ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদন

মেটার বিজ্ঞাপনে বিশ্বব্যাংকের নামে ঋণ প্রতারণা

মেটার বিজ্ঞাপনে বিশ্বব্যাংকের নামে ঋণ প্রতারণা
×

ফাইল ছবি

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ | ২২:৩৩ | আপডেট: ০৫ মে ২০২৬ | ২২:৩৭

সামাজিক মাধ্যমে স্পন্সরড বিজ্ঞাপনের আড়ালে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ ঋণ প্রতারণা কার্যক্রমের বিস্তার ঘটছে। মেটার প্ল্যাটফর্ম ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও ইনস্টাগ্রামে ছড়ানো এসব বিজ্ঞাপনে বিশ্বব্যাংকের নাম ব্যবহার করে সহজ শর্তে অনলাইন ঋণের প্রলোভন দেখানো হচ্ছে।

আজ মঙ্গলবার প্রকাশিত ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিজিটাল লোন সার্ভিসসহ একাধিক ফেসবুক পেজে ছড়ানো ১৫ সেকেন্ডের ভিডিওতে এআই নির্মিত দুই নারী দাবি করছেন, ৫০ হাজার থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হচ্ছে, মেয়াদ এক থেকে পাঁচ বছর এবং সুদের হার মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ। এসব ভিডিও স্পন্সরড বিজ্ঞাপন হিসেবে হাজারো ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছেছে।

অনুসন্ধানে অন্তত ২৬টি ফেসবুক পেজ শনাক্ত করা হয়েছে, যেগুলো একই ধরনের বিজ্ঞাপন চালাচ্ছে। এর মধ্যে ২৩টি পেজ কম্বোডিয়া থেকে এবং তিনটি বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়া থেকে যৌথভাবে পরিচালিত। ১১ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে অন্তত ৩৭টি সক্রিয় বিজ্ঞাপন নথিভুক্ত করা হয়। একই ভিডিও, ছবি ও বার্তা একাধিক পেজে পুনঃব্যবহার হওয়ায় এটি একটি সমন্বিত প্রতারণা চক্রের কার্যক্রম বলে মনে করছেন গবেষকরা।

শুধু বিশ্বব্যাংক নয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ এবং ব্যাংক অব আমেরিকার নাম ও লোগো ব্যবহার করেও ভুয়া ঋণের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) এবং ফার্স্ট হরাইজন ব্যাংকের নামও ব্যবহার করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিজ্ঞাপনগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই।

প্রতারণার ধরন প্রায় অভিন্ন। বিজ্ঞাপনে ক্লিক করলে ব্যবহারকারীর সরাসরি মেসেঞ্জার বা হোয়াটসঅ্যাপে নেওয়া হয়। সেখানে ঋণ পেতে আবেদনকারীর ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, মোবাইল নম্বর, বিদ্যুৎ বিল, এমনকি মনোনীত ব্যক্তির (নমিনি) তথ্যও চাওয়া হয়। প্রাথমিক যাচাই শেষে ঋণ অনুমোদনের আশ্বাস দিয়ে ‘সঞ্চয়’ বা ‘প্রসেসিং ফি’ হিসেবে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা অগ্রিম জমা দিতে বলা হয়।

ডিসমিসল্যাব ১০টি পেজের সঙ্গে যোগাযোগ করে এই প্রক্রিয়া যাচাই করে। সীমিত তথ্য দেওয়ার পরও ঋণ অনুমোদনের কথা বলে দ্রুত টাকা পাঠাতে চাপ দেওয়া হয়। গবেষকরা কোনো অর্থ না পাঠালেও প্রতারকরা বারবার ফোন ও বার্তা দিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়ে যায়। এতে স্পষ্ট হয়েছে, মূল লক্ষ্য অগ্রিম অর্থ আদায় এবং ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ।

অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, অন্তত ১৯টি পেজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ভিডিও তৈরির টুল ব্যবহার করা হয়েছে। ভিডিওগুলোর নিচে বিশেষ চিহ্নও দেখা গেছে। বিশ্লেষণে এসব ভিডিওর ভিজ্যুয়াল ও অডিও প্রায় সম্পূর্ণ কৃত্রিমভাবে তৈরি বলে ধারণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে পুরোনো সংবাদ ভিডিওর অংশ কেটে ব্যবহার করে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছে।

গত মার্চে কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনের সেন সক এলাকায় এক অভিযানে ছয় বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করে স্থানীয় পুলিশ। সেখানে একই কৌশলে ভুয়া ঋণ দেখিয়ে অগ্রিম অর্থ আদায়ের প্রমাণ মেলে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কম্বোডিয়াকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে এ ধরনের সাইবার প্রতারণা নেটওয়ার্ক পরিচালিত হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংক আগেই একাধিকবার সতর্ক করে বলেছে, তারা সরাসরি কোনো ব্যক্তি বা উদ্যোক্তাকে ঋণ দেয় না। তাদের নাম ব্যবহার করে ফির বিনিময়ে ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব প্রতারণা। একই সতর্কবার্তা দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্টও।

মেটার নীতিমালায় প্রতারণামূলক আর্থিক বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ থাকলেও এসব কনটেন্ট এখনও সক্রিয় থাকায় নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন পেজ খুলে একই কনটেন্ট বারবার প্রচারের কারণে প্রতারণা বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

সংশ্লিষ্টরা ব্যবহারকারীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সামাজিক মাধ্যমে দেখা অচেনা ঋণ প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়া, কোনো অবস্থাতেই অগ্রিম অর্থ না পাঠানো এবং ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার না করাই এ ধরনের প্রতারণা থেকে বাঁচার প্রধান উপায়।

আরও পড়ুন

×