ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬

প্রধান হোতা গ্রেপ্তার, আদালতে স্বীকারোক্তি

চুরি করতে গিয়েই খুন-ধর্ষণ!

চুরি করতে গিয়েই খুন-ধর্ষণ!
×

ইজাজ আহ্‌মেদ মিলন, গাজীপুর

প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০২০ | ১৩:২২

সীমানা দেয়াল টপকে দোতলা বাড়ির ছাদে উঠেছিল অভিযুক্ত অপরাধী পারভেজ হোসেন। সঙ্গে থাকা ব্লেড দিয়ে ছাদে কাপড় শুকানোর রশি  কেটে সেটা গ্রিলের সঙ্গে বেঁধে বাথরুমের ফাঁকা জায়গা দিয়ে দোতলায় নামে সে। ওয়াশিং মেশিনের ওপর পা দিয়ে নিচে নেমেই কিশোরী সাবরিনা সুলতানা নূরা ও নাওরিন হাওয়ার ঘরের খাটের নিচে পারভেজ লুকিয়ে পড়ে। নূরার কানে তখন হেডফোন ও ছোট বোন হাওয়ারিন ঘুমিয়ে। তারপরের ঘটনা ভয়ংকর! শিউরে ওঠার!
ঘণ্টাখানেক পর খাটের নিচ থেকে বের হয়ে পারভেজ রান্নাঘর থেকে ধারালো বঁটি-দা নিয়ে আসে। পাশের রুমে ছোট ছেলেকে বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন নূরার মা স্মৃতি ফাতেমা। ঘরের দরজা খোলার চেষ্টা করার সময় শব্দ পেয়ে ঘুম ভেঙে যায় তার। দরজা খুলে পারভেজকে দেখে চিৎকার দেন ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক স্মৃতি। তার মাথা ও শরীরে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে পারভেজ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই জ্ঞান হারিয়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
এভাবেই শ্রীপুরের জৈনাবাজার এলাকায় দোতলা বাড়িতে মা ও তার তিন সন্তানকে গলা কেটে হত্যার মিশন শুরু করে একই এলাকার কাজীম উদ্দিনের বখাটে ছেলে পারভেজ। গাজীপুর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সদস্যের হাতে গ্রেপ্তার পারভেজ একসঙ্গে চারজনকে হত্যার এমন বর্ণনাই দিয়েছে বলে দাবি করেছেন সংস্থাটির সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা। গ্রেপ্তারের পর গতকাল সোমবার দুপুরে পারভেজ চার খুনের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে।
এ ব্যাপারে পিবিআইর প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার সমকালকে বলেন, পারভেজ এর আগে ধর্ষণের মামলায় প্রায় এক বছর জেল খেটেছিল। কিশোর আদালতে তার বিচার হয়। এবার যে কায়দায় চারজনকে হত্যা করেছে তা শিউরে ওঠার মতো। প্রথমে স্মৃতিকে হত্যা করে। সন্তানরা এ দৃশ্য দেখে ফেলায় ধরা পড়ার ভয়ে সবাইকে একে একে খুন করে সে। 
হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিতে গিয়ে পারভেজের বরাত দিয়ে পিবিআই দাবি করে, পারভেজের হামলার পর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়া স্মৃতির দেহ থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। ঘোঙানির শব্দ পেয়ে পাশের রুম থেকে দৌড়ে নূরা মায়ের রুমে আসে। এ সময় নূরাকেও কুপিয়ে ফেলে রাখে সে। ঘুম  ভেঙে খাটে উঠে বসেছিল ছোট্ট ফাদিল। তাকে জবাই করে খাটের নিচে রেখে দেয় পারভেজ। ঘুম থেকে উঠে এই দৃশ্য দেখে ফেলে হাওয়ারিন। তাকেও কুপিয়ে রক্তাক্ত করে ঘরের মেঝেতে ফেলে রাখে পারভেজ।
পিবিআই গাজীপুর ইউনিট ইনচার্জ নাসির আহম্‌েদ শিকদার জানান, মালয়েশিয়া প্রবাসী রেজোয়ান হোসেন কাজলের দোতলা বাড়িতে গত ২৩ এপ্রিল মধ্য রাতে এ ঘটনা ঘটায় পারভেজ। আস্তে আস্তে নিস্তেজ হতে থাকেন কাজলের স্ত্রী স্মৃতি ফাতেমা। পুরো ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে রক্ত আর রক্ত। এই বীভৎস পরিবেশে প্রথমে নূরাকে ধর্ষণ করে সে। তারপর ওড়না দিয়ে হাত-পা বেঁধে অর্ধমৃত নূরার মা স্মৃতিকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। অপরাধী একই কাজ করে হাওয়ারিনের সঙ্গেও। তারপর তাদের সবার মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য প্রত্যেকের গলা কাটা হয়।
পিবিআই জানায়, স্মৃতি ফাতেমার দামি মোবাইল সেট চুরি করার জন্য কৌশলে পারভেজ দোতলায় উঠেছিল। সবার মৃত্যু নিশ্চিত করার পর নূরার মায়ের সঙ্গে থাকা স্বর্ণের চেইন, দুটি কানের দুল ও একটি কান ফুল ও একটি নাক ফুল খুলে নেয় এবং হাওয়ারিনের কান থেকে দুটি স্বর্ণের রিং খুলে নেয়। পরে আলমারি খুলে দুটি স্বর্ণের চেইন, একটি আংটি, একটি লাল রঙের ছোট ডায়েরি, নূরার মায়ের রুম থেকে দুটি বড় টাচ মোবাইল লুট করে। মোবাইল ও স্বর্ণালংকার তার পায়জামার পকেটে রাখে। এরপর সে হাত-মুখ ধুয়ে পেছনের গেট খুলে নিজের বাড়ি চলে যায়।
এর আগেও একবার পারভেজ ওই বাড়িতে চুরি করার জন্য খাটের নিচে লুকিয়ে ছিল। এই তথ্যের ভিত্তিতে রোববার রাতে জৈনা বাজারের বাড়ি থেকে পারভেজকে আটক করে পিবিআই। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার কথা ও মালপত্র লুটের কথা স্বীকার করে সে। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সোমবার সকালে তার বাড়ির বিভিন্ন স্থান থেকে মালপত্র উদ্ধার করা হয়। স্মৃতি ফাতেমার মোবাইল সেট দুটি সে মাটির নিচে লুকিয়ে রেখেছিল। পিবিআই জানায়, পারভেজকে নিয়ে মালপত্র উদ্ধার করতে গেলে তার বাড়ির পাশের মাটির নিচ থেকে হঠাৎ আজান ভেসে আসে। এতে অবাক হয়ে যান কর্মকর্তারা। এরপর মাটি খুঁড়ে পলিথিনে মোড়ানো ওই মোবাইল সেট দুটি উদ্ধার করেন তারা। পরে দেখতে পান, একটি ফোনে আজানের অ্যাপস ডাউনলোড করা আছে। সকালবেলা নির্ধারিত একটি সময়ে তাই মোবাইল থেকে আজান বেজে ওঠে।
গতকাল সোমবার দুপুরে গ্রেপ্তার পারভেজকে আদালতে নেওয়া হয়। আদালতেও পারভেজ হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।   
পারভেজ  বছর দুই আগে নীলিমা নামে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর গলা টিপে হত্যা করে। এ ঘটনায় শ্রীপুর থানায় তার বিরুদ্ধে মামলাও হয়। তবে ৯ মাস জেল খেটে জামিনে বের হয়ে আসে সে। স্থানীয়রা জানান, মাদকের ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত সে।
ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার লংগাইর ইউনিয়নের  গোলাবাড়ী গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে রেজোয়ান হোসেন কাজল দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ায় থাকেন। সেখানেই ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক স্মৃতি ফাতেমার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। পরে কাজল ইন্দোনেশিয়ায় গিয়ে ফাতেমাকে বিয়ে করে সংসার পাতেন।  নূরা (১৫), নাওরিন হাওয়া (১২) ও ফাদিল (৮) নামে তিন সন্তানের জন্ম হয় তাদের সংসারে। বড় মেয়ে কলেজে ও ছোট মেয়ে স্কুলে পড়াশোনা করছিল। ছোট ছেলে জন্ম থেকেই বাকপ্রতিবন্ধী। দুই যুগেরও বেশি সময় আগে জৈনা বাজার এলাকায় এক খণ্ড জমি কেনেন কাজল। পরে সেখানে বাড়ি তৈরি করে স্ত্রী-সন্তানকে রেখে কাজল মালয়েশিয়ায় কাজ করছিলেন। স্ত্রী স্মৃতি ফাতেমা সংসার সামলানোর পাশাপাশি তিন সন্তানকে মানুষ করছিলেন। গত বুধবার রাতে কাজলের স্ত্রী ও তিন সন্তানকে পারভেজ নির্মমভাবে হত্যা করে। কাজলের বাবা আবুল হোসেন বাদী হয়ে শ্রীপুর থানায় অজ্ঞাতনামা আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

আরও পড়ুন

×