ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

কমান্ড ড্রোনের যুদ্ধ

কমান্ড ড্রোনের যুদ্ধ
×
×

সাব্বিন হাসান

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:৪৮

আগামীতে যুদ্ধের নতুন সেনা কৌশল কী হবে, তা নিয়ে রীতিমতো গোপন যুদ্ধ চলছে কয়েক দেশে। সেই হিসাব বলছে, এআই এখন যুদ্ধের ময়দানে সবচেয়ে দামি সমরাস্ত্র হলো তথ্য। যুদ্ধের ময়দানে আগে সেনাপ্রধানের সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল ভালো মানচিত্র ও নির্ভরযোগ্য গুপ্তচর। আজ সেই জায়গা নিয়েছে স্যাটেলাইট, ড্রোন, রাডার, থার্মাল ক্যামেরা, ইলেকট্রনিক সেন্সর ও হাজারো ডিজিটাল ডেটা স্ট্রিম।

কিন্তু এ ধারণা নতুন কিছু নয়। এআই যুদ্ধের বহু পুরোনো ধারণাকে অভূতপূর্ব গতিতে পৌঁছে দিয়েছে। শত্রুকে আগে দেখা, তথ্যকে দ্রুত বোঝা ও তার ভিত্তিতে ঝটপট সিদ্ধান্ত নেওয়া– সবখানে এখন এআই। অতীতে স্যাটেলাইট ছিল না, ড্রোন তখনও আবিষ্কার হয়নি; ছিল শুধু গুপ্তচর। আজ সেই গুপ্তচরের জায়গায় কাজ করেছে হাজারো ঘরানার বিশেষায়িত সেন্সর। কিন্তু উদ্দেশ্য তো ওই একই– শত্রু কী করছে, থাকছে কোথায় ও তার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে, তা গোপনে আগেই অনুমান করার কৌশল। নির্দেশনা পাওয়া থেকে আর্টিলারি স্ট্রাইক করা পর্যন্ত ১০ গুণ সময় কমিয়ে আনতে পারে। এরই মধ্যে ইউক্রেনের ৯০ শতাংশ আর্টিলারি ইউনিটস এটি ব্যবহার করেছে বলে গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে। এই অংশে এআইর চেয়েও বড় শিক্ষা হলো সফটওয়্যার নিজেই যুদ্ধের গতি বদলে দিয়েছে।

জরুরি মুহূর্তের খোঁজ

যুদ্ধের ময়দানে ড্রোনের সংখ্যা যত বাড়ছে, ভিডিওর পরিমাণ ততটাই বেড়েছে। ইউক্রেনের ভেজহা প্ল্যাটফর্ম ডেল্টার সঙ্গে যুক্ত হয়ে রিয়েল টাইম ড্রোন ফুটেজ বিশ্লেষণে সহায়তা করছে। জানা গেছে, ভেজহা প্রতিদিন কয়েকশ ইউএভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে চার হাজারের বেশি অবজেক্ট শনাক্ত ও শ্রেণিবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছে। এখানে এআইর কাজ অনেকটা দ্রুত ভিডিও অ্যানালিস্টের মতো। এ ক্ষেত্রে পুরো ৫৯ মিনিটের ভিডিও মানুষকে দেখতে হলো না। এআই আগে খুঁজে দিল– এই বেঁচে যাওয়া মুহূর্ত যুদ্ধের গতিপথ বদলে দেবে। তারপর মানুষ সেই ফুটেজ পরীক্ষা করতে পারে।
ইউক্রেনের কিছু ড্রোন সিস্টেম তাই অপটিক্যাল নেভিগেশন ও মেশিন ভিশন ব্যবহার করে জিপিএস ছাড়াই নির্দিষ্ট পথ অনুসরণের পরীক্ষায় গবেষণা করছে অবিরাম।

ইউক্রেনের লং-রেঞ্জ ড্রোনের কথা সামনে আসছে। অনবোর্ড কম্পিউটার স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন না থাকলেও ক্যামেরা, ভূখণ্ডের ডেটা বিশ্লেষণ ও মেশিন ভিশন অ্যালগরিদম ব্যবহার করে নিজের অবস্থান নির্ণয় ও নেভিগেশন করতে সহায়ক হবে। সিএসআইএস গবেষণায় এমন তথ্যই সামনে আসছে। 

আরও চমকপ্রদ হলো এআইনির্ভর ঝাঁক বাঁধা ড্রোনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। 

খবর বলছে, ইউক্রেনের সংস্থা স্টিক্সের সিস্টেমের গবেষণা ও প্রয়োগ ভালোভাবেই এগোচ্ছে। এর অর্থ যেখানে কয়েকটি ড্রোন নিজেদের মধ্যে তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে আন্তঃসংযোগ করে চলমান অপারেশন চালানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের ড্রোন হয়তো একা উড়বে না। একটি ড্রোন আরেকটিকে বলবে– সামনে বিপদ। রাশিয়াও বদলাচ্ছে। এই প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা একতরফা নয়। রাশিয়ান সেনাবাহিনী কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল ও এআইকেন্দ্রিক সিস্টেম নিয়ে বিশদ কাজ করছে। গ্রোজার মতো ডিজিটাল সিস্টেম ডিফেকশন থেকে আর্টিলারি ইমপ্যাক্ট পর্যন্ত ফিডব্যাক লুপ ছোট করার চেষ্টা করছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ এআই এখন শুধু একটি দেশের প্রযুক্তি নয়। যুদ্ধের দুই পক্ষই একই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে– কীভাবে কম সময়ে বেশি তথ্য থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন কিল চেইনে। কারণ, এটি অনেক ছোট হচ্ছে। পুরোনো যুদ্ধ নীতিতে ছিল আগে দেখা, এরপর খবর পাঠানো, বিশ্লেষণ, আদেশ ও সর্বশেষ আক্রমণ।

ভুল করতে পারে এআই

যুদ্ধ সেই সাপ্লাই চেইনকে একেবারে ছোট করে ফেলেছে এআই নির্ভরতা। সেন্সর থেকে এআই/ ডেটা অ্যানালিটিকস থেকে হিউম্যান ডিসিশন হয়ে শেষমেশ অ্যাকশন নেওয়ার সময় বহু গুণ কমছে। তথ্যের পরিমাণ বাড়ছে। যুদ্ধের গতি বাড়ছে। এটাই আসল বিপ্লব।কিন্তু মেশিন কি শেষ সিদ্ধান্ত নেবে? এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ও আগামীর বিপদের শঙ্কা। ভুল করতে পারে এআই।

সেন্সর ভুল ডেটা দিতে পারে। অ্যালগরিদম ভুল অবজেক্ট শনাক্ত করতে পারে। জিপিএস স্পুফিং বা ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেমকে বিভ্রান্ত করতে পারে। আর যুদ্ধক্ষেত্রে ভুল অনুমানের মূল্য কোনো সফটওয়্যার বাগের মতো নয়; ভুল আইডেন্টিফিকেশন মানে হতে পারে অনেক মানুষের জীবনাবসান।

তাই বর্তমান সামরিক এআই ব্যবস্থার বড় অংশেই হিউম্যান ওভারসাইটের প্রশ্নটি বিবেচ্য হয়ে রয়েছে। ইউক্রেনবিষয়ক সিআইসিএস গবেষণা বলছে, সম্পূর্ণ অটোনোমাস ওয়ারফেয়ার এখনও মূলত ভবিষ্যৎ লক্ষ্য; বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে প্র্যাকটিক্যাল অটোনমির সঙ্গে মানুষের হস্তক্ষেপ বজায় রয়েছে।

কেমন হবে আগামীর যুদ্ধ

সম্ভবত আরও বেশি সেন্সর থাকবে। আরও বেশি ড্রোন থাকবে। আরও বেশি স্যাটেলাইট ডেটা থাকবে। আর থাকবে এমন এআই, যা কয়েক মিনিটের ডেটাকে কয়েক সেকেন্ডে বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত জানাবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় পরিবর্তন অস্ত্রে নয়; পরিবর্তন হবে সিদ্ধান্তের গতিতে।

এর আগে ইনিগমাকে কোডব্রেকারকে রাত জেগে হিসাব করতে হতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রাডার অপারেটরকে স্ক্রিন দেখতে হতো। আজকের এআই কয়েক লাখ ডেটা পয়েন্ট একযোগে বিশ্লেষণ করে মুহূর্তেই।

ভবিষ্যতের শঙ্কা

তাই ভবিষ্যতের যুদ্ধের প্রশ্ন হয়তো হবে না– কার কাছে বেশি অস্ত্র? প্রশ্নটা হবে– কার কাছে বেশি তথ্য, কে দ্রুত তা বুঝতে পারে এবং কে সেই তথ্যকে সবচেয়ে দ্রুত সিদ্ধান্তে রূপান্তর করতে পারদর্শী, তা নিয়ে। যুদ্ধের ইতিহাসে অস্ত্র বহুবার বদলেছে। এবার বদলে যেতে চলেছে যুদ্ধকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। আর সেই দৃষ্টির নাম– এআই।
 

আরও পড়ুন

×