ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিজয় দিবস ২০২৫

অবরুদ্ধ ৯ মাস: একাত্তরের দিনলিপি

অবরুদ্ধ ৯ মাস: একাত্তরের দিনলিপি
×

ডিসেম্বর, ১৯৭১। মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের বিজয়োল্লাস

খুশী কবির

প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫০ | আপডেট: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৪:৫৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৭১ সালে আমরা ঢাকায় ছিলাম। আমার কাছে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট শুরু হয়েছিল ১৯৭০-এর নির্বাচনের পর থেকেই। যখন আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে জয়লাভ করল। সবার ধারণা ছিল পার্লামেন্ট বসবে, ক্ষমতা হস্তান্তর হবে। কিন্তু বাঙালিসত্তার জাগরণ এবং আমাদের আলাদা একটি অস্তিত্ব বা পরিচিতি তৈরির বিষয়টি মনের ভেতরে অনেক আগে থেকেই কাজ করছিল। আমি তখন কলেজের গণ্ডি পেরিয়েছি। আমরা সবাই ৭ মার্চের ভাষণ সশরীরে গিয়ে শুনেছি, দেখেছি এবং অদ্ভুত এক শিহরণ অনুভব করেছি।

২৫ মার্চের কালরাতের আগেই শুরু হয়েছিল অসহযোগ আন্দোলন। আমাদের পণ ছিল– পাকিস্তানের কোনো জিনিস আমরা ব্যবহার করব না। কাপড়-চোপড় থেকে শুরু করে টুথপেস্ট, সাবান সব বর্জন করলাম। আমার স্পষ্ট মনে আছে, তখন ‘হেনা কেমিক্যাল’ নামে একটি কোম্পানি ‘পিয়া টুথপেস্ট’ বের করেছিল। পাকিস্তানি পণ্য বর্জন করে আমরা সবাই তখন ওই দেশি টুথপেস্টই ব্যবহার করতাম। এমনকি সরকারকে ট্যাক্স দেওয়াও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। উদ্দেশ্য একটাই– পশ্চিম পাকিস্তানে যেন আমাদের টাকা না যায়। এই অসহযোগ আন্দোলন সবাই খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করেছিল।

২৫ মার্চ রাতে আমরা ধানমন্ডির বাড়িতে ছিলাম। গভীর রাতে গোলাগুলির প্রচণ্ড শব্দ, মানুষের আর্তনাদ আর আগুনের লেলিহান শিখায় আকাশ লাল হয়ে উঠতে দেখলাম। সেই ভয়াবহতা বলে বোঝানোর মতো নয়। পিলখানায় ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) ওপর আক্রমণ হয়েছিল, সেই আগুনের আভা আমাদের ধানমন্ডির বাসা থেকেও দেখা যাচ্ছিল। ২৬ তারিখ সকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদের এলাকার ভেতরের রাস্তাগুলোয় ঢুকে পড়ে। তখন প্রায় সবার বাড়ির ছাদেই ওড়ানো ছিল বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা এবং প্রতিবাদের প্রতীক কালো পতাকা। সেনারা ট্রাক নিয়ে এসে বন্দুক তাক করে ধমক দিল– ‘পতাকা নামাও, নইলে গুলি করা হবে।’ অনেকের বাড়িতে পতাকা নামাতে দেরি হওয়ায় গুলিও ছুড়েছিল তারা। আমাদের বাসা ছিল এক তলা, তাই আমরা দ্রুত ছাদে উঠে বাঁশের খুঁটি থেকে পতাকা নামিয়ে ফেলতে পেরেছিলাম। কিন্তু যাদের দোতলা বা তিন তলা বাসা, তাদের নামাতে দেরি হওয়ায় দেয়ালে গুলির দাগ লেগেছিল।

তখন আমার বাবা ভোলায় ছিলেন। ’৭০-এর ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ের পর মনপুরা দ্বীপে ‘হেল্প’ নামক একটি বেসরকারি সংস্থার হয়ে পুনর্বাসনের কাজ করছিলেন তিনি। সরকারি চাকরি থেকে সদ্য অবসর নিয়েছেন তখন। ২৬ তারিখ সকালেই বাবার ঢাকায় ফেরার কথা ছিল। কিন্তু ২৫ তারিখের ক্র্যাকডাউনের পর সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। টেলিফোন লাইন কাটা, রাস্তায় কারফিউ। আমরা মা-ভাইবোনরা ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম।

২৭ মার্চ সকালে কয়েক ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল করা হলে আমার দুলাভাই মাকে নিয়ে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে যান বাবার খোঁজ নিতে। মা ফিরে আসার পর যে বর্ণনা দিয়েছিলেন, তা ছিল শিউরে ওঠার মতো। মা বললেন, ‘পুরো রাস্তা এবং সদরঘাট টার্মিনালে শুধু লাশ আর লাশ।’ চৈত্র মাস ছিল, অনেক ঘরহীন মানুষ গরমে টার্মিনাল বা ফুটপাথে শুয়ে ছিল, তাদের অনেকেই আর জাগেনি। রিকশার ওপর চালকের মৃতদেহ পড়ে থাকার সেই আইকনিক দৃশ্য মা নিজের চোখে দেখেছিলেন। বাবাকে না পেয়ে মা ফ্যাকাশে মুখে ফিরে এলেন।

অবশেষে বাবা ফিরে এলেন এবং আমরা তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানতে পারলাম। বাবা স্টিমারে করে ফিরছিলেন, কিন্তু নারায়ণগঞ্জের কাছে এসে স্টিমার আর এগোবে না বলে জানিয়ে দেয়। বাবা তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকা করে নদী পার হয়ে নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ডে আমার ভাইয়ের বাসায় ওঠেন। সেখান থেকে কারফিউ ওঠার পর তিনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন ঢাকায় ফেরার আশায়। তখন একজন অবাঙালি ভদ্রলোক, যিনি জুট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বাবাকে চিনতেন। তিনি বাবাকে দেখতে পান। তিনি বাবাকে বললেন, ‘কবির সাহেব আপনি এখানে কী করছেন? আপনাকে তো মেরে ফেলবে!’ ভদ্রলোক নিজের গাড়িতে করে বাবাকে আমাদের ধানমন্ডির বাসায় পৌঁছে দেন। সেই অবাঙালি ভদ্রলোক সেদিন সাহায্য না করলে হয়তো বাবাকে আর ফিরে পেতাম না।

এরপর শুরু হলো আমাদের দীর্ঘ নয় মাসের অবরুদ্ধ জীবন। আমার বড় বোনের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। তারা এবং আমার মেজো ভাই নিজেদের বাসা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অন্যত্র ছিলেন। আমরা বাকি চার ভাইবোন মা-বাবার সঙ্গে ধানমন্ডির বাসায় আটকা পড়লাম। আমাদের গ্রামের বাড়ি বা ভারতে চলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি ছিল না।

এই নয় মাসে আমাদের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন এলো। আমি ছিলাম দুরন্ত স্বভাবের। ঘরে বসে থাকা আমার ধাতে সইত না। অথচ এই পুরো সময়টা আমি প্রায় ঘরবন্দি ছিলাম। সময় কাটানোর জন্য আমরা ভাইবোনরা তাস খেলা, স্ক্র্যাবল, ড্রাফটস, ক্যারম, বাঘডুলি আর সাপলুডু খেলা শিখলাম। বাসায় যত বই ছিল, সব একেকটা দুবার করে পড়া হয়ে গেল।

মাঝেমধ্যে পাকিস্তানি সেনারা আসত তল্লাশি চালাতে। এই নয় মাসে প্রায় তিন-চারবার আমাদের বাসায় রেইড হয়েছিল। বিহারিদের সঙ্গে নিয়ে তারা আসত। মা আমাদের ভাইবোনদের ছাদে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে পরিস্থিতি সামাল দিতেন। বাবা যেহেতু সাবেক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন এবং পিন্ডিতেও কাজ করেছিলেন, মা সেই পরিচয় দিয়ে তাদের ঠেকাতেন। ওরা চলে যাওয়ার পর নিচে নেমে দেখতাম– আলমারির সব কাপড় মাটিতে, ড্রয়ারের কাগজপত্র তছনছ করা, তোশক উল্টানো। এক ভয়াবহ মানসিক চাপের মধ্যে আমরা দিন পার করেছি।

আমাদের একমাত্র ভরসা ছিল রেডিও। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র (আমরা বলতাম ‘জয় বাংলা বেতার’), আকাশবাণী, বিবিসি আর রেডিও মস্কো শুনেই আমরা যুদ্ধের খবর পেতাম। মাঝেমধ্যে মুক্তিযোদ্ধারা চিরকুট পাঠাতেন, কখনও বা কেউ এসে আশ্রয় নিতেন। মা খুব গোপনে এই বিষয়গুলো সামলাতেন, আমাদের সবটুকু জানাতেন না নিরাপত্তার খাতিরে।

আরেকটি বিষয় আমরা খেয়াল করলাম। কারফিউ শিথিল থাকলে যেসব ফেরিওয়ালা বা ভিক্ষুক আসত, ২৬ মার্চের পর তাদের আর দেখা গেল না। ফেরিওয়ালা বা ভিক্ষুক হিসেবে নতুন নতুন লোক দেখা গেল। মা সন্দেহ করলেন, এরা আসলে গুপ্তচর। খবর নিতে এসেছে কোন বাসায় কারা আছে বা কারা যাতায়াত করছে। আমাদের খাওয়া-দাওয়ারও খুব কষ্ট ছিল তখন। প্রায়ই খিচুড়ি আর ডিম খেয়ে দিন কাটাতে হতো। আগের মতো সেই জৌলুস বা প্রাচুর্য ছিল না।

ডিসেম্বরের ৩ তারিখের পর যখন ভারত যুদ্ধে জড়াল এবং আকাশে প্লেনের ডগফাইট শুরু হলো, তখন আমাদের ভয় কেটে গিয়ে এক ধরনের উত্তেজনা কাজ করত। আমরা ছাদে উঠে প্লেন দেখতাম। আমাদের বিশ্বাস ছিল, এই প্লেনগুলো আমাদের মুক্তির বার্তা নিয়ে আসছে। আমাদের পাশের বাসায় একজন পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা থাকতেন। ডিসেম্বরের শেষের দিকে শুনলাম তিনি ফোনে তাঁর ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে তর্ক করছেন। তিনি ব্যারাকে ফিরে যেতে চাইছেন না। বলছেন– ‘আমি বহু কষ্টে জান বাঁচিয়েছি, আমি আর যাব না।’ তখনই বুঝেছিলাম, ওদের মনোবল ভেঙে গেছে।

অবশেষে এলো ১৬ ডিসেম্বর। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা সবাই রাস্তায় নেমে এলাম। সেই দিনটির অনুভূতি ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। চেনা নেই, জানা নেই– রাস্তায় দেখা হওয়া প্রতিটি মানুষের সঙ্গে সবাই কোলাকুলি করছে। সবার মুখে একটাই স্লোগান– ‘জয় বাংলা’। এই স্লোগানটি দীর্ঘ নয় মাস আমাদের মনের ভেতরে লালন করা ছিল, সেদিন তা গগনবিদারী চিৎকারে পুরো শহর কাঁপিয়ে দিল। পরবর্তী সময়ে এ স্লোগানের স্বাধীনতার পর যখন আমি স্বাভাবিক জীবনে ফিরলাম, তখন একটা অদ্ভুত সমস্যা হতো। কেউ যদি বলত ‘গত বছর’, আমি ভাবতাম সেটা ’৭০ সাল। কারণ ’৭১ সালটা আমার জীবন থেকে যেন হারিয়ে যাওয়া একটি বছর। ওই বছর আমি কোথাও যাইনি। কিছু করিনি। শুধু বেঁচে থাকার লড়াই করেছি। ১৯৭১ আমার কাছে ছিল এক ‘ব্ল্যাঙ্ক’ বা শূন্য বছর। ক্যালেন্ডার থেকে হারিয়ে যাওয়া এক অবরুদ্ধ সময়।

আরও পড়ুন

×