‘আমি আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি’
ছবি- এএফপি
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | ১৫:০০
২১ বছরের এক অলৌকিক পথচলা শেষে লিওনেল মেসি যখন নীল-সাদা জার্সিটাকে চিরতরে তুলে রাখার ঘোষণা দিলেন, তখন তা কেবল একটা আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ছিল না; ওটা ছিল একটা গোটা প্রজন্মের শৈশব আর লালিত স্বপ্নের রাজকীয় বিসর্জন। বাবার স্মৃতি, বিশ্বজয়ের মেঘলা আবেগ আর কোটি ভক্তের ভালোবাসার ঋণ মাথায় নিয়ে জাদুকরের সেই বুকফাটা শেষ আকুতি যেন এক অনন্ত হাহাকার। মাঠের সবুজগালিচাকে আর্জেন্টিনার হয়ে চিরদিনের মতো বিদায় জানানোর সেই ঐতিহাসিক ক্ষণে মেসির কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়া প্রতিটি শব্দ যেন বিষাদের একেকটা নীল পদ্ম, মেসির সেই বিদায়ী ভাষণ তুলে ধরা হলো পাঠকদের জন্য...
“আজ কিছু বলা সত্যিই খুব কঠিন; মনে কত আবেগ, কত স্মৃতি যে ভেসে উঠছে! প্রথমেই যার কথা মনে পড়ছে, তিনি আমার বাবা। আমার বিদায়ী চিঠিতে যা বলেছিলাম, আজও ঠিক তা-ই বলব– আমার কেবল কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ভাষাই আছে। ২০ বছরের বেশি সময় ধরে এই জার্সি পরা আমার জন্য অনেক বড় সম্মানের ব্যাপার ছিল। আমরা যেসব কঠিন ও খারাপ মুহূর্তের মুখোমুখি হয়েছি, সেগুলোতেও আমি কখনও লড়াই থামাইনি, নিজের শতভাগ দেওয়া বন্ধ করিনি এবং দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিইনি। আর কখনও ফিরে আসতে না পারাটা আমার জন্য এক বিশাল কষ্টের কারণ হতে যাচ্ছে। ইচ্ছা হয় জীবনের বাকিটা সময় বারবার এখানেই ফিরে আসি; কারণ আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে খেলার চেয়ে সুন্দর আর কোনো অনুভূতি এই দুনিয়ায় হতে পারে না। যদিও আমি চিরকাল এখানেই থেকে যেতে চাই, কিন্তু এটাই উপযুক্ত সময় বিদায় নেওয়ার। শেষ বিশ্বকাপটি আমার ওপর দিয়ে অনেক বড় চাপ ফেলেছিল। আমরা আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম। আমরা এত কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম, কিন্তু সত্যি বলতে কি অসাধারণ কিছু ঘটেনি। আমরা আমাদের সবটুকু দিয়েছিলাম, বিশেষ করে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচটি শারীরিক ও মানসিকভাবে আমাদের প্রচণ্ডভাবে নিংড়ে নিয়েছিল। সত্যি বলতে, ফাইনালের জন্য আমরা কোনোমতে টিকে ছিলাম। কিন্তু আমরা সব সময় যেভাবে এই জার্সির জন্য লড়াই করি, আমার সতীর্থদের সঙ্গে নিয়ে আমি ঠিক সেভাবেই লড়াই চালিয়ে গেছি সেদিন। এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ রাখবেন না যে এই জার্সির জন্য আমার পাশে থাকা প্রত্যেক সতীর্থ সব সময় তাদের সর্বোচ্চটা উজাড় করে দিয়েছিল কিনা তা নিয়ে।
আমি আমার সতীর্থদের ধন্যবাদ জানাতে চাই এই দলের সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্তের জন্য, যারা আমাকে আমার শৈশবের স্বপ্ন পূরণ করতে সাহায্য করেছে– বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া, কোপা আমেরিকা জয় করা, ফিনালিসিমা জয় করা এবং আমরা যত প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি, তার সবকটিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়া। মাঠ ও মাঠের বাইরে তাদের সঙ্গে এই সবুজগালিচা ভাগ করে নেওয়া আমার জন্য অনেক বড় আনন্দের ও সম্মানের বিষয় ছিল। আমি যে কারও বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। কারণ আমি জানতাম, আমার পাশে এমন সব যোদ্ধা রয়েছে, যারা দলের জন্য নিজেদের প্রাণ দিয়ে দেবে।
এখানে ফুটবল খেলাটাকে আমি খুব বেশি মিস করব। দেশের প্রতিটি প্রান্তে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ আমার হয়েছিল এবং সব জায়গা থেকেই আমি মানুষের অপরিসীম ভালোবাসা পেয়েছি। আমি যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি, তার প্রতিটি মুহূর্তের জন্য আমি কৃতজ্ঞ। সেটি যে কোনো ম্যাচেই হোক না কেন; বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা... যে কোনো খেলাতেই গ্যালারিগুলো কানায় কানায় পূর্ণ থাকত এবং আপনারা সব জায়গায় পৌঁছে যেতেন– এটি কত কঠিন, তা জানা সত্ত্বেও আপনাদের এই বিপুল সমর্থনের জন্য আমি চিরকৃতজ্ঞ। আপনাদের ভালোবাসার কারণে আমরা যেখানেই খেলেছি, মনে হয়েছে নিজেদের মাঠেই খেলছি। আমরা সত্যিই সেটি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি।
বিশ্বকাপ জেতার পর যখন আমরা আবার খেলতে নেমেছিলাম, এই মাঠেই আমি আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম আনন্দের দিনটি উপভোগ করেছিলাম। সেদিনের অভিজ্ঞতা আমি কখনোই ভুলব না; সেটি ছিল সত্যিই চমৎকার। আজও যখন আমি সেই ভিডিওগুলো দেখি, আমি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। সেই দিনটি আমার ইতিহাসে, আপনাদের ইতিহাসে এবং আমার পরিবারের ইতিহাসে চিরকালের জন্য খোদাই করা থাকবে... তা ছিল সত্যিই অসাধারণ। আপনাদের অনেক ধন্যবাদ।
আজ এখানে আবারও ফিরে এসে নিশ্চিতভাবেই আমি আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কষ্টের ও দুঃখের দিনটি পার করছি। কারণ আজ সেই দিন– যেদিন আমি জাতীয় দল ও আপনাদের সবাইকে বিদায় জানাচ্ছি। জাতীয় দলের এই ঐতিহাসিক রং ও সম্মান রক্ষা করার প্রতিটি মুহূর্তকে আমি মিস করব, তবে এখন থেকে আমি আপনাদের সারিতে, ওপাশে গিয়ে দাঁড়াব–আপনাদের সঙ্গেই এই প্রতিটি আর্জেন্টাইন ফুটবলার এবং সামনে যা-ই আসুক না কেন, সেগুলোকে সমর্থন দিয়ে যাব। আমরা সব সময় একতাবদ্ধ থাকব।
এটি শতভাগ প্রমাণিত যে, আমরা যখন একত্র হই এবং একতাবদ্ধ হয়ে দাঁড়াই, তখন আমরা যে কোনো শক্তির চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠি এবং যে কোনো কঠিন পরিস্থিতি অতিক্রম করতে পারি। নিশ্চিতভাবেই সামনে কঠিন সময় আসছে, কারণ এ সময়ে আমরা যা অর্জন করেছি, তা সাধারণ কোনো বিষয় নয়। আর সেই কঠিন সময়গুলোতে আমাদের আগের চেয়েও বেশি করে এই ফুটবলারদের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং তাদের সমর্থন জোগাতে হবে। আমি তাদের সব সময় যা বলি এবং আমাদের শেষ আলাপেও যা বলেছি, বড় কোনো লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শক্তিশালী ও সুসংগঠিত দল গড়ে তুলতে হয়। কারণ এমন অনেকেই আছে, যারা জাতীয় দলের ব্যর্থতা দেখতে চায়। আমাদের তাদের সেই সুযোগ দেওয়া যাবে না।
দলের আসল রূপ প্রকাশ পায় সেই কঠিন মুহূর্তগুলোতে। যদি দল সুসংগঠিত না থাকে, তবে কোনো কিছু অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। আর আমি আপনাদের বলছি, আমরা একটি অসাধারণ দল ছিলাম এবং সে কারণেই আমরা সবকিছু জয় করতে পেরেছি।
সত্যি বলতে, আজ আমি অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি কথা বলছি। আমি মাঠ ছেড়ে যেতে চাইছি না, আমি বিদায় নিতে চাইছি না। আমি শুধু আপনাদের বলতে চাই– আমি আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি, আমি আপনাদের খুব মিস করব। আর আমি ঈশ্বরের কাছে অশেষ কৃতজ্ঞ যে আমি একজন আর্জেন্টাইন, একজন আর্জেন্টাইন হতে পেরে আমি গর্বিত এবং আপনাদের সবার সঙ্গে আমার স্বপ্নের চূড়ান্ত রূপ দিতে পেরে আমি পরম গর্বিত।
আপনাদের অনেক অনেক ধন্যবাদ, আমি আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি।”
- বিষয় :
- লিওনেল মেসি