেম জিততে কতটা ঘাম ঝরাতে হয়েছে, তা জানেন কেবল খেলোয়াড়রা। ম্যাচের শুরু থেকে ইংল্যান্ড বলের দখলে এগিয়ে থাকলেও খুলতে পারছিল না নরওয়ের গোলমুখ। প্রচণ্ড গরম আর আর্দ্র আবহাওয়ায় টানা দৌড়ে খেলাটাও কঠিন ছিল। সেখানে নরওয়ে প্রথম বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলতে নেমে গুছিয়ে নেয় দ্রুত সময়ে। পাল্টা আক্রমণে গোলের সম্ভাবনা বাড়াতে থাকে। ৩৩ মিনিটে দারুণ এক গোলে এগিয়ে যায় দলটি। কেইনের কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে ঝটিকা আক্রমণে যান নরওয়ের প্যাট্রিক বের্গ। বাঁ দিক থেকে আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপ দুর্দান্ত শটে জর্ডান পিকফোর্ডকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান।

গোলের পর উজ্জীবিত হয়ে আক্রমণের ধার বাড়ায় নরওয়ে। ব্যবধান দ্বিগুণও করে ফেলেছিল তারা। বক্সের ভেতরে আর্লিং হালান্ড ইচ্ছা করে ধাক্কা দিয়ে অ্যান্ডারসনকে ফেলে দেওয়ায় ফাউল ধরা হয়। ইংলিশদের দাবির মুখে ভিএআর রিপ্লে দেখে গোল বাতিল করেন রেফারি। ইংলিশরা ম্যাচে ফেরে প্রথমার্ধের শেষ দিকে যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে। অ্যান্থনি গার্ডনের পাস থেকে বল ধরে বক্সের ভেতরে জায়গা বানিয়ে শট নেন বেলিংহাম। জোরালো শটের তীব্রতার সামনে নরওয়ের গোলরক্ষক ওরইয়ান নিল্যান্ডের প্রতিরোধের দেয়াল সুরক্ষিত থাকেনি। সমতায় আত্মবিশ্বাস ফেরে তিন সিংহদের। পাসিং ফুটবল খেলে আক্রমণের ধার বাড়ায়।

নরওয়েও ছেড়ে কথা বলেনি। প্রতি আক্রমণে বেশ কয়েকবার সুযোগ সৃষ্টি করেও সফল হননি হালান্ডরা। ফলে নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা শেষ হয় ১-১ গোলের সমতায়। অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের খেলা শুরু হলে ইংলিশরা চাপে ফেলে নরওয়েকে। ৯৩ মিনিটে বেলিংহামের গোলে ব্যবধান ২-১ হয়। মর্গ্যান রজার্সের শট গোলরক্ষক নিল্যান্ড গ্লাভসবন্দি করতে না পারায় ফিরতি বল জালে জড়ান বেলিংহাম। পিছিয়ে পড়েও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে গেছে নরওয়ে। কিন্তু তাদের মূল স্ট্রাইকার হালান্ডকে ইংলিশরা নিষ্প্রভ করে দেওয়ায় জিততে পারেনি। চোটের কারণে অতিরিক্ত সময়ে মাঠেও থাকতে পারেননি হালান্ড।

বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে নামার আগে ইংলিশ কোচ টমাস টুখেলের স্পষ্ট বার্তা ছিল– সেরাটা উজাড় করে খেলে জিততে হবে ম্যাচ। কোচের দেওয়া মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে লক্ষ্য অর্জন করে তিন সিংহের দল। আট বছর পর বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠে দেশটি। ১৯৬৬, ১৯৯০ সালে পর ২০১৮ সালে শেষবার সেমিফাইনাল খেলেছিল ইংল্যান্ড। শেষবার ক্রোয়েশিয়ার কাছে ২-১ গোলে হেরে কান্নাভেজা চোখে দেশে ফিরতে হয়েছিল কেইনদের। ১৯৬৬ সালের পর ফাইনালে ওঠার মোক্ষম সুযোগ এসেছে দেশটির। নরওয়ের বিপক্ষে অভূতপূর্ণ জয়ের পর উৎসবে মাতোয়ারা ছিল গ্যালারি। কেইনরা উৎসব করেন মাঠের ভেতরে। হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ফ্লোরিডায় আসা সমর্থকদের সম্মান জানান কেইনরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে।

খেলোয়াড়দের এই উৎসবে জল ঢেলে দেওয়ার মতোই মন্তব্য করেন ইংলিশ কোচ টমাস টুখেল। তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, জিতলেও খেলা দেখে মন ভরেনি তাঁর। তিনি বলেন, ‘আমরা ভাগ্যবান ছিলাম। নরওয়ে প্রথমে এগিয়ে গিয়েছিল, তাদের একটি গোল বাতিল হওয়ায় ২-০ হয়নি। তাদের বল বারেও লেগেছে।’ টুখেল মনে করেন, পরিস্থিতি কঠিন হওয়ার পরও ফল নিজেদের পক্ষে আসা এবং সেরা চারে উন্নীত হওয়া স্বস্তির। তিনি বলেন, ‘পারফরম্যান্স নিয়ে আমি খুশি নই– সব দিক থেকেই। আমরা যেভাবে খেলেছি বা যেভাবে খেলেছি, তাতে আমরা নিজেরাই নিজেদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন করে তুলেছি। এলোমেলো খেলা, কৌশলগত ভুল, ক্ষিপ্রতার অভাব এবং প্রতি আক্রমণে ঘাটতি ছিল।’

ম্যানেজারের এমন মন্তব্য প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে বেলিংহাম কিছুটা বিব্রত হন। তিনি পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন এভাবে, ‘হ্যাঁ, যাই হোক। মাঠে পরিস্থিতি ছিল কঠিন ও পরিশ্রমসাধ্য। কঠিন পরিশ্রম করেছে সব খেলোয়াড়ই। আমার প্রশংসা তাদের জন্য, যারা দুর্দান্ত খেলেছে।’

খেলোয়াড়দের সমালোচনা করলেও টুখেল জানান, ইংল্যান্ড দলটিকে ভালোবাসেন তিনি। কারও দূরত্বও নেই তাঁর। কারণ, বিশ্বকাপকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্যই যুক্তরাষ্ট্রে বাকি পথ পাড়ি দিতে চান তারা।

আরও পড়ুন

×