ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

ইতিহাসে মেসি একজনই

ইতিহাসে মেসি একজনই
×
×

তরিকুল ইসলাম রাজন

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | ১৫:০৬

কিছু বিদায় শুধু একজন খেলোয়াড়ের প্রস্থান নয়, সঙ্গে যবনিকা টেনে দেয় একটি বর্ণিল যুগের। কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পর তাদের আসনটি স্রেফ শূন্য হয়ে থাকে না, বরং সেই শূন্যতাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে দৃশ্যমান উপস্থিতি। আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সিতে লিওনেল মেসির বিদায়ের রাতটি ছিল ঠিক তেমনই। আর সেই বিষণ্ন অথচ গর্বের রাতে ড্রেসিংরুমের অভিভাবক হিসেবে সবচেয়ে আবেগাপ্লুত মানুষগুলোর একজন ছিলেন কোচ লিওনেল স্কালোনি।

বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয় দিয়ে জাতীয় দলের জার্সিতে শেষ ম্যাচ খেললেন মেসি। মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামের ৮৫ হাজারের বেশি দর্শক দেখলেন তাদের প্রিয় তারকার শেষ আন্তর্জাতিক অধ্যায়। মেসি নিজে গোল করলেন, সতীর্থদের দিয়ে করালেন আরও দুটি। ২০৭ ম্যাচে ১২৬ গোল ও ৬৬ অ্যাসিস্ট নিয়ে শেষ হলো তাঁর আর্জেন্টিনা-অধ্যায়। কিন্তু সংখ্যাগুলো কি সত্যিই মেসির মহিমাকে ধারণ করতে পারে? 

সম্ভবত পারে না। তাই তো ম্যাচ শেষে মেসিকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আবেগ সামলাতে পারেননি স্কালোনি। যেন তিনি শুধু একজন অধিনায়ককে বিদায় দিচ্ছিলেন না, বিদায় জানাচ্ছিলেন নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল একটি অধ্যায়কেও। অশ্রুসজল চোখে ধরা গলায় বিশ্বজয়ী এই কোচ বললেন, ‘এটা সত্যিই এক স্বপ্নের মতো অধ্যায় ছিল। আমি কখনও কল্পনা করিনি, ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়টির কোচ হতে পারব।’

একজন কোচের জন্য এর চেয়ে পরম প্রাপ্তি আর কী হতে পারে! কিন্তু স্কালোনির গল্পও কম অসাধারণ নয়। যে আর্জেন্টিনাকে নিয়ে বারবার ফাইনালে গিয়ে হৃদয়ভাঙা হাহাকারে পুড়তে হতো মেসিকে, সেই দলটিকে কাঠগড়া থেকে বিশ্বমঞ্চের শিখরে পৌঁছে দিয়েছেন স্কালোনি। মেসির হাতে তুলে দিয়েছেন ২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ ফিনালিসিমা, ২০২২ বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ কোপা আমেরিকা। আর প্রতিটির কেন্দ্রে ছিলেন এ দুই লিওনেল।
তাই বিদায়ের রাতে স্কালোনির কণ্ঠে শুধুই মহাতারকাকে হারানোর আক্ষেপ ছিল না, জড়িয়ে ছিল নিজের জীবনের সেরা সময়টাকে বিদায় জানানোর বেদনাও। চোখের জল মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘আমার চোখে পানি চলে আসছে, কারণ স্মৃতিপটে কতশত মুহূর্ত ভেসে উঠছে। ওকে আর জাতীয় দলের জার্সিতে মাঠে দেখতে না পাওয়াটা বড্ড যন্ত্রণার হবে।’

মেসির শূন্যস্থান কীভাবে পূরণ করবেন? প্রশ্নটা যত সহজ, উত্তরটা ততটাই অসম্ভব। স্কালোনির জবাবও ছিল দ্ব্যর্থহীন, ‘মেসিকে প্রতিস্থাপন করার মতো কেউ কোথাও নেই। ফুটবলের ইতিহাসে মেসি একজনই। যে-ই তাঁর জায়গায় খেলুক, সে মেসি হতে পারবে না।’ এরপর হৃদয়ের গভীর থেকে যোগ করেন, ‘আমি জীবনে আর কারও মধ্যে এমন ঐশ্বরিক আভা দেখিনি।’

স্কালোনির দূরদর্শিতা এখানেই। তিনি সেই আভাকে শুধু চিনতে পারেননি, সেটিকে ঘিরে একটি দল বানিয়েছেন। এমন একটি দল, যারা মেসির জন্য লড়েছে, কেঁদেছে, জিতেছে এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে বিশ্বকাপও উপহার দিয়েছে। সেই মেসি আজ আন্তর্জাতিক মঞ্চের অতীত। পথচলা কঠিন জেনেও স্কালোনিকে এখন তরুণদের নিয়ে তাকাতে হবে ভবিষ্যতের দিকে। তবে শেষটা তিনি টানলেন সেই চিরন্তন আক্ষেপ দিয়েই, ‘ওর পাশে ডাগআউটে থাকার যে অনুভূতি, পৃথিবীর কোনো কিছুর সঙ্গেই সেটির তুলনা চলে না।’

মেসি চলে গেলেন। স্কালোনি থাকবেন কিনা, সেটিও এখন ভবিষ্যতের প্রশ্ন। কিন্তু মেসি-স্কালোনির সেই যুগ আর ফিরবে না। ফুটবল ইতিহাসে তাদের গল্পটা থেকে যাবে একজন জাদুকর এবং সেই জাদুকরকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে মঞ্চে তুলে ধরা একজন কোচের গল্প হয়ে।

আরও পড়ুন

×