ই-কমার্স এখন প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন
.
টেকলাইফ ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:২৩ | আপডেট: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৪:১৬
বিক্রেতার অনেকেই জানতেন না, কীভাবে টেকসই ই-কমার্স ব্যবসা প্রতিষ্ঠা পায়। এক দশকের বেশি বিদেশি অভিজ্ঞতা, স্থানীয় উদ্ভাবন ও ধৈর্যশীল বিনিয়োগে এ খাতের ভিত এখন অনেকটা মজবুত। : মুহাম্মদ সাঈদ আলী, প্রশাসক, ই-ক্যাব
বাংলাদেশের ই-কমার্স খাত গত এক দশকে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। ২০২৩ সালে যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৮৩ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা।
২০২৪ সালে এ সংখ্যা বেড়ে ৯১ হাজার ২৬০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। আর ২০২৮ সালের মধ্যে তা পৌঁছাতে পারে এক লাখ ১৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকায়।
হিসাব বলছে, খুচরা বিক্রির মোট বাজারে ই-কমার্সের অংশ এখনও মাত্র ৩ থেকে ৫ শতাংশ। সংখ্যাতত্ত্ব যেমন বিশাল সম্ভাবনা দেখায়, তেমনি এ খাতে নাজুক অবস্থা মনে করিয়ে দেয়। শুরুতে এ খাত ছিল চ্যালেঞ্জিং। ভোক্তাদের আস্থা ছিল কম ও অনলাইন পেমেন্টের ব্যবস্থা ছিল সীমিত।
অন্যদিকে লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক একেবারেই ই-কমার্সবান্ধব ছিল না। বিক্রেতার অনেকেই জানতেন না, কীভাবে টেকসই অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠা পায়। ফলে এক দশকের বেশি সময় ধরে বিদেশি অভিজ্ঞতা, স্থানীয় উদ্ভাবন ও ধৈর্যশীল বিনিয়োগে খাতটির ভিত অনেকটা মজবুত হয়েছে।
রূপান্তর প্রক্রিয়ায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মুখ্য ভূমিকা রয়েছে। যার মধ্যে দারাজ বাংলাদেশের বাজারে সর্ববৃহৎ প্রযুক্তি বিনিয়োগ হিসেবে নিজস্ব ডেলিভারি নেটওয়ার্ক দারাজ এক্সপ্রেস (ডিইএক্স) প্রতিষ্ঠা করে। এটি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও কয়েক দিনের মধ্যে পণ্য পৌঁছে দেয়। শপআপ (রেডএক্স) লাস্ট মাইল ডেলিভারিকে শক্তিশালী করে, চালডাল অনলাইন মুদি ব্যবসা সম্প্রসারণ করে, সাজগোজ সৌন্দর্য ও জীবনধারা পণ্যে আস্থা তৈরি করে আর পিকাবু ও বিক্রয় বাজারে বৈচিত্র্য আনে। বিকাশ, নগদ, রকেটসহ কয়েকটি ফিনটেক প্রতিষ্ঠান অনলাইন অর্থ প্রদানকে সহজ ও জনপ্রিয় করেছে।
দারাজের সেলার শিক্ষামূলক উদ্যোগের মাধ্যমে হাজারো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা– গ্রাম ও শহরতলি থেকে আসা– ডিজিটাল সাক্ষরতা, বিপণন ও অনলাইন ব্যবসা পরিচালনায় দক্ষতা অর্জন করেছেন। প্ল্যাটফর্মটি সহজে ব্যবহারযোগ্য মোবাইল অ্যাপ, স্বয়ংক্রিয় স্টক ব্যবস্থাপনা এবং এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য কয়েকটি সহায়ক টুলস তৈরি করেছে। আর্লি বার্ড ও সেলার কানেক্টের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
যার প্রভাব কর্মসংস্থান ও অন্তর্ভুক্তিতেও স্পষ্ট। করোনার সময়েই প্রায় দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছিল ডেলিভারি, লজিস্টিক, গুদাম, প্রযুক্তি ও গ্রাহক পরিষেবা খাতে। বর্তমানে এই খাত লক্ষাধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।
আগামী পাঁচ বছরে আরও পাঁচ লাখ চাকরির সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। গ্রাহকরা এখন নিয়মিত প্রয়োজনীয় জিনিস অনলাইনে কিনছেন। আর বহু ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার জন্য ই-কমার্স প্রধান আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুধু কার্ডের মাধ্যমে অনলাইন লেনদেন দুই হাজার ৩৫ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৩.৬ শতাংশ বেশি। যদিও এখনও নগদ অর্থে পণ্য গ্রহণ প্রক্রিয়াই প্রধান।
এই পথ একেবারেই মসৃণ ছিল না। ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, আলেশা মার্ট, ধামাকা শপিংয়ের ব্যর্থতা ভোক্তাদের বিশ্বাস নষ্ট করেছে। আস্থা ফেরাতে দারাজের মতো সংগঠিত সব প্রতিষ্ঠান চালু করেছে সঠিক বিক্রেতা যাচাই, স্বচ্ছ রিফান্ড ব্যবস্থা, দ্রুত গ্রাহক পরিষেবা ও ডিজিটাল পেমেন্টের প্রসার।
পুরোপুরি ঝুঁকি দূর না হলেও প্রমাণ করে, নিয়মতান্ত্রিক ও সংগঠিত প্ল্যাটফর্মই আগামীতে টিকে থাকবে।
চ্যালেঞ্জ এখনও রয়েছে। অনলাইন মার্কেটপ্লেসে কমিশনে মূল্য সংযোজন কর ৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে বাড়ায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ক্রসবর্ডার ই-কমার্স নীতি এখনও চূড়ান্ত হয়নি, ফলে ভোক্তারা বৈশ্বিক বাজারের পণ্য পাচ্ছেন না, আর সরকারও সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪৪.৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ। এই অবকাঠামোগত ও নীতিগত ঘাটতি দূর না হলে প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে।
ই-কমার্স কেবল অনলাইন বাজার নয়; এটি ভোক্তা, উদ্যোক্তা, ডেলিভারি কর্মী, ফিনটেক প্রতিষ্ঠান, গুদাম শ্রমিক ও সফটওয়্যার পেশাজীবীর বিশাল নেটওয়ার্ক। অবকাঠামো, করনীতি, সীমান্তপারের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বিষয়ে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা-ই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ এই সুযোগ কাজে লাগাবে নাকি থেমে যাবে।
