ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যেভাবে প্রথা হয়ে উঠেছে মহাস্থানগড়ের ‘কটকটি’

যেভাবে প্রথা হয়ে উঠেছে মহাস্থানগড়ের ‘কটকটি’
×

ট্রে-তে সাজিয়ে রাখা কটকটি। ছবি: সমকাল

ইয়াজিম পলাশ, মহাস্থানগড় থেকে

প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ১০:৫২ | আপডেট: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ১৩:২৬

চারকোনা বিস্কুট আকৃতির শুকনো মিষ্টান্ন খাবার। স্বাদে অনন্য গুড়মাখা লালচে এই খাবারের নাম কটকটি। বাংলার প্রাচীন রাজধানী পুণ্ড্রবর্ধন বা মহাস্থানগড়ে উৎপাদিত এই খাবারের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও। প্রায় ২০০ বছর ধরে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে মহাস্থানের কটকটি। একসময় মাজারের তবারক হিসেবে ব্যবহৃত হলেও তা এখন এ অঞ্চলের মানুষের প্রথা বা সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।

জনশ্রুতি রয়েছে, হজরত শাহ্ সুলতান বলখী (রহ.) মাহী সওয়ারের মাজারের তবারক হিসেবে প্রথম আটার তৈরি কটকটি ব্যবহার করা হয়। এরপর থেকে মাজার জিয়ারত বা মিলাদে তবারক হিসেবে কটকটি বিতরণের প্রচলন রয়েই গেছে। এছাড়া স্বাদ ও মানের কারণে সাধারণের মধ্যে এর বাজারও প্রসারিত হয়েছে। এটি এখন মহাস্থানের ঐতিহ্যের একটি অংশও।

জনশ্রুতি রয়েছে, হজরত শাহ্ সুলতান বলখী (রহ.) মাহী সওয়ারের মাজারের তবারক হিসেবে প্রথম আটার তৈরি কটকটি ব্যবহার করা হয়। এরপর থেকে মাজার জিয়ারত বা মিলাদে তবারক হিসেবে কটকটি বিতরণের প্রচলন রয়েই গেছে। এছাড়া স্বাদ ও মানের কারণে সাধারণের মধ্যে এর বাজারও প্রসারিত হয়েছে। এটি এখন মহাস্থানের ঐতিহ্যের একটি অংশও।

হজরত শাহ্ সুলতান বলখী (রহ.) মাহী সওয়ারের মাজারের নিচে কটকটি কিনতে আসা স্থানীয় এক নারী জিম্মা খাতুন জানান, তিনি মাজার জিয়ারত করতে এসেছেন। সেজন্য তবারক হিসেবে এই কটকটি বিতরণ করবেন। মানসিক প্রশান্তির জন্য এবং কোন মানত করলে তিনি মাজার জিয়ারত করেন এবং তবারক হিসেবে সবসময় কটকটি বিতরণ করে থাকেন।

স্থানীয় বিক্রেতারা জানান, সপ্তাহের অন্য দিনের তুলনায় শুক্রবার কটকটি বেশি বিক্রি হয়। প্রতিদিন এখানে হাজার হাজার মানুষ মাজার জিয়ারত করতে আসেন। প্রতিটি দোকানেই গড়ে প্রায় লাখ টাকার কটকটি বিক্রি হয়।

মহাস্থানগড়ে প্রায় ২৫টি বড় দোকানে প্রতিদিন হরেক স্বাদের কটকটির বিশাল পসরা নিয়ে বসেন দোকানিরা। বড় দোকানগুলোর মধ্যে রয়েছে লাল মিয়া কটকটি ঘর, নাসির কটকটি প্যালেস, হামু মামা কটকটি প্যালেস, সুলতান কটকটি প্যালেস, চায়না কটকটি ঘর, আলাউদ্দিন কটকটি ভান্ডার, জিন্নাহ কটকটি ভান্ডার, ফাতেমা কটকটি প্যালেস, আল আমীন কটকটি প্যালেস, লায়েব কটকটি ভান্ডার, শাহাদত কটকটি ভান্ডার ইত্যাদি। শুক্রবার দর্শনার্থীর ভিড়ের কারণে গড়ের ওপরেও কটকটির দোকান বসে প্রায় ১০০টি। পর্যটন মৌসুমে এসব দোকানে গড়ে প্রতিদিন ১৫০ মণ কটকটি বিক্রি হয়। স্বাদ ও মানভেদে প্রতি কেজি কটকটির দাম গড়ে ১৬০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা। 

দোকানিরা জানালেন, খাওয়ার সময় কটকট শব্দ করায় সুস্বাদু এই মিষ্টান্নের নাম হয়ে উঠেছে কটকটি। আগের দিনে কটকটি একটু শক্ত ছিল। এখন তৈরির পদ্ধতিতে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগায় এবং খামিরে ডালডার ব্যবহারের কারণে খেতে আগের চেয়ে অনেকটাই নরম। এখন আগের মতো তেমন কটকট শব্দ হয় না।

দোকানিরা জানালেন, খাওয়ার সময় কটকট শব্দ করায় সুস্বাদু এই মিষ্টান্নের নাম হয়ে উঠেছে কটকটি। আগের দিনে কটকটি একটু শক্ত ছিল। এখন তৈরির পদ্ধতিতে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগায় এবং খামিরে ডালডার ব্যবহারের কারণে খেতে আগের চেয়ে অনেকটাই নরম। এখন আগের মতো তেমন কটকট শব্দ হয় না।

মহাস্থানগড়ে কটকটির সবচেয়ে পুরোনো দোকান লাল মিয়া কটকটি ঘর। এর প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ লাল মিয়া প্রামাণিক বলেন, মাত্র ১২ বছর বয়সে বাবার হাত ধরে মহাস্থানগড়ে কটকটি ব্যবসায় আসেন তিনি। শুরুতে গড় এলাকায় কটকটি ফেরি করে বিক্রি করতেন। এখন গড়ের নিচেই বিশাল শোরুমে কটকটি সাজিয়ে বসেন।

প্রবীণ এই দোকানি জানান, এটা তাদের পারিবারিক ব্যবসা। প্রায় ১৮০ বছর ধরে তারা এ কটকটি উৎপাদন করেন। তার দাদা জোহর প্রামাণিকের বাবা প্রথম এ কটকটি বিক্রি শুরু করেন। এরপর থেকে তার বাবা মোহাম্মদ আলী প্রামাণিক এবং তার পরের প্রজন্মরা কটকটি তৈরি ও বিক্রি করে চলেছেন।

জিন্নাহ কটকটি ভান্ডারের জিন্নাহ মিয়া বলেন, এখন মহাস্থানেই স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠেছে অনেক কটকটি তৈরির কারখানা। আশপাশে ছোট-বড় মিলে কমপক্ষে ৫০টি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি কারখানা বড় আকারের। এসব কারখানায় প্রতিদিন গড়ে ১০০ মণের বেশি কটকটি তৈরি হয়।

যেভাবে কটকটি তৈরি করা হয়

ব্যবসায়ী ও কারিগরেরা জানান, কটকটির ইতিহাস সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো ধারণা নেই্। তবে জনশ্রুতি রয়েছে মাজারে প্রথম তবারক হিসেবে এই কটকটি বিতরণ করা হয়। সেখান থেকেই তবারক হিসেবে এর প্রচলন চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। তবে শুরুর দিকে গমের আটা দিয়ে কটকটি তৈরি করা হতো। পরে এটির পদ্ধতি ও উপকরণে পরিবর্তন আনা হয়। আগে শুধুমাত্র তেলে ভাজা হলেও এখন কটকটি ভাজতে ঘি কিংবা ডালডা ব্যবহার করা হয়।

কটকটি তৈরির প্রধান উপকরণ সুগদ্ধি চাল। এই চাল প্রথমে তিন থেকে চার ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। এতে চাল নরম হয়ে যায়। ওই চাল ছেঁকে পানি শুকিয়ে ফেলতে হয়। চাল ঝরঝরে হতে ১৫ থেকে ২০ মিনিট লাগতে পারে। এরপর চাল আটায় রূপান্তর করা হয়। আগের দিনে আটা তৈরি করতে ঢেঁকির প্রচলন ছিল। এখন সাধারণত মেশিনে আটা তৈরি করা হয়। এরপর আটার সঙ্গে কিছুটা তেল মিশিয়ে খামির করা হয়। এই খামির কোনো ধাতবে বিছিয়ে হালকা শক্ত করতে হয়। পরে প্রায় দেড় বর্গইঞ্চি করে ছাঁচে ফেলে ছুরি দিয়ে কাটা হয়।

এই বর্গাকৃতির কাঁচা কটকটি ভোজ্য তেল, ঘি কিংবা ডালডার সংমিশ্রণে ভাজা হয়। এটি লালচে রং ধারণ করলে কড়াই থেকে তোলা হয়। এরপর গুড় বা চিনি দিয়ে তৈরি করা বিশেষ ঝোলে ভাজা কটকটি বড় কড়াইয়ে নিয়ে নাড়তে হয়। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে ঠান্ডা হয়ে গেলেই হয়ে যায় দারুণ স্বাদের কটকটি।

আরও পড়ুন

×