ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১৮ উইকেটে ম্যাকাইয়ে রোমাঞ্চের প্রথম দিন

১৮ উইকেটে ম্যাকাইয়ে রোমাঞ্চের প্রথম দিন
×

ছবি- ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া

স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ১৩:৫০ | আপডেট: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ১৪:১৮

ম্যাকাই টেস্টের প্রথম দিনটা বাংলাদেশের জন্য শুরু হয়েছিল দুঃস্বপ্নের মতো। মিচেল স্টার্কের বিধ্বংসী বোলিংয়ে মাত্র ৬৪ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ। তবে সেই ধাক্কা সামলে দিনের শেষ ভাগে বল হাতে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে সফরকারীরা। বাংলাদেশকে লড়াইয়ে রেখেছেন মূলত শরিফুল ইসলাম। ব্যাট হাতে দলের সর্বোচ্চ ১৪ রান করার পর বল হাতে এরই মধ্যে ৬ উইকেট নিয়েছেন বাঁহাতি পেসার। তাসকিন আহমেদ ও মেহেদী হাসান মিরাজ নিয়েছেন একটি করে। অস্ট্রেলিয়াও দিন শেষ করেছে ৮ উইকেট হারিয়ে ১৬৫ রানে। ফলে প্রথম দিনেই পড়েছে ১৮ উইকেট। গত ৫১ বছরে অস্ট্রেলিয়ার মাঠে প্রথম দিনে তৃতীয় সর্বোচ্চ উইকেটের রেকর্ড এটি।

দিন শেষে অস্ট্রেলিয়ার লিড ১০১ রান। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে এখনও লড়াই করছেন ক্যামেরন গ্রিন। ৮১ বলে ৫১ রানে অপরাজিত এই অলরাউন্ডারকে সঙ্গ দিচ্ছেন নাথান লায়ন (১০)।

স্টার্কের তাণ্ডবে শুরু

টস জিতে বাংলাদেশকে ব্যাটিংয়ে পাঠিয়ে শুরুতেই সিদ্ধান্তের যথার্থতা প্রমাণ করেন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স। ম্যাচের প্রথম বলেই সাদমান ইসলামকে ফিরিয়ে দেন মিচেল স্টার্ক। ব্যাটের কানায় লেগে বল চলে যায় স্লিপে ক্যামেরন গ্রিনের হাতে। গোল্ডেন ডাক নিয়ে ফিরতে হয় বাংলাদেশের ওপেনারকে।

ছবি- এএফপি

পরের ওভারেই ডারউইন টেস্টের সেঞ্চুরিয়ান তানজিদ হাসান তামিমকেও শূন্য রানে ফেরান স্টার্ক। এরপর নাজমুল হোসেন শান্তও টিকতে পারেননি। লেগ স্টাম্পের দিকে বেরিয়ে যাওয়া বলে প্যাডে আঘাত হানলে আম্পায়ার আউট দেন। রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি বাংলাদেশ অধিনায়ক। আম্পায়ার্স কলের কারণে বহাল থাকে সিদ্ধান্ত।

মুমিনুল হক ১৬ বলে ৯ রান করে স্টার্কের তৃতীয় শিকার হন। এরপর লিটন দাসকে প্রথমবার স্লিপে ক্যাচ দিয়েও জীবন পেয়ে যান। তবে পরের বলেই এলবিডব্লিউ হয়ে ফেরেন তিনি। রিভিউ নিয়ে সফল হয় অস্ট্রেলিয়া। মাত্র ১২ রানেই ৫ উইকেট হারিয়ে তখন ভয়াবহ বিপর্যয়ে বাংলাদেশ।

মুশফিক-মিরাজের চেষ্টা, শেষ দিকে স্বস্তি

বিপর্যয় সামলানোর চেষ্টা করেন মুশফিকুর রহিম ও মেহেদী হাসান মিরাজ। কিন্তু প্যাট কামিন্সের ভেতরে ঢোকা বলে ব্যাট-প্যাডের ফাঁক গলে বোল্ড হন মুশফিক। ৪২ বলে করেন ৫ রান।

লাঞ্চের আগে আর কোনো উইকেট না হারিয়ে ৬ উইকেটে ৩৫ রান নিয়ে বিরতিতে যায় বাংলাদেশ। বিরতির পর দ্রুতই ফিরে যান মিরাজ ও হাসান মাহমুদ। কামিন্সের বলে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে ৫১ বলে ১১ রান করেন মিরাজ। পরে হ্যাজলউডের বলে নাথান লায়নের হাতে ক্যাচ দেন হাসান। তার ব্যাট থেকে আসে ৩৬ বলে ১০ রান।

ছবি- এএফপি

তখন বাংলাদেশের সংগ্রহ ৮ উইকেটে ৩৮ রান। শঙ্কা জাগে, ২০১৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে করা ৪৩ রানের সর্বনিম্ন স্কোরও বুঝি এবার ছাড়িয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত সেই লজ্জা এড়ায় বাংলাদেশ। তাইজুল ইসলাম ও শরিফুল ইসলাম দশম উইকেটে ২৫ রান যোগ করেন, যা হয়ে ওঠে ইনিংসের সর্বোচ্চ জুটি। শরিফুল ১৯ বলে ১৪ রান করে ফিরলেও তাইজুল ২৬ বলে ১১ রানে অপরাজিত থাকেন। ৩৪ ওভারে ৬৪ রানে থামে বাংলাদেশের ইনিংস।

স্টার্ক ১০ ওভারে ৬ মেডেনসহ মাত্র ১২ রান দিয়ে নেন ৬ উইকেট। কামিন্সের শিকার ৩টি এবং হ্যাজলউড নেন একটি।

ছবি- এএফপি

জবাবে তাসকিন-শরিফুলের আঘাত

৬৪ রানের জবাবে ব্যাটিংয়ে নেমে অস্ট্রেলিয়াও স্বস্তিতে থাকতে পারেনি। তৃতীয় ওভারে ম্যাট রেনশকে ফিরিয়ে প্রথম সাফল্য এনে দেন তাসকিন আহমেদ। তিন বছরের বেশি সময় পর টেস্টে ফিরে ১০ বলে ৮ রান করেন রেনশ।

ছবি- এএফপি

এরপর শরিফুল ইসলামের পালা। ট্রাভিস হেডকে ২২ রানে বোল্ড করে প্রথম আঘাত হানেন তিনি। একই ওভারে মার্নাস লাবুশেনকেও বোল্ড করে অস্ট্রেলিয়ার টপ অর্ডারে ধস নামান বাঁহাতি এই পেসার। ৯ বলে ৪ রান করেন লাবুশেন।

চা বিরতিতে ৩ উইকেটে ৫০ রান নিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। এরপর স্টিভেন স্মিথ ও ক্যামেরন গ্রিন মিলে প্রতিরোধ গড়েন। চতুর্থ উইকেটে দুজন যোগ করেন ৭৭ রান। কিন্তু নতুন স্পেলে ফিরে শরিফুল সেই জুটি ভেঙে দেন।

৭৪ বলে ৪২ রান করে এলবিডব্লিউ হন স্মিথ। এরপর অ্যালেক্স ক্যারিকে নিজের প্রথম ওভারেই ফেরান মিরাজ। ৮ বলে ৫ রান করে ফিরতে হয় অস্ট্রেলিয়ান উইকেটরক্ষককে।

ছবি- এএফপি

শরিফুলের ঝড়ে অস্ট্রেলিয়ায় ধস

এরপর যেন শরিফুলের একক আধিপত্য। নতুন স্পেলে ফিরে ৩২তম ওভারে প্রথম বলে ওয়েবস্টারকে এলবিডব্লিউ করেন তিনি। রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি ওয়েবস্টার।

ওভারের পঞ্চম বলে শর্ট ডেলিভারিতে প্যাট কামিন্সকে চমকে দেন শরিফুল। বল গ্লাভসে লেগে উঠে গেলে লিটন দাস সহজেই ক্যাচ নেন। রানের খাতা খোলার আগেই ফেরেন অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক। তাতেই টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন শরিফুল।

ছবি- ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া

পরের ওভারেই মিচেল স্টার্ককে বোল্ড করে নিজের শিকার সংখ্যা ছয়ে নিয়ে যান তিনি। অফ স্টাম্পের ওপরের ডেলিভারি পিচে পড়ে সোজা হয়ে স্টার্কের স্টাম্প উড়ে যায়। ৬ বলে ১ রান করে ফেরেন স্টার্ক। শেষ পর্যন্ত দিন শেষে অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ ৮ উইকেটে ১৬৫ রান। শরিফুলের ছয় উইকেটের পাশাপাশি তাসকিন ও মিরাজ নেন একটি করে। তবে ক্যামেরন গ্রিন এখনো অস্ট্রেলিয়ার আশার জায়গা। ৮১ বলে ৫১ রানে অপরাজিত তিনি। সঙ্গে আছেন নাথান লায়ন।

ছবি- এএফপি

প্রথম দিনেই রেকর্ডের ছড়াছড়ি

ম্যাকাইয়ের গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায় এটিই প্রথম টেস্ট। আর সেই টেস্টের প্রথম বলেই উইকেট নিয়ে মাঠটির ইতিহাসে প্রথম উইকেটশিকারি হয়ে গেলেন স্টার্ক। অন্যদিকে প্রথম বলেই আউট হওয়া ব্যাটার হিসেবে রেকর্ডে নাম উঠেছে সাদমানের।

স্টার্ক আরও একটি বড় কীর্তি গড়েছেন। মাত্র ২২ বলে পাঁচ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্টে সবচেয়ে কম বলে ফাইফার নেওয়ার রেকর্ড গড়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে টেস্টে এটি তার ১৯তম পাঁচ উইকেটের ইনিংস।

দিনের শেষ ভাগে অবশ্য সব আলো কেড়ে নিয়েছেন শরিফুল। প্রথম ইনিংসে দলের সর্বোচ্চ ১৪ রান করার পর বল হাতে ৬ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশকে ম্যাচে ফিরিয়ে এনেছেন তিনি। দুইয়ে মিলে টেস্ট ইতিহাসে নতুন কীর্তি গড়েছেন শরিফুল ইসলাম। দীর্ঘ টেস্ট ইতিহাসে আর কোনো ক্রিকেটার একই ম্যাচে ১১ নম্বরে নেমে দলের সর্বোচ্চ রান ও বল হাতে ৫ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব দেখাতে পারেননি। 

প্রথম দিন শেষে তাই ম্যাচের সমীকরণ পুরোপুরি অস্ট্রেলিয়ার নিয়ন্ত্রণে নেই। ১০১ রানে পিছিয়ে থাকলেও বাংলাদেশের সামনে এখন অস্ট্রেলিয়ার বাকি দুই উইকেট দ্রুত তুলে নিয়ে ম্যাচের ব্যবধান যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার সুযোগ।

আরও পড়ুন

×