'জয় বাংলা মৌলভি'র খবর কেউ রাখে না
আ. মজিদ খান -সমকাল
নান্দাইল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২০ | ১০:৪২
ভালো নেই বঙ্গবন্ধুর দেওয়া উপাধিপ্রাপ্ত 'জয় বাংলা মৌলভি' আ. মজিদ খান। বার্ধক্যজনিত রোগে কাতর এই বৃদ্ধের দিন কাটে ভাঙা একটি ঘরে। বয়স্ক ভাতা আর বন্ধু-বান্ধবের সাহায্যে চলে তার খাওয়া-পরা। জয় বাংলা মৌলভি আ. মজিদ খানের (৮৫) বাড়ি ময়মনসিংহের নান্দাইল পৌর সদর কাকচর মহল্লায়।
পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনের বাড়ি ছিল নান্দাইল উপজেলায়। এ কারণে তখন নান্দাইলে ছিল পিডিপির খুবই দাপট। তাদের লাঠিয়াল বাহিনীর ভয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সর্বক্ষণ তটস্থ থাকত। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে নান্দাইল আসনে পিডিপির শক্তিশালী প্রার্থী ছিলেন নূরুল আমিন।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর রফিক উদ্দিন ভূইয়া। নির্বাচনের আগে স্থানীয় চন্ডীপাশা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর পক্ষে এক জনসভার আয়োজন করা হয়। নির্ধারিত দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তৎকালীন আওয়ামী লীগের প্রথম সারির বেশ কয়েকজন নেতা জনসভার মঞ্চে উপস্থিত হন। নান্দাইল থানা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি শাহনেওয়াজ ভূইয়ার সভাপতিত্বে সভার কাজ শুরু করার প্রারম্ভেই কোরআন তিলাওয়াতের ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু যার কোরআন তিলাওয়াত করার কথা, তিনি পিডিপির সন্ত্রাসীদের ভয়ে আত্মগোপন করেন। অনেক চেষ্টার পরও তাকে পাওয়া যায়নি। এক পর্যায়ে তিলাওয়াতের জন্য লোক চেয়ে মাইকে উন্মুক্ত আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু নিগৃহীত হওয়ার ভয়ে কেউ রাজি হচ্ছিল না। তখন জনসভায় উপস্থিত কাকচর গ্রামের যুবক মৌলভি আ. মজিদ খান বীরদর্পে মঞ্চে গিয়ে কোরআন তিলাওয়াত করেন। মঞ্চে উপস্থিত বঙ্গবন্ধু স্বচক্ষে যুবকের সাহসিকতা দেখে অভিভূত হন। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে আ. মজিদ খানের প্রশংসা করে তাকে 'জয় বাংলা মৌলভি' উপাধিতে ভূষিত করেন। এর পর থেকে তিনি হয়ে যান সবার প্রিয় 'জয় বাংলা মৌলভি'। সবাই তাকে এ নামেই ডাকতেন।
মৌলভি আ. মজিদ খানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙা একটি টিনের ঘরে চৌকিতে শুয়ে আছেন। বর্তমানে তিনি কানে কম শোনার পাশাপাশি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। তার তিন ছেলে, তিন মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন অনেক আগেই। ছেলেরা এখানে সেখানে থেকে কাজ করেন। স্ত্রী হালিমা বেগমকে নিয়ে তিনি বাড়িতেই থাকেন। জমি যা ছিল বিক্রি করে এতদিন সংসারের খরচ জুগিয়েছেন। বর্তমানে ২৬ শতক জমি অবশিষ্ট রয়েছে, যা সন্তানদের নামে লিখে দিয়েছেন।
মজিদ খান বলেন, 'ওই দিনের জনসভায় শুধু কোরআন তিলাওয়াতই করিনি; জনসভা শেষে আওয়ামী লীগ প্রার্থী রফিক উদ্দিন ভূইয়ার পক্ষে মোনাজাতও পরিচালনা করেছিলাম। এ কারণে পিডিপির লোকজন আমাকে হিন্দুদের বা ভারতের লোক আখ্যা দিয়ে গ্রামের মসজিদের ইমামের পদ থেকে বহিস্কার করেছিল।'
মজিদ খান বলেন, 'দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো সরকার তার খোঁজখবর নেয়নি।'
তার স্ত্রী হালিমা বেগম বলেন, দেশ স্বাধীনের পর সবাই তাকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে বলেছিলেন, কিন্তু প্রচারবিমুখ লোকটি যাননি। হালিমা বলেন, একটা বয়স্ক ভাতার কার্ড আছে। সেখান থেকে কিছু টাকা পাই। তা ছাড়া তার (স্বামীর) বন্ধু-বান্ধব কিছু সাহায্য-সহযোগিতা করেন।
প্রতিবেশী মতিউর রহমান বলেন, ঘরে পানি পড়ে বলে বৃষ্টির দিনে তাকে অন্যের ঘরে আশ্রয় নিতে হয়।
নান্দাইল উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক কমান্ডার গাজী আ. সালাম ভূইয়া বীরপ্রতীক বলেন, 'ওই দিনের জনসভায় তিনি যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন; নান্দাইলবাসী তা জীবনভর মনে রাখবে। তবে স্বাধীন দেশে 'জয় বাংলা মৌলভি' আ. মজিদ খানের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি।
দেশ স্বাধীনের পর নান্দাইল থানা আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকবার সভাপতি ছিলেন আ. মতিন ভূইয়া। ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে তিনি বলেন, দেশ স্বাধীনের পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জয় বাংলা মৌলভির আর খোঁজখবর নেয়নি। তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে তাকে প্রায়ই সহযোগিতা করে থাকেন।
