ফ্রান্স-স্পেন ক্ল্যাসিকো আজ
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, কানসাস সিটি থেকে
প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:০২
বিশ্বকাপের মহাকাব্যিক রণাঙ্গনে যখনই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইউরোপীয় দর্শন মুখোমুখি হয়, তখন মাঠের সীমানা ছাপিয়ে এক আদিম ও ধ্রুপদি আভিজাত্যের লড়াই শুরু হয়। আজ ডালাসে তেমনই এক সেমিফাইনালের লড়াইয়ে মুখোমুখি ইউরোপের দুই মুকুটধারী সাম্রাজ্য– ফ্রান্স আর স্পেন। এটি শুধু বিশ্বকাপের একটি সেমিফাইনাল নয়, এ হলো ফুটবল দর্শকের কাছে আন্তর্জাতিক ‘এল ক্ল্যাসিকো’! যেন লা লিগার সেই চিরন্তন বার্সা-রিয়াল যুদ্ধবিগ্রহের এক অতিজাগতিক আন্তর্জাতিক সংস্করণ! একদিকে এমবাপ্পের ছায়ায় বার্নাব্যুর রাজকীয় দাপট আর অহংকার, অন্যদিকে ন্যু ক্যাম্পের নিখুঁত শিল্পকলা ইয়ামালের পায়ে– আজ নতুন মহাকাব্য লিখতে বুঁদ হয়ে আছে সবাই। ফ্রান্স এগোচ্ছে তার সাবেক চ্যাম্পিয়নের মেজাজেই, আর স্পেন নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনা নিয়ে। ডালাসের এই থিয়েটারে শেষ বাজি কার, তা নিয়ে ভবিতব্য করার দুঃসাহস বোধ হয় কারোরই নেই!
প্যারিস আর মাদ্রিদের এই মহারণ আসলে এক মানসিক অভিঘাত। দুই দলের অতীত ইতিহাস বলে, যখনই তারা মুখোমুখি হয়েছে, তখনই কোনো না কোনো রাজকীয় প্রতিস্পর্ধা দেখেছে বিশ্ব। শতবর্ষ প্রাচীন এই ফুটবল দ্বৈরথে প্রীতি ম্যাচ এবং অফিসিয়াল প্রতিযোগিতা মিলিয়ে দুই দল এ পর্যন্ত ৩৮ বার মুখোমুখি হয়েছে। স্পেন আঠারো, ফ্রান্স তেরোটিতে জয়। ইউরোর মঞ্চে এ দুই পরাশক্তির রেষারেষির ইতিহাস বড্ড নাটকীয়। ১৯৮৪ সালের ইউরো ফাইনালে স্পেনকে হারিয়ে ফ্রান্সের সেই প্রথম খেতাব জয় যেমন ফরাসি ফুটবলের এক কালজয়ী স্ফুরণ, তেমনই ২০১২ সালের ইউরো কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সকে ছিটকে দিয়ে স্পেনের সেই মধুর প্রতিশোধ ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে আজও দগদগে।
তবে ২০২৪ সালের ইউরো সেমিফাইনালে ফ্রান্সের ওই নিরেট রক্ষণাত্মক তেজকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ২-১ গোলে স্পেনের সেই জয় ফরাসি শিবিরে এক ট্র্যাজেডি ডেকে এনেছিল, যার ক্ষত ফরাসিরা আজও ভোলেনি। কিংবা গেল বছরের নেশনস লিগ, যেখানে ৫-৪ গোলের রোমাঞ্চকর ম্যাচটি জিতে নিয়েছিল স্পেন। গত তিন বছরে তিন-তিনবার স্পেনের এই জাদুকরি জৌলুসের কাছে মাথা নোয়াতে হয়েছে ফরাসি তেজকে। স্প্যানিশদের সেই অহংকার এবার মাটিতে নামাতে চাইবে ফ্রান্স। তার জন্য বিশ্বকাপের এই বড় মঞ্চে অপেক্ষা করে আছেন এমবাপ্পেরা।
তবে বর্তমান পারফরম্যান্সের পাতা ওল্টালে দেখা যাবে, এবারের বিশ্বকাপে দুই দলই এক ভিন্ন রূপকথার জন্ম দিচ্ছে। কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোকে ২-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে ফ্রান্স যেমন তাদের ইস্পাতকঠিন রক্ষণ আর এমবাপ্পে-দেম্বেলে জুটির বিধ্বংসী আক্রমণের ধার প্রমাণ করেছে, উল্টোদিকে স্পেনও তাদের নিখুঁত ‘তিকিতাকা’র জৌলুসে প্রতিপক্ষকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে সেমিফাইনালের টিকিট কেটেছে। দুই দলের এই সমানে সমানে টক্করে একদিকে যেমন রয়েছে ফ্রান্সের টানা তৃতীয় ফাইনাল ছুঁয়ে নতুন ইতিহাস গড়ার তীব্র তেজ, অন্যদিকে রয়েছে স্পেনের তরুণ তুর্কিদের বিশ্বমঞ্চে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার মায়াবী জৌলুস।
ট্যাকটিক্যাল ময়নাতদন্তে বসলে মনে হবে, এ তো ফুটবল নয়; এ যেন মহাকাশের এক আদিম সংঘাত, যেখানে স্পেনের চোখধাঁধানো ‘সুপারনোভা’ আছড়ে পড়ছে ফ্রান্সের অভেদ্য ‘ব্ল্যাকহোল’-এর ওপর! দে লা ফুয়েন্তের স্প্যানিশ আর্মাডার সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের মাঝমাঠের ওই জাদুকরি জ্যামিতি, যার মূল কারিগর রদ্রি। এই ছেলেটার পাসিংয়ের নিখুঁত টাইমিং যেন ঘড়ির কাঁটা, যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উইংয়ে লামিনে ইয়ামাল আর নিকো উইলিয়ামস প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে ফালি ফালি করে কাটে। কিন্তু এখানেই লুকিয়ে তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা– রিয়ালের কারভাহাল আর আতলেতিকোর ল্য নরমঁদের অনুপস্থিতিতে স্প্যানিশ রক্ষণ আজ বড্ড খেলো, যা সামান্য একটু কাউন্টার অ্যাটাকের ঝাঁজেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, ফ্রান্সের ইস্পাতকঠিন স্থিতপ্রজ্ঞতা। উইলিয়াম সালিবা ও দায়ো উপামেকানো জুটি এবারের আসরে ফ্রান্সের ডিফেন্স শক্ত করে ধরে আছে। তাদের জমাট পারফরম্যান্সের কারণে ফ্রান্স পুরো টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি গোল হজম করেছে। স্পেনের বিপক্ষে মেগা সেমিফাইনালের আগে ফরাসি শিবিরে কিছুটা ইনজুরি আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সালিবা টুর্নামেন্টজুড়েই পিঠের সমস্যায় ভুগছেন এবং উপামেকানো পায়ের ব্যথায় শনিবারের অনুশীলনে যোগ দিতে পারেননি। তবে মেডিকেল টিম আশা করছে, সেমিফাইনালের হাইভোল্টেজ ম্যাচে তারা দুজনেই মাঠে নামতে পারবেন। রক্ষণের মতো ফরাসি আক্রমণও তলোয়ারের মতো ধারালো। এক অবাধ্য, প্রমত্ত স্ফুরণ আছে তাতে। তাদের বিধ্বংসী রণকৌশলের প্রধান সেনাপতি স্বয়ং কিলিয়ান এমবাপ্পে।
রিয়াল মাদ্রিদের এই নতুন গ্যালাকটিকো যখন বাঁ দিক ধরে বল পায়ে চিতার গতিতে এগোন, তখন মনে হয় ফরাসি ‘রাফাল’ কামান থেকে কোনো বিধ্বংসী গোলা ছিটকে বেরোল। এমবাপ্পের এই তেজের সমান্তরালে ফ্রান্সের ডান উইংয়ে যিনি ছটফট করছেন, তাঁর নাম উসমান দেম্বেলে। তাঁর বল কন্ট্রোল আর ড্রিবলিংয়ের জৌলুস যেন ক্যানভাসে ক্লদ মনের সেই বিখ্যাত আলো-ছায়ার খেলা! তিনি যখন উইং ধরে ক্ষিপ্রগতিতে বক্সে ঢোকেন, বিপক্ষের বাঘা বাঘা ডিফেন্ডারের তখন স্রেফ ত্রিশঙ্কু অবস্থায় ঝুলতে হয়। দুজনে মিলে এ পর্যন্ত মোট ১৩টি গোল করেছেন, যার মধ্যে আটটি এমবাপ্পের, বাকি পাঁচটি দেম্বেলের। ২০০২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের রোনাল্ডো ও রিভালদোর পর এমবাপ্পে-দেম্বেলে জুটিই প্রথম একই দেশের সতীর্থ হিসেবে কোনো একক বিশ্বকাপে পাঁচ বা তার বেশি গোল করার অনন্য রেকর্ড স্পর্শ করেছেন।
ম্যাচটা শুরু হওয়ার আগেই অবশ্য ড্রেসিংরুমের দেয়াল ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক কামড়াকামড়ি। স্প্যানিশ শিবিরের বিস্ময়-বালক ইয়ামাল যখন বুক চিতিয়ে হুঙ্কার ছাড়েন, ‘ইউরোতে তো ওদের আমরাই বিদায় করেছিলাম, ভয় পাওয়ার হলে ফ্রান্সই আমাদের ভয় পাক’– তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে মাদ্রিদের রক্তে এখন অহংকারের চোরা স্রোত! ফরাসি ডিফেন্ডার ইব্রাহিম কোনাতেও অবশ্য পাল্টা ফিরিয়ে দিতে ছাড়েননি। অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় মনে করিয়ে দিয়েছেন যে দিদিয়ের দেশমের ছেলেরা কোনো ফাঁদে পা দিতে রাজি নয় এবং মাঠের ফয়সালা মাঠেই হবে। এই বাগ্যুদ্ধের আবহেই ঘৃতাহুতি দিয়েছেন বিখ্যাত কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গার তাঁর স্পষ্ট পর্যবেক্ষণে, শক্তিতে ফ্রান্স এগিয়ে থাকলেও এই টুর্নামেন্টে স্পেনই একমাত্র দল, যারা নিজেদের নিখুঁত পাসিং ফুটবল দিয়ে ফরাসি সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ, বল গড়ানোর আগেই কথার তূণ থেকে তীর ছিটকে গেছে। এখন দেখার, কার তীর কার বুকে গিয়ে বিঁধবে!
- বিষয় :
- বিশ্বকাপ ফুটবল
- ফ্রান্স
- স্পেন