‘সবকিছু প্রধানমন্ত্রীকে জানাব, সব ডকুমেন্ট আছে’
ইবির ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী আলীমুজ্জামান টুটুল -সংগৃহীত ছবি
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২০ | ০৮:১৭
কুষ্টিয়ায় ইসলামী বিশ্ববদ্যালয়ের (ইবি) ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী আলীমুজ্জামান টুটুলের ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ইবির চলমান মেগা প্রকল্পের টেন্ডার ঘিরে পছন্দের লোককে কাজ দিতে তার ওপর চাপ সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে। আর সেই ক্ষোভে চাকুরি ছাড়ার মত সিদ্ধান্ত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সোমবার রাতে একটি স্ট্যাস্টাস দেন আলীমুজ্জামান টুটুল।
ইবির কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে জানান প্রকৌশলী টুটুল। তবে তাদের নাম বলেননি তিনি। চাকুরি থেকে ইস্তফা দিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করে সব তুলে ধরবেন বলে জানান। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর পর্যন্ত যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
জানা গেছে, ইবিতে প্রায় ৫৩৭ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। সম্প্রতি কয়েকটি কাজের টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। ৩০ মার্চ এবং ৬ এপ্রিল ৫৩ কোটি ও ১০৬ কোটি টাকার দুটি কাজের দরপত্র খোলা হবে। এসব কাজের জন্য ঠিকাদার নির্ধারণ বা লটারি হবে। তার আগেই ইবির একটি চক্র ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন শীর্ষ নেতাকে একটি কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য প্রধান প্রকৌশলী টুটুলের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ৫৮ কোটি টাকার একটি কাজ ওই নেতাকে দেওয়ার জন্য টুটুলের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। প্রকৌশলী টুটুল বিষয়টি নিয়ে অপারগতা প্রকাশ করলে তার ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হয়।
এ নিয়ে সোমবার রাতে টুটুল তার ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাস্টাস দেন। স্ট্যাস্টাসে তিনি লিখেন, ‘ইবিতে আর চাকুরি করা হলো না আমার, কালকে রিজাইন করব, ইনশাআল্লাহ, ইঞ্জিনিয়ার টুটুল’।
ইবির প্রকৌশল অফিসের একাধিক কর্মকর্তা জানান, মেগা প্রকল্পের চলমান কাজকে ঘীরে এর আগে স্যারের ওপর (আলীমুজ্জামান টুটুল) চাপ সৃষ্টি করা হয়। তার কাছ থেকে কয়েক দফায় টাকাও নেয় প্রভাবশালী চক্রটি। এর মধ্যে ইবি ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির বিতর্কিত দুই নেতা পলাশ ও রাকিবও রয়েছে।
ইবির একটি সূত্র জানায়, গত বছর ছাত্রলীগের দুই সদস্য বিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা করা হয় কেন্দ্র থেকে। রবিউল ইসলাম পলাশকে সভাপতি ও রাকিবুর রহমান রাকিবকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। তবে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের বাধায় এই দুই নেতা ক্যাম্পাস ছাড়া। রাকিব কয়েকদফা জেলেও গেছেন। নানা অপকর্ম করেও কমিটির দুই নেতা বহাল আছেন। তাদের কমিটি বাতিলসহ শাস্তির দাবিতে লাগাতর আন্দোলন হলেও কোন ফল আসেনি। কেন্দ্র থেকে তদন্ত টিম করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এসবের পেছনে রয়েছে অর্থ ও মেগা প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি।
সোমবার ফেসবুকে স্ট্যাস্টাস দেয়ার পর শহরের ছয় রাস্তায় মোড়ে অবস্থিত প্রকৌশলী আলিমুজ্জামান টুটুলের ফ্ল্যাটে আসেন আলোচিত ও বিতর্কিত শিক্ষক সাবেক প্রক্টর ড. মাহবুবর রহমান। সাবেক প্রক্টর মাহবুবর রহমান দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য। তিনি রাত ১০টার পরে টুটুলের ফ্লাটে প্রবেশ করেন। সেখানে কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করেন। এ ঘটনা জানাজানি হলে সেখানে সাংবাদিকদের একটি দলও অবস্থান নেয়। সাংবাদিকদের অবস্থান জানতে পেরে শিক্ষক মাহবুবর রহমান ইবির বর্তমান প্রক্টর পরেশ চন্দ্র বর্মনকে ডাকেন। তিনি আসেন রাত ১২টার পরে। এরপর ফ্ল্যাট থেকে নেমে আসেন শিক্ষক মাহবুবর রহমান।
সাংবাদিকরা এ সময় তার কাছে জানতে চান এত রাতে প্রকৌশলী টুটুলের বাসায় কেন এসেছেন? তিনি বলেন, আলীমুজ্জামান আমার ঘনিষ্ট মানুষ। ব্যক্তি মাহবুব হিসেবে তার কাছে এসেছি। তাকে হুমকি দিচ্ছে কে বা কারা! তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। তিনি সৎ ও সাহসী মানুষ। সততার জায়গা থেকে তিনি যেন একচুলও বিচ্যুত না হন।
আপনার বিরুদ্ধেই অভিযোগের তীর এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন,‘ সততার জায়গা থেকে আমি একচুলও সরি না। আমার বিরুদ্ধ কেউ কোন অভিযোগ প্রমাণ করতে পারবে না।’ এরপর তিনি প্রক্টর পরেশ চন্দ্র বর্মনের গাড়িতে করে দ্রুত সটকে পড়েন।
প্রকৌশলী আলীমুজ্জামান টুটুল বলেন, একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য আমাক হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমার ম্যাসেঞ্জারে তারা ম্যাসেজ পাঠিয়ে হুমকি দিচ্ছে। তারা জোর করে কাজ নিতে চায়। এর আগেও তারা আমার কাছ থেকে অর্থ নিয়েছে। সব ডকুমেন্ট আছে। আমি আর চাকরি করব না। প্রয়োজনে সংবাদ সম্মেলন করে সব বলব। প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাব।’ তিনি থানায় জিডি করবেন বলেও জানান। টুটুল আশঙ্কা করছেন তার ক্ষতি করা হতে পারে।
ইবি প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,‘ মেগা প্রকল্পের যে কাজ চলছে, তা থেকে একটি চক্র নিয়মিত কমিশন নেয়। প্রকৌশলী টুটুল নিজে কোন কমিশন নেন না। সেই অর্থ যায় কয়েকজন শিক্ষক ও ছাত্রলীগ নেতা পলাশ ও রাকিবের পকেটে। কেন্দ্রীয় নেতাদের ৪০ লাখ টাকায় ম্যানেজ করে কমিটির নেতা হন পলাশ ও রাবিক। এরপর শোভন ও রাব্বানির কমিটি বাতিল করা হলে চাপে পড়েন পলাশ ও রাবিক। তবে বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদেরও তারা নানাভাবে ম্যানেজ করে আসছেন। আর এসব কাজে তাদের সকল সহযোগিতা দিয়ে আসছেন সাবেক প্রক্টর প্রফেসর মাহবুবর রহমান। এবারো তারা টুটুলকে চাপ দিয়ে একটি কাজ এক নেতাকে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এর পেছনে জেলা ও উপজেলা যুবলীগের কয়েকজন নেতার হাতও রয়েছে।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. হারুন-উর-রশিদ আশকারী বলেন, ‘টুটুল অনেক ভাল ছেলে। কোন চাপের কাছে নতি স্বীকার করে মেগা প্রকল্পের কাজ হবে না। প্রয়োজন কাজ বাতিল হবে। কারা চাপ সৃষ্টি করছে আমি জানি না। তবে টুটুল যে কোন সহযোগিতা চাইলে আমি করতে প্রস্তুত আছি।’
- বিষয় :
- ইসলামী বিশ্ববদ্যালয়
- ইবি
