ঊনপঞ্চাশ ট্রফি, চেনা রূপে মেসি
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪:৫৫
সেই একই রকম আকুলতা, সেই একুশ বছরের দীর্ঘ পথচলার পর অর্জিত সাফল্যের সেই আদি ও অকৃত্রিম আনন্দ। গোল করার পর এখনও তিনি সেই পুরোনো সতীর্থ সুয়ারেজকে জড়িয়ে ধরে মাটিতে বসে পড়েন অবিকল শিশুর মতো। আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় দিলেও ফুটবল যে এখনও তাঁর হৃদযন্ত্রের প্রতিটি স্পন্দনে স্পন্দিত, ইন্টার মায়ামির হয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার ম্যাক্সিকান ক্লাব ক্রুজ আজুলকে ২-০ গোলে হারিয়ে ক্যাম্পেওন্স কাপের শিরোপা জিতে সেটাই যেন আরেকবার সবাইকে দেখিয়ে দিলেন লিওনেল মেসি। ক্যারিয়ারে ঊনপঞ্চাশতম এবং মায়ামির হয়ে এই পঞ্চম শিরোপা জয়ের রাতে আরও একবার তিনি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিলেন সব পরিসংখ্যানকে। চলে গিয়েও তিনি রয়ে গেলেন, কারণ মেসির আনন্দেই যে আজও বেঁচে থাকে ফুটবল ভুবনের আসল রোমাঞ্চ!
না, এটা কোনো লুসাইলের বিশ্বকাপজয়ী জাদুকরি রাত নয়। নয় কোনো উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের আভিজাত্যে মোড়া রাজকীয় মঞ্চ, কিংবা লা লিগার সেই অতি পরিচিত ট্রফির লড়াই। নেহাতই মেক্সিকো আর যুক্তরাষ্ট্রের লিগজয়ী দুই দলের মধ্যকার এক ক্যাম্পেওন্স কাপের শিরোপা! অনেকেই হয়তো একে স্রেফ এক সাধারণ ট্রফি বলে নাক সিঁটকাতে পারেন। কিন্তু দিন শেষে ট্রফিটা যখন লিওনেল আন্দ্রেস মেসির বুকে গিয়ে আছড়ে পড়ে, তখন যেন সাধারণ সেই ট্রফিও স্বর্ণের চেয়ে দামি হয়ে ওঠে। আসলে ট্রফির ওজন দিয়ে কোনো দিনই এই মানুষটাকে মাপা যায়নি। ২১ বছরের ক্যারিয়ারে ৪৯তম শিরোপা জয়ের পর তাঁর চোখের সেই অকৃত্রিম আনন্দ– সবটাই এক চিরন্তন সত্যের দলিল। না হলে ঊনচল্লিশ বছর বয়সের এক মহাতারকা কীভাবে এখনও উনিশের সেই অদম্য, আদিম মনটা নিয়ে সবুজ ঘাসে ফুল ফুটিয়ে যান!
মায়ামির মাঠে আজুলের বিপক্ষে এই ফাইনালে তিনি যা করলেন, তা কোনো সাধারণ ফুটবলারের সাধ্যি নয়। ম্যাচের ২৪ মিনিটে যখন লুইস সুয়ারেজ মাপা ক্রসটি বাড়ালেন, মেসি কোনো বাঁ পায়ের জাদুতে নয়, বরং শরীরটাকে বাতাসে ভাসিয়ে এক অবিশ্বাস্য হেডে বল জালে জড়ালেন! মায়ামির নতুন নু স্টেডিয়ামের গ্যালারি তখন উদ্বেলিত, কারণ চোখের পলকে এটি হয়ে গেল ইন্টার মায়ামির গোলাপি জার্সিতে এই জাদুকরের ‘১০০তম’ রাজকীয় গোল! মায়ামির হয়ে মাত্র ১১৫ ম্যাচে এই মাইলফলক স্পর্শ করেছেন মেসি, যা তাঁর ক্যারিয়ারে যে কোনো দলের হয়ে দ্রুততম শততম গোল করার রেকর্ড। এর আগে বার্সেলোনার হয়ে ১৮৮ ম্যাচ এবং আর্জেন্টিনার হয়ে ১৭৪ ম্যাচে গোলের সেঞ্চুরি করেছিলেন। কিন্তু গল্পটার সেখানেই শেষ ছিল না। একা জেতার চেয়ে সতীর্থদের জেতাতেই যে তিনি বেশি ভালোবাসেন। ম্যাচের ৮১ মিনিটে মেসির কর্নার কিক থেকে ক্যাসেমিরো হেডে বল জালে জড়াতে বিন্দুমাত্র ভুল করেননি। একটি চোখ ধাঁধানো গোল আর একটি নিখুঁত মাস্টারক্লাস অ্যাসিস্ট– ২-০ ব্যবধানের এই জয়ে মেসি আরও একবার প্রমাণ করলেন, ফুটবল মাঠে তিনি রচয়িতা, বাকিরা তাঁর নাটকের একেকটি চরিত্র!
ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজতেই যখন নু স্টেডিয়ামের আকাশজুড়ে আতশবাজির রোশনাই, মায়ামির নতুন ডাগআউটে তখন এক অদ্ভুত আবেগের কোলাহল। মায়ামির নতুন আর্জেন্টাইন কোচ ক্রিস্টিয়ান গঞ্জালেস আবেগ ধরে রাখতে না পেরে প্রকাশ করেই ফেললেন এক পরম গোপন কথা। ‘লিও আমাকে কথা দিয়েছিল ও আমাকে চ্যাম্পিয়ন করবে। ও নিজের কথা রেখেছে।’
অন্যদিকে মেসির দীর্ঘদিনের ছায়াসঙ্গী রদ্রিগো ডি পল যেন পুরো ফুটবল বিশ্বের হয়েই এক চিরন্তন আকুতি আউড়ে গেলেন। ‘লোকে মেসির এই অতিমানবীয় পারফর্ম করাটাকে এখন স্বাভাবিক নিয়মে ধরে নিয়েছে, কিন্তু বিশ্বাস করুন– এটা মোটেও স্বাভাবিক নয়। আমাদের স্রেফ চোখ ভরে ওকে উপভোগ করা উচিত, ও প্রতিটি ম্যাচকে কতটা ভালোবেসে খেলে তা মন দিয়ে দেখা উচিত।’ আন্তর্জাতিক মঞ্চের সব চাপ আর প্রত্যাশার চাপ মারিয়ে মেসি এখন কেবলই আনন্দের এক মুক্ত বিহঙ্গ।
- বিষয় :
- লিওনেল মেসি