ছিয়াশির আয়নায় ছাব্বিশের মেসি
ছবি- এএফপি
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, আটলান্টা থেকে
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩৯
অবিশ্বাস এতটাই তীব্র, আর্জেন্টিনার ওপেন অনুশীলন কভার করতে যাওয়া এক ইউরোপিয়ান সাংবাদিককেও আড় চোখে দেখে তারা। না, ভদ্রলোক ব্রিটিশ নন; তারপরও তাঁকে ঘিরে বুয়েনস আইরেসের মিডিয়াকর্মীদের মধ্যে ফিসফিসানি আর কানাঘুষা। খোঁজ নেন, তিনি ইংল্যান্ডের হয়ে গোয়েন্দাগিরি করতে এসেছেন কিনা? একই সন্দেহ কি স্কালোনিদের মধ্যেও! তা না হলে কেন কানসাসের ওপেন সেশনেও মেসিকে ক্যামেরা খুঁজে পায় না। তিনি কেন নামেন সবাই চলে যাওয়ার পর। এই তীব্র সাইকোলজিক্যাল প্রেশার আর অদ্ভুত সন্দেহবাতিক মানসিকতাকে অবশ্য জনসমক্ষে স্রেফ পেশাদারিত্বের চাদরে চাপা দিয়ে রাখতে চাইছেন আর্জেন্টাইন কোচ। বারবার প্রেস কনফারেন্সে এসে তোপ দাগছেন, ‘ইংল্যান্ডের সঙ্গে আমরা শুধুই একটা ফুটবল ম্যাচ খেলতে নামছি। দয়া করে এখানে অন্য কিছু জড়াবেন না।’
কিন্তু মুখের কথায় চাপা দিলেই কি ভেতরের সেই রক্তক্ষরণ কমে? স্কালোনি নিজে কি পারছেন ফকল্যান্ডের সেই অলীক ভূতকে ড্রেসিংরুম থেকে তাড়িয়ে দিতে? তারা নিজেরাই তো এখন ডুবে আছেন ফুটবলের বাইরের এক অদ্ভুত কুসংস্কার আর মনস্তাত্ত্বিক গোলকধাঁধায়! খবরের ভেতরের খবর হলো, এরই মধ্যে নাকি ফিফার সদরদপ্তরে বিশেষ আবেদন পাঠিয়েছে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। আর্জি একটাই– আটলান্টার সেমিফাইনালে যেন তাদের অ্যাওয়ে ম্যাচের গাঢ় নীল জার্সিটাই পরতে দেওয়া হয়। যদিও ইংল্যান্ড এই সেমির ‘হোম’ টিম বলে আর্জেন্টিনা অ্যাওয়ে জার্সিটাই পাবে। ইতিহাস সাক্ষী, অতীতে এই গাঢ় নীল জার্সি গায়ে জড়িয়েই ছিয়াশির বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে মাটিতে নামিয়েছিলেন ম্যারাডোনা। আটানব্বইয়েও বেকহামরা কেঁদেছিলেন এই নীল জার্সির কাছেই। গোটা আর্জেন্টিনা আজ বুক বেঁধে তাকিয়ে আছে এক অলৌকিক মহাকাব্যের আশায়, তারা মার্সিডিজ বেঞ্জের সবুজগালিচায় মেসির শান্ত ছায়ার ভেতরে ছিয়াশির সেই অবিনশ্বর, হিংস্র ও বিদ্রোহী ম্যারাডোনাকে ফিরে দেখতে চায়!
সেদিন সেই ছিয়াশির ২২ জুন মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামে যখন বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হলো আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ড, তখন মাঠের ঘাস আর চকলাইনের সীমানা স্রেফ মুছে গিয়েছিল। ম্যারাডোনার জোড়া গোলে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে ইংল্যান্ডকে পরাজিত করেছিল। সেই ম্যাচে ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলটি নিয়ে আজও বিতর্ক করে ইংলিশরা। তাঁর দ্বিতীয় গোলটির স্বীকৃতিও দিতে চান না। মাত্র ১০ সেকেন্ডে ৬০ গজ দৌড়ে, ৪৪টি পায়ে ছোঁয়া আর ৫ জন ইংরেজ ডিফেন্ডারকে ড্রিবলিংয়ের মায়াজালে বোকা বানিয়ে করা ম্যারাডোনার দ্বিতীয় গোলটিকেই পরে ফিফা ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ম্যারাডোনা তাঁর আত্মজীবনীতে পরে স্বীকার করেছিলেন, ‘ম্যাচের আগে আমরা মুখে বলেছিলাম, ফুটবলের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক নেই; কিন্তু ওটা ছিল ডাহা মিথ্যা! আমরা ভালো করেই জানতাম, ওরা আমাদের দেশের ছোট ছেলেদের পাখির মতো গুলি করে মেরেছে। এটি ছিল আমাদের প্রতিশোধের মঞ্চ।’
ছিয়াশিতে দিয়েগোর পাশে যেমন কোনো বিশ্বমানের ডিফেন্সের দেয়াল ছিল না, ঠিক তেমনি ছাব্বিশের এই আর্জেন্টিনা দলও নকআউটে প্রতি ম্যাচে গোল হজম করে এক নড়বড়ে কূটাভাসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। স্কালোনির এই ডিফেন্সের ফাটল বুজিয়ে হ্যারি কেইন-বেলিংহামদের আটকাতে মেসির পায়ে আজ স্রেফ শান্ত পরিশীলিত ব্যাকরণ থাকলে চলবে না; সেখানে ফিরিয়ে আনতে হবে ছিয়াশির সেই আদিম, হিংস্র ও চতুর ঔদ্ধত্যকে। ম্যারাডোনা যেমন একাই বদলে দিয়েছিলেন এক দেশের জাতীয় অবদমন, জীবনের শেষ লগ্নে এসে আজ মেসিকেও হতে হবে সেই রূপান্তরের জাদুকর।
তা না হলে ম্যারাডোনাকে যেমন তারা ‘প্রতারক’ বলে সান্ত্বনা খুঁজে বেরিয়েছে, তেমনি মেসিকেও তারা ‘অতিরঞ্জিত’ আখ্যা দেবে। পুরো বিশ্ব এফোঁড়-ওফোঁড় করে প্রায় ৬৫ দেশের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার পরও ইংল্যান্ডের সঙ্গে কোনো ম্যাচ খেলা হয়নি তার। আজ সেই কাঙ্ক্ষিত সুযোগটি এসেছে। আসলে ইংরেজরা মনে করে, ফুটবল তাদের ঘরের ছেলে; ব্যাকরণ আর যান্ত্রিক সুশৃঙ্খলতাই শেষ কথা। লাতিন আমেরিকার যে ‘ক্রিওলো (দেশি ফুটবল)’ জাদু, যা ব্যাকরণ মানে না, যা স্রেফ পায়ের ড্রিবলিংয়ে প্রতিপক্ষকে বোকা বানিয়ে এক আদিম আনন্দ খোঁজে– সেই নান্দনিক স্পর্ধাকে মেনে নেয়নি তারা। তাই আজ এই ম্যাচ অনেক কিছু প্রমাণের আছে তাঁর এবং হারানোর ঝুঁকিও আছে। হারলেই যে আজীবন কথা শুনতে হবে– ইংল্যান্ডের সঙ্গে বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ খেলেছিলেন লিওনেল মেসি। সেটি নিশ্চয়ই বাকি জীবনে বয়ে বেড়াতে চাইবেন না মেসি।