ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

এনটিএমসি বিলুপ্তি নিয়ে সরকারের মধ্যেই দুই মত

এনটিএমসি বিলুপ্তি নিয়ে সরকারের মধ্যেই দুই মত
×

দেলওয়ার হোসেন

প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | ০৯:৪৩

ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) বিলুপ্তি নিয়ে সরকারের মধ্যেই দুই মত দেখা দিয়েছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ চলতি মাসে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ অধ্যাদেশ ২০২৫-এর খসড়ায় এনটিএমসি বিলুপ্তির প্রস্তাব করেছে। এরপর এ নিয়ে প্রতিবাদ করেছেন এনটিএমসিসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রধানরা।

এদিকে গত ১৫ অক্টোবর এনটিএমসির তিনটি নতুন নামের প্রস্তাবসহ একটি খসড়া আইন প্রস্তুত করা হয়েছে। নামগুলো হলো– বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন সাপোর্ট ডিপার্টমেন্ট, ডিপার্টমেন্ট অব বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন সাপোর্ট এবং টেলিকমিউনিকেশন রিসার্চ অ্যান্ড সাপোর্ট ডিপার্টমেন্ট। এনটিএমসি বর্তমানে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইনের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটিকে আরও শক্তিশালী করার জন্য এই আইনের খসড়া তৈরি করেছে এনটিএমসি। এরপর বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ অধ্যাদেশের খসড়ায় এনটিএমসিকে বিলুপ্ত করা হয়েছে।

জানা যায়, ৪ নভেম্বর বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ অধ্যাদেশ ২০২৫-এর খসড়া ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। এরপর ১৭ নভেম্বর আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটির সভায় একটি সংস্থার প্রধান জানান, তাদের মনিটরিং সার্ভিলেন্স দুর্বল করা হচ্ছে। এতে জাতীয় ও দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড তদারকি করা কঠিন হয়ে যাবে। এরপর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ অধ্যাদেশ ২০২৫ বিষয়ে একটি সভা আহ্বানের নির্দেশ দেন। 

সেই নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল রোববার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সভাপতিত্বে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ; ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবসহ ডিজিএফআই, এনএসআই, বিজিবি, র‌্যাব, এসবি, আনসার, কোস্টগার্ডসহ সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বৈঠকে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেছেন, এনটিএমসি সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান গত আওয়ামী লীগের শাসনামলে শত শত মানুষকে গুমের পর হত্যা করেছেন। একই সঙ্গে তাদের পেট কেটে নদী-নালা ও খালবিলে লাশ ফেলে দিয়েছেন। এর শক্তিশালী প্রমাণ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনের কাছে রয়েছে। এমন প্রতিষ্ঠান রাখার প্রয়োজন নেই। 

তিনি আরও বলেন, কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে আদালতের মাধ্যমে নিতে হবে। নাগরিকদের ফোনকল ও ইন্টারনেটে বিভিন্ন যোগাযোগ অ্যাপে আড়িপাতা এবং ইন্টারনেট ব্যবস্থা ও ইন্টারনেট অপারেটর নিয়ন্ত্রণ করে করা যাবে না।

এ সময় একটি সংস্থার প্রধান বলেন, আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে গেলে অনেক সময় লাগবে। এতে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। অনেক সময় দেশবিরোধী সংক্রান্ত হয়। সেই সংক্রান্ত শনাক্ত করাও কঠিন হতে পারে। এই সংস্থাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক উপস্থিত আরও ১০টির বেশি সংস্থাপ্রধান একমত পোষণ করেন। 

একই সঙ্গে দুটি সংস্থাপ্রধান বলেন, প্রয়োজনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থেকে পুরোপরি তাদের নিয়ন্ত্রণে কাজ করবেন। এর পরও এনটিএমসির কার্যক্রম বিদ্যমান রাখতে হবে। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, তাহলে পরবর্তী সময়ে আরেকটি বৈঠকের মাধ্যমে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কারণ, বিগত সময়ে আড়িপাতার অপব্যবহারের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নানা অপর্কম করেছে। এই আইনটি সংশোধন না করলে এ ধরনের কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকবে। 

সরকারের এক গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধান বলেন, সামাজিক মাধ্যমে নানা অডিও, ভিডিও প্রকাশ পায়। বলা হয়, এগুলো আমরা করেছি। কিন্তু এগুলো আমরা করি না। আরেকটি বাহিনীর দিকে ইঙ্গিত দিয়ে সেই বাহিনী এটি করে বলে তিনি উল্লেখ করেন। 

অন্য একটি সংস্থার প্রধান তাঁর বক্তব্যে বলেন, সব সময় দেশবিরোধী নানা ষড়যন্ত্র অব্যাহত থাকে। এটি রোধ করতে মনিটরিং করতে হয়। এটি অব্যাহত না রাখলে ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না। যে কাজটি এখনই করা দরকার সেটি আদালতের অনুমোদনের অপেক্ষা করলে, সেই ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়বে। 

সভায় কোস্টগার্ডপ্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. জিয়াউল হক বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। এর মধ্যে নানা বড় বড় চালান আমরা ধরতে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু মনিটরিং না করলে চোরাচালানকারীদের শনাক্ত এবং তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও অন্যান্য যোগাযোগের ক্ষেত্রে গোপনীয়তার অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, জনসাধারণের নৈতিকতা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের (ক) প্রবেশ, তল্লাশি ও আটক হতে স্বীয় গৃহে নিরাপত্তা লাভের অধিকার থাকবে; এবং (খ) চিঠিপত্রের ও যোগাযোগের অন্যান্য উপায়ের গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার থাকবে। 

এদিকে ২০২১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ফোনালাপ ফাঁস ও নজরদারি প্রসঙ্গে এক রিটের শুনানিতে হাইকোর্ট বলেন, ব্যক্তিগত বিষয়গুলোতে আড়িপাতা যেমন ঠিক নয়, তেমনি মিডিয়া সগৌরবে সেগুলো প্রচার করে এটিও ঠিক নয়। 

এনটিএমসি যাত্রা শুরু হয় ২০১৩ সালের ৩১ জুলাই। এর উদ্দেশ্য ছিল দেশে সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে টেলিযোগাযোগ-সম্পর্কিত দিকনির্দেশনা, পর্যবেক্ষণ ও অন্যান্য সরকারি গোয়েন্দা সংস্থাকে সহযোগিতা করা। যদিও সংস্থাটি এতদিন ব্যবহার হয়েছে শুধু সরকারের হয়ে নাগরিকদের ফোনকল ও ইন্টারনেটে বিভিন্ন যোগাযোগ অ্যাপে আড়িপাতা এবং ইন্টারনেট ব্যবস্থা ও ইন্টারনেট অপারেটর নিয়ন্ত্রণের কাজে। সংস্থাটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন হলেও এর কার্যক্রমও নিয়ন্ত্রিত হয়েছে বিশেষ একটি গোয়েন্দা সংস্থার অধীনে। দেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে সংস্থাটিকে নতুন বিধিমালার অধীনে বেসামরিক কর্তৃপক্ষের আওতায় আনার দাবি উঠেছে। 

গত বছরের আগস্টে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন জুলাই আন্দোলনে বিতর্কিত ভূমিকার কারণে এনটিএমসির বিলুপ্তির দাবি করে। 

আরও পড়ুন

×