ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

দাম নেই সবজির, ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা

দাম নেই সবজির, ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা
×

সবজি নিয়ে বসে আছেন কৃষক- সমকাল

কবীর উদ্দিন সরকার হারুন, ফুলবাড়িয়া (ময়মনসিংহ)

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২০ | ১১:১২ | আপডেট: ২৯ এপ্রিল ২০২০ | ১১:১৪

পোশাক কারাখানার কাজ ছেড়ে গ্রামে ফিরে অনেক কষ্টে টাকার বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অন্যের জমি নিয়ে এতে উচ্চ ফলনশীল জাতের করলার চাড়া রোপন করেন ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়ের গোপীনাথপুর গ্রামের কৃষক হোসেন মিয়া ও রুনা আক্তার দম্পতি।

মাচা তৈরি করে চারা রোপন পরিচর্যা থেকে শুরু করে ফলন আসার আগ পর্যন্ত তার সর্বসাকুল্যে খরচ হয় প্রায় ১৮ হাজার টাকা।কিন্তু দেশব্যাপী করোনা ভাইরাসের বিরূপ প্রভাবে এবার তার করলার দুই কাঠার মাচা থেকে করলা বিক্রি মৌসুমের শেষে দাঁড়ায় ৫০০ টাকা। সর্বশেষ ৮০ টাকা মণ বিক্রি করেছেন তার ক্ষেতের করলা।

রুনা জানান, এনজিও থেকে লোনের টাকায় সবজি উৎপাদন করে এখন চরম বিপাকে তার পরিবার। সামনের মৌসুমী নতুন সবজি চাষাবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তার জন্য।
শুধু রুনা আক্তার নয় সবজির জন্য সুনাম রয়েছে ফুলবাড়িয়া উপজেলার এমন সবজি চাষিরা করোনা প্রভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকার পত্র এবং লোকডাউনের জন্য পণ্য পরিবহনের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় সবজির ন্যায্য মূল্য তো দূরের কথা সবজি না বিক্রি করতে পারায় পচে গলে নষ্ট হচ্ছে এখন ক্ষেতেই। তাই সর্বস্বান্ত এমন রুনার মত কৃষকের স্বপ্নের ফসল এখন হাটে বিক্রি হচ্ছে দুই টাকা কেজি দরে।

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার প্রায় সকল সবজি চাষি সবজি আবাদ করে এখন সর্বস্বান্ত।এবারের মৌসুমে ঘাটতি থাকায় সামনের মৌসুমের সবজি উৎপাদন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বলে জানান চাষিরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে মানব দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে পুষ্টিকর খাবার প্রয়োজন। সেখানে এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে কৃষক সবজি চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে দেশে খাদ্য সংকট দেখা দেয়ার আশঙ্কার পাশাপাশি পুষ্টির অভাব দেখা দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তারা বলেন, এ সমস্যা দূর করতে সরকারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কৃষি অফিসের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নামের তালিকা করে তাদের প্রনোদনা দেয়ার মাধ্যমে সবজি উৎপাদন উৎসাহিত করা প্রয়োজন।

সরেজমিনে উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের পাহাড় অনন্তপুর, এনায়েতপুর ইউনিয়নের গোপীনাথপুর, ফুলতলা, বাক্তা ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর, শ্রীপুর, কালাদহ ইউনিয়ন এবং পুটিজানা ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায় মৌসুমী সবজি যেমন, কলা, বেগুন, টমেটো, শসা,লাউ কুমড়া,লেবু সহ নানান সবজি পচে নষ্ট হচ্ছে কৃষকের ক্ষেতে।

বিভিন্ন স্থানীয় বাজারগুলোতে লকডাউন থাকায় কৃষক তার পণ্য নিতে পারছে না পাশাপাশি বাজারে পাইকার না থাকায় ন্যায্য দামও পাচ্ছে না চাষিরা। তাই অনেক কৃষক বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ করে তারা তাদের সবজি চাষ করে বিক্রি করতে না পারায় এবার চরম বিপাকে পরেছে কৃষরা।

উপজেলার রাঙ্গামাটিয় এবং এনায়েতপুর ইউনিয়নে অন্তত ১হাজার ৫০ একর জমিতে সবজির চাষাবাদ হয়েছে। যা বিক্রি না হওয়ায় এবং বাজার মূল্য না থাকায় অন্তত ২কোটি টাকার উপরে লোকসানের মুখ দেখছে মৌসুমী সবজির কৃষকরা।

রাঙামাটি ইউনিয়নের পাহাড় অনন্তপুর গ্রামের সবজি চাষী রহিমা খাতুন, সেলিম হোসেন, মাহমুদ আলী এবং এনায়েতপুর ইউনিয়নের গোপীনাথপুর  গ্রামের কাজিম উদ্দিন, মোস্তাকমিয়া, জয়নাল, হায়দার আলী অভিযোগ করেন, করোনা কারণে এবং স্থানীয় কিছু পাইকারদের সিন্ডিকেটের জন্য আমরা কৃষকরা সর্বস্বান্ত হয়ে গেছি। বাজারে নিলে করোলা দুই টেকা কেজি, কলা ১টাকা করে, বেগুন বাজারে নিলে কেউ নেয় না, কোন সবজি বাজারে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না লকডাউনের জন্য।

উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের পাহাড় অনন্তপুরের সবজি চাষিদের ব্যাপারে ইউনিয়নটির ইউপি চেয়ারম্যান সালিনা চৌধুরি সুষমা বলেন, রাঙ্গামাটি ইউনিয়নের একটি বড় অংশের মানুষ সবজি চাষের উপর তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। বিশেষ করে পাহাড় অনন্তপুরে প্রচুর মৌসুমী সবজির আবাদ হয়। এবার করোনার প্রভাবে চাষিরা খুবই বিপর্যয়ের মধ্যে আছে তারা তাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না বাজারে। তাই আমি মনে করি এই সমস্ত প্রান্ত্রিক  সবজি চাষীদের সরকারিভাবে প্রণোদনার আওতায় আনা প্রয়োজন এবং সুদ মুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

তবে উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়নে লেবুর জন্য জনপ্রিয় ফুলতলা গ্রামের লেবু চাষিরা এবার লেবুর দাম নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলেও স্থানীয় কিছু সিন্ডিকেটের কারণে লেবুর দাম ইতিমধ্যে কমতে শুরু করেছে বলে জানান ফুলতলার লেবু চাষী নুরুল ইসলাম মাস্টার।

এদিকে ফুলবাড়িযা উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য মতে এবার উপজেলায় সর্বমোট ১৮শ ৯৫ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়েছে শুধু সবজি যার মধ্যে করলা ২৬০ হেক্টর বাকী, শাসা,লাউ,বেগুন,কুমড়াসহ অন্যান্য সবজি।

এ বিষয়ে ফুলবাড়িয়া কৃষি অফিসার জেসমিন নাহার বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে আমরা কোন সবজি চাষিদের ব্যাপারে গাইডলাইন পাইনি, তবে ক্ষতিগ্রস্ত সবজি চাষিদের অবস্থা খুবই খারাপ। সরকারের উচিত ক্ষতিগ্রস্ত  কৃষকদের প্রণোদনার ব্যবস্থা করা, কেননা তানাহলে কৃষকরা সবজি চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে দেশে খাদ্য ঘাটতি সহ পুষ্টিহীনতার একটা বড় সংকট দেখা দিতে পারে।

জেসমিন নাহার আরও বলেন, বর্তমানে আমরা ত্রাণ সামগ্রী বিতরণের ক্ষেত্রে শুধু চাল, ডাল আলু ইত্যাদি দিতে দেখছি। বর্তমানে ত্রাণ সামগ্রী সাথে যদি কৃষকদের এইসকল উৎপাদিত কৃষি পণ্য বিতরণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় তাহলে কৃষকরা অন্তত তার পণ্যের ন্যায্য দাম পেতে পারে।


আরও পড়ুন

×