ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

কোথাও ৬ মাস, কোথাও ৯ মাস পানি

কোথাও ৬ মাস, কোথাও ৯ মাস পানি
×

উঠান ছাপিয়ে পানি উঠে গেছে রান্নাঘরের বারান্দায়। উঁচু করতে চুলা বসানো হয়েছে জলচৌকিতে। গতকাল রোববার কুমারখালী পৌরসভার দুর্গাপুর গ্রামে। ছবি: সমকাল

মিজানুর রহমান নয়ন, কুমারখালী (কুষ্টিয়া)

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ | ১০:৪০

কুষ্টিয়ার কুমারখালী পৌরসভাটি কাগজেকলমে প্রথম শ্রেণিভুক্ত। তবে এই পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের দুর্গাপুর গ্রামের অর্ধশতাধিক পরিবারকে ভুগতে হচ্ছে জলাবদ্ধতায়। এই গ্রামে নেই পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা। সামান্য বৃষ্টি হলেই জমে যায় পানি। 

আর ভারী বৃষ্টি হলে শোবারঘর, রান্নাঘর, গোসলখানা-শৌচাগারে উঠে যায় পানি। গ্রামটির কোথাও ৬ মাস, আবার কোথাও ৯ মাস পানিবন্দি থাকতে হয় বাসিন্দাদের।

গতকাল রোববার দুপুরে দেখা গেছে, উপজেলা পরিষদের প্রধান ফটকের সামনে দিয়ে চলে গেছে নির্মাণাধীন পাকা ড্রেন। ড্রেনে পানি জমে থাকলেও তা স্থির। নির্মাণাধীন ড্রেনের প্রায় ২০০ মিটার দূরে অবস্থিত দুর্গাপুর গ্রামের একাংশ। সেখানে আছে পাকা ও আধাপাকা অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি। বাসিন্দাদের চলাচলের জন্য রয়েছে আরসিসি ঢালাইয়ের পাকা সড়কটি ডুবে আছে। গ্রামের বাসিন্দাদের বাড়ির শোবারঘর, রান্নাঘর, শৌচাগার, গোসলখানা, গোয়ালঘরে থই থই পানি। হাঁটুপানি মাড়িয়ে চলাচল করছে নানা বয়সী মানুষ। কেউ ঘরের পানি সেঁচে বাইরে ফেলছেন। এদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চুলা জ্বলেনি কারও।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, তারা সময়মতো পৌরকর পরিশোধ করে আসছেন। তবে গত ২০ বছরেও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করেননি পৌর কর্তৃপক্ষ। বছরের ৬-৯ মাস হাঁটুপানি জমে থাকে।

ব্যবসায়ী গোলাম মোস্তফার স্ত্রী শিরিনা খাতুন বলেন, ঘরে পানি, বাথরুমে পানি, টিউবওয়েলে পানি। সকাল থেকে রান্না-খাওয়া সব বন্ধ। পোলাপান স্কুলে যেতে পারতেছে না, পুরুষ মানুষ কাজে যেতে পারছে না। ১৫-২০ বছর ধরে এভাবে পানির সঙ্গে বসবাস তাদের।

সেলিনা আক্তার নামে এক গৃহিণী বলেন, ‘ছাগল-ভেড়া পর্যন্ত না খেয়ে রয়েছে। আমরা সকাল পর্যন্ত রান্না করতে পারিনি। খাতি পারিনি। টিউবওয়েল ডুবে গেছে। বাথরুম ডুবে গেছে। কয়ডা যে খাবো, আবার সে ভয়ও পাই, যে বাথরুমে যাব ক্যামনে? সবকিছুর অসুবিধা। পরীক্ষা চলতেছে, ছোয়ালপাল স্কুলে যাতি পারতেছে না।’

প্রবীণ বাসিন্দা মো. শাজাহান আলী আক্ষেপ করে বলেন, ‘পানিতি ডুবে রয়ছি। সব ঘরে পানি। ইউএনও সাহেবের একেবারে সামনেই এটা। সে তো কোনোদিনও খোঁজ নেয় না। তাঁদের কাছে তো কোনো সাহায্য চাচ্ছি নে। আমরা চাচ্ছি এটু সুস্থ থাকতি।’ নিয়মিত কর পরিশোধ করা হলেও পানি সরানোর কোনো ব্যবস্থা পৌর কর্তৃপক্ষ করে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। শাহজাহানের স্ত্রী নুরজাহান খাতুন বলেন, ‘বছরের ৬ মাসই পানি জমে থাকে। সকাল থেকে একনাগাড়ে বৃষ্টিতে রান্নাঘর, গোয়াল-টোয়াল সব ভাসে গেছে। রান্নায় করতে পারিনি। কেউতো আসে দেখেও না ফুকচি দে। জলদি পানি বের করার ব্যবস্থা করেন।’

গড়াই নদীর কূলঘেঁষে ১৮৬৯ সালে গঠিত হয় কুমারখালী পৌরসভা। বর্তমানে এখানে প্রায় ৬০ হাজার মানুষের বসবাস। কিন্তু এখানে পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও সড়ক ছিল না। ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে ধাপে ধাপে প্রায় ৩৬ কোটি টাকায় ড্রেন ও পাকা সড়ক নির্মাণ শুরু করে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এক বছর মেয়াদি কাজ দুই বছরেও শেষ হয়নি। এরই মধ্যে গত শনিববার বিকেল ৩টা থেকে রোববার বিকেল ৩টা পর্যন্ত প্রায় ৮৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে কুমারখালী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার। যা চলতি মৌসুমে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। এ তথ্য নিশ্চিত করে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের কর্মকর্তা মো. মামুনুর রশিদ বলেন, তীব্র বর্ষণের কারণে পৌরসভার ১, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের একাংশে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।

দুর্গাপুরের ব্যবসায়ী রাজিব হোসেন বলেন, ‘বহুকাল পর ড্রেন করেছে। কিন্তু পানি যায় না। হাঁটুসমান পানি আটকে রয়েছে। পানিতে পয়জন। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের চলতে খুব কষ্ট হচ্ছে। ঘাঁ-পাচড়া রোগ হচ্ছে। সত্যি বলতে খুব কষ্টে আছি আমরা।’

এদিন বিকেলে দেখা গেছে, কুমারখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সড়ক, উপজেলা পরিষদের প্রবেশপথ, উপজেলা পরিষদ মাঠ, উপজেলা সহকারী কমিশনার ও সমাজসেবা কার্যালয়ের সামনের সড়কেও পানি জমে আছে। জনসাধারণকে পানি মাড়িয়ে চলাচল করতে দেখা যায়। 

পৌর এলাকার বাসিন্দা ও যুব অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি শাকিল আহমেদ তিয়াসের অভিযোগ, ড্রেন নির্মাণকাজে চরম ধীরগতি দেখা গেছে। ফলে চলতি বর্ষায়ও ১, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কয়েকশ বাড়িতে পানি জমেছে। দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

কুমারখালী পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা ইউএনও ফারজানা আখতার বলেন, জনবল সংকট, জায়গা সংক্রান্ত জটিলতাসহ নানা কারণে ড্রেন নির্মাণকাজে কিছুটা ধীরগতি দেখা দিয়েছে। আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যেই কাজ শেষ হবে। বর্তমান জলাবদ্ধতা নিরসনে পৌর কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।

আরও পড়ুন

×